নীরবে কেটে গেলো শেরে বাংলার জন্ম বার্ষিকী
পদ্মা সেতুকে শেরে বাংলা সেতু হিসাবে নামকরনের দাবি
খাইরুল ইসলাম, ঝালকাঠি প্রতিনিধি:
এবার ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় জন্মনেয়া বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক এর ১শ ৪৪তম জন্ম বার্ষিকীর দিনটিও কেটে গেলে এক প্রকার নীরবে নিভৃতিতে। উপজেলার সাতুরিয়া মিয়াবাড়ির মাতুলালয়ে কাজী মুহাম্মদ ওয়াজেদ ও সাইদুন্নেছা খাতুনের একমাত্র পুত্র অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত এ মহান নেতা ভূমিষ্ঠ হওয়ায় বিশ্বের দরবারে তার হাত ধরেই বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবরের দিবাগত মধ্যরাতে ঝালকাঠির রাজাপুরের সাতুরিয়ার নানাবাড়িতে জন্ম গ্রহনকারী এই ‘বাংলার বাঘ’ এর প্রথম চিৎকারে প্রকম্পিত (জন্মগৃহ) আতুরঘর, তার পরশমাখা নানার ঘর, শান বাধান পুকুর ঘাট ও নিজের প্রতিষ্ঠিত সাতুরিয়া এমএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি জ্বরাজীর্ন অবস্থায় দাড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষী হয়ে। গত ২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি সরকার এক প্রজ্ঞাপনে শেরে বাংলার জন্মস্থানটি প্রতœতত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করে কাগজ-কলমে এক প্রজ্ঞাপন জারী করলেও গত ৭ বছরেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। তবে সরকারী ভাবে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় কবি-সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ত্ব কেউই বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক কে স্মরন করলো না। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ন্যায় এবারেও লন্ডন প্রবাসি জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী পরিষদ নেতা ইঞ্জি: রেজাউল করিম তার প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠনের মাধ্যমে এ মহান নেতার জন্মদিন স্মরনে ক্ষুদ্র পরিষরে একটি স্মরন সভা ও মানববন্ধন করেছেন বলে জানাগেছে।
এক সময়ে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের কর্নধার ছাড়াও রাজনৈতিক জীবনে কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭ – ১৯৪৩), পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী (১৯৫৫), পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬ – ১৯৫৮) পদে অধিষ্ঠিত হয়ে ছিলেন। যুক্তফ্রন্ট গঠনকারী নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তিনি মূখ্য মন্ত্রী হওয়ার পরেও তিনি একাধিক বার সাতুরিয়ায় এসেছিলেন। অথচ শেরে বাংলার জন্ম ভিটা ও সাতুরিয়ায় তার নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিও আজ জরার্জিণ ও ঝুঁকি নিয়ে চলছে। তার সেই জন্মভবনে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন তার মাতুল বংশধররা। বহুবার এখানে একটি যাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হলেও এ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই জেলার সচেতন মহল ‘নতুন প্রজন্মের কাছে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (বাংলার বাঘ) শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক এর পরিচিতি-জীবনস্মৃতি সম্পর্কে অবহিত করা এবং তাঁর বর্নাঢ্য রাজনৈতিক কর্মকান্ড, দেশ ও জনতার স্বার্থে অবদান তুলে ধরতে সরকারের কাছে দাবী জানিয়েছে।
বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারের লক্ষ্যে ২০০৮-০৯ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলার জন্য পর্যটন স্থান/স্পট চিহ্নিতকরণের আওতায় শেরে বাংলার জন্মস্থানটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ ব্যাপারে এবং ২০১০ সালের ১৮ মার্চের গেজেটে তা প্রকাশ হয়। কিন্তু প্রায় ৭ বছর অতিবাহিত হলেও প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে জন্মস্থানে ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন ও জন্মগৃহের ছাদটি নামমাত্র সংস্কার করার পর হেস্য জনক ভাবে সকল কার্যক্রম থমকে যায়। অথচ দেশ বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এখানে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এক সময় তিনি সাতুরিয়াকে রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করেন।
শেরে বাংলার শৈশব ও কৈশোরের অনেক স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি ‘সাতুরিয়া মিয়াবাড়ি’ নামে পরিচিত। এখানকার একটি মক্তবে তিনি লেখাপড়ায় হাতেখড়ি দেন। নানাবাড়ীর সম্মুখেই ঘাট বাধানো পুকুরে তিনি সাঁতার কাটতেন যা আজও বিদ্যমান। কিন্তু তার জন্মভবনটি প্রতœসম্পদ হিসেবে ঘোষণার প্রায় ৭ বছর অতিবাহিত হলেও শুধু মাত্র ভিত্তি প্রস্থরস্থাপন করে নামমাত্র সংস্কার কাজ হাতে নিলেও অযতœ আর অবহেলার মধ্যে পড়ে রয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা ও বাংলার অবিসংবাদিত এ নেতার বিভিন্ন স্মৃতি চিহ্ন। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। এছাড়াও সাতুরিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে তার অনেক স্মৃতি। মহান এ নেতার জন্ম নেয়া ভবনসহ মোঘল আমলে নির্মিত এসব স্থাপনা দীর্ঘদিনেও সংষ্কার না হওয়ায় তা এখোন জরাজীর্ণ। ইমারতগুলো যে কোন মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে অনেক স্মৃতিচিহ্ন হারিয়েও গেছে।
যে নেতার জন্য বাংলার কৃষকরা জমিদারদের শোষণ নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল তার জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালনেও বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের একটি মহলের অবজ্ঞা ও অনিহা লক্ষ করা গেছে। তাই এবার দক্ষিন বাংলার আপামর জনসাধারনের পক্ষ থেকে অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মস্থানটি দ্রুত সংরক্ষন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নসহ শেরে বাংলার নামে বিশ^বিদ্যালয়, ডাকবাংলো, মিউজিয়াম ও বর্তমানে নির্মানাধীন পদ্মা সেতুটি শেরে বাংলা সেতু হিসাবে নামকরনের দাবি উঠেছে।
এ ব্যাপারে রাজাপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা বেগম পারুল এর সাথে আলাপকালে সাংবাদিকদের জানান, শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মস্থানটি তিনি পরিদর্শন করেছেন। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০১০ সালে তাদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে ভবনটির ছাদ সংস্কার ও একটি ভিত্তিস্তম্ভ স্থাপন করলেও তারপর থেকে আর দৃশ্যমান কোন কাজ হয়নি। তাবে তার স্মৃতি রক্ষায় জন্মস্থানটি সঠিকভাবে সংরক্ষনের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে শীগ্রই অবহিত করা হবে।
স/মা

