১৮শ’ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলে গাভী পালন ও দুধ উৎপাদনের ঐতিহ্য নানা সমস্যা-সম্ভাবনায় এখনো টিকে আছে। শুধু টিকে থাকা নয়, খুব ভালোমতো টিকে আছে। এখানে এক সময় বিচ্ছিন্নভাবে গাভী পালন ও দুগ্ধ উৎপাদন এখন দুগ্ধ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এতে যদিও সময় লেগেছে দেড়শ’ বছর। এ সময়ের মধ্যে গাভী পালন তথা দুধ উৎপাদন এমনভাবে বেড়েছে যে, বলতে গেলে এ অঞ্চলে নীরবে শ্বেত বিপ্লব সংঘটিত হয়ে গেছে। এ অঞ্চলে প্রতিদিন আড়াই লাখ লিটারের বেশি দুধ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে দেড় লাখ লিটার বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা, ৭৫ থেকে ৮০ হাজার লিটার দুধ আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ঘোষরা ২৮ থেকে ৩০ হাজার লিটার দুধ কিনে থাকে। এ দুধে দেশের প্রতিদিনের তরল দুধের বিরাট অংশ পূরণ হয়। তরল দুধ ছাড়াও দুগ্ধজাত ছানা ও ঘি শিল্পেরও এখানে বিকাশ ঘটেছে। দুগ্ধ শিল্প বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে, যা দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
গোড়ার কথা: বৃহত্তর পাবনার ভাঙ্গুরা উপজেলা থেকে শুরু করে শাহজাদপুর অবধি নাগডেমড়া, পাথাইল হাট, সেলন্দা, হাড়িয়া, বিল চান্দো, কেনাই, রতনপুর, শাকপালা, চর ততুলিয়া, বহলবাড়ী প্রভৃতি এলাকার বিল অঞ্চলে দূর অতীত থেকেই অবারিত জলরাশি আর ভূখণ্ড ছিল। গোয়াল ভরা গরু আর বিল ভরা মাছ সবসময়ই ছিল। এ ঐতিহ্য বলতে গেলে লালন করে যান ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর এক কর্তাব্যক্তি। এরপর কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি শাহজাদপুরের পোতাজিয়ায় তার জমিদারি তদারকি করতে এসে উন্নত জাতের গাভী সরবরাহ করায় গাভী পালনে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। পরবর্তীকালে গাভীর সংকরায়ন শুরু হলে এটি নতুন যুগে প্রবেশ করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এখানে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র বিশেষ করে মিল্ক ভিটা স্থাপনের পর থেকে দুগ্ধ শিল্প প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। দুগ্ধ শিল্পের আশাতীত বিকাশ দেখে অনেকে তো রসিকতা করে বলেন, পাবনার বেড়া, ফরিদপুর, সাঁথিয়া উপজেলা আর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা এখন দুধের দেশ ‘নিউজিল্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে।
প্রতি বছর রবিঠাকুর তার প্রিয় পদ্মাবোটে চড়ে এ জমিদারি পরিদর্শনে আসতেন। শিলাইদহের পদ্মার ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে পদ্মা, ইছামতি ও বড়াল নদী হয়ে পোতাজিয়ার রাউতার বড়াল ও করতোয়া নদীর সংযোগ খাল পথে পৌঁছতেন শাহজাদপুর কুঠিবাড়ীর ঘাটে। যাতায়াত পথে রবীন্দ্রনাথ রাউতারার গিরিশ চন্দ্র ঘোষবাড়ীর ঘাটে যাত্রা বিরতি করতেন। ঘোষবাড়ী থেকে সংগ্রহ করতেন ছানা, ঘি ও মাখন। এগুলো কিছু কিছু কলকাতার ঠাকুর পরিবারের জন্যও পাঠাতেন। কবিগুরুর পাঠানো কিছু চিঠিপত্র থেকেও তা জানা যায়।
শাহজাদপুরের অদূরে রাউতারার বনেদি দুগ্ধ ব্যবসায়ী গিরি ঘোষ তাকে ওই গো-খামার প্রতিষ্ঠায় নানাভাবে সহায়তা করেন বলে জানা যায়। এভাবেই গিরিশ চন্দ্র ঘোষ পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক সময়ে ঘোষ পরিবার তাদের বিপুলসংখ্যক গরু চড়ানোর জন্য ঠাকুর পরিবারের জমিদারির অনাবাদি জমি চারণভূমি হিসেবে বিনা খাজনায় দাবি করেন। রবীন্দ্রনাথ গোপালনের সুবিধার্থে বাংলা ১৩০২ সনের ২৯ চৈত্র তারিখে মোক্তা ৫শ’ টাকা নিয়ে এলাকার বিশাখালী, জালঝার, ছোটঝার, দখলবাড়ী, জামাতদার, ইঁটাখোলা, হারনি, বিলদাবানিয়া, লাছনা, খাগরা, নামক বেশ কয়েকটি এলাকার ১৯২ বিঘা জমি পাট্টার মাধ্যমে গিরিশ চন্দ্র ঘোষকে লিখে দেন (রবীন্দ্রনাথ স্বাক্ষরিত অর্ডার বুক)।
১৮৯৪-৯৫ খ্রিস্টাব্দে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই এলাকার কৃষকদের উন্নয়নের জন্য এবং দুগ্ধজাত গো-সম্পদ পালনে উৎসাহিত করার জন্য কৃষকদের নিয়ে সমবায় সমিতি গঠন করেছিলেন। পরে ভারতের পুশা-ভেটেরেনারি কলেজ থেকে উন্নত জাতের মুলতানি ও সিন্ধি জাতের ষাঁড় ও গাভী এনে গিরিশ চন্দ্র ঘোষের মাধ্যমে এলাকার কৃষকদের সরবরাহ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার পরামর্শেই মহাত্মা গান্ধীর মতাদর্শে পরিচালিত ভারতের খাদি প্রতিষ্ঠানের আওতায় এলাকার দুগ্ধ ব্যবসা পরিচালিত হতে থাকে। খাদি প্রতিষ্ঠান এলাকার কায়েমপুর ইউনিয়নের নতুন গ্রামের সন্নিকটে মাঠের মধ্যে উঁচু ভিটা তৈরি করে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি স্থাপন করে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে থাকেন। ওই স্থানটি আজও খাদির ভিটা হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঞ্জাবের শাহিওয়াল থেকে উন্নত জাতের ষাঁড় এনে স্থানীয় গাভীর সঙ্গে ক্রস করে ‘পাবনা ব্রিড’ নামে এক নতুন গো-প্রজাতি উদ্ভাবন করেন। মূলত সেই সময় থেকেই শাহজাদপুরসহ আশপাশের এলাকায় দেশি উন্নত জাতের গরুর মধ্যে সংকরায়ন শুরু হয়।
অতীতে এ অঞ্চলের কৃষকের ভাতের অভাব হলেও তাদের গোয়াল ভরে থাকা গরুর খাদ্যের অভাব ছিল না মোটেও। বিলপাড়ের সবুজে ছাওয়া বাথানই ছিল গো-চারণ ভূমি। চাষিদের পাল ভরা গরু মনের আনন্দে চড়ে বেড়াতে পারত বিশাল চারণভূমিতে। কত সংখ্যক বাথান এখনো রয়েছে এবং বাথানগুলোতে কি সংখ্যক গরু পালিত হয় এ প্রশ্নে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাসিব খান তরুণ জানান, এ এলাকাসমূহে ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক বাথান রয়েছে। আর এসব বাথানে এক-দেড় লাখ উন্নত জাতের গরু প্রতিপালিত হয়। বাথানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সংখ্যাও ৮০-৯০ হাজার। তিনি জানান, স্বাধীনতাপূর্ব পাঁচ হাজার একরের বিশাল গো-চারণ ভূমি বা বাথান এখন মাত্র দেড় হাজার একরে নেমে এসেছে। বাথানের সিংহভাগ চলে গেছে ভূমিগ্রাসীদের দখলে। বাঘাবাড়ীতে অবস্থিত মিল্ক ভিটার সাড়ে আটশ’ একর এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন যে গো-চারণভূমি এখনো রয়েছে তারও সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ নেই। ফলে প্রতি বছর চারণ ভূমির পরিধি কেবলই কমছে।
বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাসিব খান তরুণ জানান, বৃহত্তর পাবনা জেলায় অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ লিটারের বেশি দুধ উৎপাদন হয়। দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা পাবনার ভাঙ্গুড়া ক্রয় কেন্দ্র, সিরাজগঞ্জের লাহিড়ী মোহনপুর ও বাঘাবাড়ী মিল্কভিটায় প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ লিটার দুধ সরবরাহ করেন। এ অঞ্চলে প্রায় এক হাজার দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমিতির মাধ্যমে এ দুধ সরবরাহ হয়। সমিতিভুক্ত মোট সদস্যের সংখ্যা ৫০ হাজার। এ ছাড়া সমিতির বাইরেও কয়েক হাজার খামারি দুধ সরবরাহ করে থাকেন বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া ৭৫ থেকে ৮০ হাজার লিটার দুধ আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ঘোষরা ২৮ থেকে ২৯ হাজার লিটার দুধ ক্রয় কিনে থাকেন। বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুধ কিনে প্রক্রিয়াজাত করে রাজধানীতে পাঠাতে বেশ ক’টি চিলিং সেন্টার স্থাপন করেছে। অধিকাংশ স্থানে খামারিরা বাড়ি বসেই দুধ বিক্রি করতে পারেন। ঘোষরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ কিনে চিলিং সেন্টারে সরবরাহ করেন।
এ অঞ্চলের দুগ্ধ শিল্প যেমন সমৃদ্ধ হচ্ছে, তেমনি এর কিছু সমস্যাও রয়েছে। সাঁথিয়া, ফরিদপুর কিংবা শাহজাদপুরের নদীবেষ্টিত গ্রামগুলো থেকে সকাল-বিকেল যখন স্পিডবোটযোগে দুধের ড্রাম বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা কারখানার দিকে যায় তখন আক্ষরিক অর্থেই বলা যায় দুধের নহর বয়ে যায়। একটি সফল শ্বেত বিপ্লব যেমন হয়েছে, তেমনি আবার এখানে কেউ কেউ কালো থাবাও ফেলছে। কৃত্রিম উপায়ে ভেজাল দুধ তৈরি করা হচ্ছে। ছানাতে ও ঘি তৈরিতেও ভেজাল ঢুকেছে। পাবনার দুধ, ঘি, ছানা বলে তা চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিছুসংখ্যক খারাপ ব্যবসায়ীর জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের দুর্নাম হচ্ছে।
স/শা

