মোঃ আজম খাঁন,বাঘারপাড়া (যশোর) থেকে
অর্ধশতাব্দী যাবৎ ভাড়া করা ঘরে চলে বাঘারপাড়া উপজেলার ১১খান শাখা ডাকঘরটি। আজও পেল না তার স্থায়ী ঠিকানা। ১৯৫৭ইং সালে প্রতিষ্ঠিত শাখা-ডাকঘরটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজও ভাড়া করা ঘরেই চালছে তার নিজস্ব কার্যক্রম। যার কোড নং ৭৪০৬। এ শাখা ডাকঘরটি বসুন্দিয়া সাব-পোষ্ট অফিসের অধীন। পোষ্ট অফিস- ১১খান নামেই পরিচিতি পায়। মালিয়াট, বাকলী, হাতিয়াড়া, গুয়াখোলা, বেনাহাটি, বাক্ড়ী, দোগাছি, ঘোড়ানাছ, কমলাপুর, কিস্মত বাক্ড়ী ও রঘুরামপুর এই ১১গ্রাম নিয়েই ১১খান গঠিত। যার পোষ্ট অফিসও ১১খান নামেই পরিচিত। আধুনিক মোবাইলের যুগে বর্তমান বাংলাদেশে পোষ্ট অফিসের কদর কমলেও এই পোষ্ট অফিসের রয়েছে একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস। বৃহত্তর যশোর জেলার শতভাগ শিক্ষিত এই জনপদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিলো এই পোষ্ট অফিসটি। পরবর্তীতে বৃহত্তর যশোর জেলা ভেঙ্গে নড়াইল ও যশোর আলাদা দুইটি জেলার সৃষ্টি হয়।
সেই সঙ্গে ভাগ হয় এগারোখানও। যার পাঁচটি গ্রাম (মালিয়াট,বাকলী, হাতিয়াড়া, গুয়াখোলা ও বেনাহাটি )যায় নড়াইল সদরে ও বাকি ছয়টি গ্রাম (বাকড়ী, দোগাছি, কিসমত বাকড়ী, ঘোড়ানাছ, কমলাপুর ও রঘুরামপুর ) যায় যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায়। এগারোখানের দুই ভাগের অফিস, আদালত, থানা বিভক্ত হলেও এই পোষ্ট অফিসটিই মেলবন্ধন সৃষ্টি করে রেখেছে দুই জেলার জনগনকে। এখানেই পোষ্ট অফিস-এগারোখান, নামের সার্থকতা। এই জনপদের লোকদের নিজের স্থায়ী ঠিকানা লেখার সময় শুধু ডাকঘরের বেলাতেই এগারোখান শব্দটি প্রয়োগ হয়। ডাকঘরের করনেই এগারোখানের এত পরিচিতি বলে মনে করেন এই এলাকার আপামর জনসাধারন। দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত এ জনপদের লোকজনের স্বজনদের সংঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন ছিলো এই পোষ্ট অফিস। স্বজনদের চিঠি বা চাকুরীর নিয়োগ পত্র প্রাপ্তির আশায় প্রতিদিনই ভীড় লেগে থাকতো বাক্ড়ীর বাজারে।
বাক্ড়ী গ্রামের প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গোকুল চন্দ্র বিশ্বাস পোষ্ট অফিসের ইতিহাস সম্পর্কে বলেন , এগারোখানের ডাকঘর কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির উদ্যেগে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে, বাক্ড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক বাকলী গ্রামের সুশীল কুমার পাঠক, একই বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক গোকুল চন্দ্র বিশ্বাস, বাক্ড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাতিয়াড়া গ্রামের নারায়ন চন্দ্র পাঠক ও বাক্ড়ী গ্রামের বিশিষ্ট সমাজকর্মী শিশির কুমার বিশ্বাসের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় এগারোখানের ব্র্ঞ্চা-পোষ্ট অফিস। এ প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নারায়ন চন্দ্র পাঠক বলেন, সবার সিদ্ধান্ত মতে বাক্ড়ী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে পোষ্ট অফিসের প্রাথমিক কর্যক্রম শুরু হয়। স্কুলের অফিসে কক্ষেই ডাকঘরের কার্য্যক্রম চলে ৩০ বছর । এই সময়ে পোষ্ট মাষ্টার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন, বাক্ড়ী গ্রামের প্রয়াত শিশির কুমার বিশ্বাস, পিয়ন পদে ছিলেন প্রয়াত মণিমোহন মুখার্জী। রানার হিসাবে কাজ করেন প্রয়াত শরৎ চন্দ্র বিশ্বাস। পোষ্ট অফিস শুরুর প্রথম আফিস স্টাফদের কেউ এখন আর জীবিত নেই। কিন্তু আজও হয়নি শাখা ডাকঘরের স্থায়ী ঠিকানা। পরবর্তীতে অফিস স্টাফেও আসে পরিবর্তন। আসে ডাকঘরের স্থানেরও পরিবর্তন। তখন ডাকঘরের স্থান হিসাবে বেছে নেওয়া হয় ১১খান বাক্ড়ী গ্রামের ক্লাব ঘরকে। এই সময় পোষ্ট মাষ্টার হিসাবে বাক্ড়ী গ্রামের অমুল্য বিশ্বাস, পিয়ন পদে টিকেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, রানার পদে শরৎ চন্দ্র বিশ্বাস দায়িত্ব পালন করেন। এখানেও শাখা-ডাকঘরের জীবন কাটে ২০ বছর। বিশ বছর পর আবারও আসে পোষ্ট অফিসের স্থান ও স্টাফদের পরিবর্তন। পোষ্ট মাষ্টার পদে আসেন টিকেন্দ্রনাথ বিশ্বাস।
পিয়ন পদে হাতিয়াড়া গ্রামের গৌঁরাঙ্গ ঘোষাল ও রানার পদে বিদ্যুৎ বিশ্বাস (শরৎ চন্দ্রের মৃত্যুজনিত শূন্য পদে)। স্থান হিসাবে বেছে নেওয়া হয় পোষ্ট মাষ্টারের দোকান ঘরকে। ১৯৯০ সালে পোষ্টম্যান গৌরাঙ্গ ঘোষাল ইস্তফা দেওয়ায় বাক্ড়ী গ্রামের নিরাপদ বিশ্বাস তার স্থলাভিষিক্ত হন। এভাবেই ১১খানের শাখা-ডাকঘরের জীবন চলে যুগের পর যুগ। পোষ্ট অফিসের স্থান, অফিস স্টাফের পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয়না তার স্থায়ী ঠিকানা। পোষ্ট অফিসের বর্তমান পোষ্টম্যান (পিয়ন) নিরাপদ বিশ্বাস বলেন, পোষ্টমাষ্টারের ভাঙ্গাচোরা দোকান ঘরে খুব কষ্টে আছি। জরুরী কাগজপত্র বৃষ্টিতে ভিজে যায়। তেলাপোকা ইদুর ও ছুঁচোয় কাগজপত্র কেটেকুটে তছ্নছ্ করে ফেলে। জনি না কবে মুক্তি পাব এ সমস্যা থেকে।
খোজ নিয়ে জানা যায় তথ্য মন্ত্রণালয়ে ২০১৫Ñ১৬ অর্থ বছরে ‘গ্রামীণ ডাকঘর প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প পাশ হয়। যে প্রকল্পে গ্রামীণ ডাকঘর মেরামত ও স্থায়ী ইমারত নির্মাণ করা হয়। ঐ প্রকল্পে এগারোখানের ডাকঘরের নামও অর্ন্তভুক্ত হয়। কিন্তু জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারনে ডাকঘর নির্মান সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে বাকড়ী গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গোকুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এগারো গ্রামের মধ্যে শুধু বাকড়ী গ্রামের পাঁচ/ছয়জন লোকের বিরোধীতার কারনে ডাকঘরটি হলো না।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় ডাক বিভাগের উপ-পরিদর্শক রফিকুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, বাকড়ী বাজারের দক্ষিন পার্শ্বে (রাইচ মিলের দক্ষিন পার্শ্বে) বাক্ড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের রেজুলেশন করা জমি নির্বাচন করি। যা ডাকঘরের নামে বলেই জানতাম। কিন্তু সবকিছু চুড়ান্ত করে যখন নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে কাজ শুরু করি তখন চিহ্নিত জমির পশ্চিম পাশের মালিক সুবোধ কুমার বাধা দেয় এবং উপজেলা নির্বাহী অফিস ও ভুমি অফিসে পিটিশন দাখিল করে । পরে প্রশাসনের বাধার মুখে প্রকল্প পরিবর্তৃন করে নড়াইলের সদরের আগদিয়ায় ডাকঘর নির্মান করি।
বাকড়ী গ্রামের রাজনৈতীক ও সামাজিক দলাদলী ডাকঘর না হওয়ার একটি বিশেষ কারন বলে এ জনপদেও সাধারণ মানুষের ধারনা ।ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ডাকঘর নির্মান প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বৃদ্ধি পাওয়ায় উপযুক্ত মলিকানাভুক্ত জমি পেলে এক বছরের মধ্যেই এ ঐতিহ্যবাহী ডাকঘরটি নির্মাণ করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়।
স/মা

