ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৩১ আগস্ট ২০১৭
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর
আজকের সর্বশেষ

চলন্ত বাসে ধর্ষণ অসহনীয় !

admin
আগস্ট ৩১, ২০১৭ ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বাকি যাত্রীরা একে একে নেমে গেল। রাত এগারোটা বেজে যাচ্ছে। বাসের পাঁচজন পুরুষ কর্মীর সঙ্গে নিজেকে একা দেখে মেয়েটির কি ভয় লেগেছিল? তারপর চলন্ত বাসে তাঁদের অন্তত তিনজন যখন তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন, তখন তাঁর মনের মধ্যে কেমন করছিল? এই কথাটা আমার মাথা থেকে যাচ্ছে না।

গত মঙ্গলবার ওই বাসের চালকের তিন সহকারী মেয়েটিকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে টাঙ্গাইলের আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে গতকাল বুধবার কাগজে পড়লাম। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটজনের বয়স ১৯ বছর। বাসটিতে চালক ও সুপারভাইজার ছিলেন। পুলিশ তাঁদেরও গ্রেপ্তার করেছে। ওই ঘটনা চলার সময় তাঁরা কী করছিলেন? তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন? গতকাল  রিপোর্টে এই দুজনের ভূমিকা সম্পর্কে কিছু দেখিনি। আর কিছু পড়তে বা দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে না।

মঙ্গলবার রাতে  বার্তাকক্ষ থেকে সহকর্মীরা ফোন করলে ঘটনাটার কথা প্রথম জেনেছিলাম। তাঁরা ফোন করেছিলেন আলাপ করতে যে নিহত মেয়েটির ছবি আমরা ছাপাব কি ছাপাব না। অনেক রাত পর্যন্ত আমরা বিষয়টি নিয়ে ফোন চালাচালি করি। তখনকার মতো আমরা সিদ্ধান্ত নিই, আপাতত মেয়েটির নাম-পরিচয়-ছবি প্রকাশ করব না। মেয়েটি আর নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতির আবরু আর মান-মর্যাদার প্রশ্ন আছে। তাঁর পরিবারের শোকাহত সদস্যরা বিড়ম্বনা বা বিপত্তিতে পড়তে পারেন, তাঁদের মনে আঘাত লাগতে পারে। ওই মেয়েটির জায়গায় নিজের মেয়েকে বসিয়ে ভাবলে বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হতে পারে।

কাজের কথাবার্তা, আলোচনা-পর্যালোচনার শেষে ঘটনাটার নৃশংসতা আর নিষ্ঠুরতা মনের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ঢুকল। মাথায় গেঁথে গেল। আর তারপর থেকেই ওই বাসে মেয়েটির জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টার কথা মাথায় ঘুরছে। মেয়েটার কথা ভাবছি। আসামিদের কথাও ভাবছি।

ধর্ষণ মানেই গায়ের জোরে নিজের ইচ্ছা চরিতার্থ করার মনোবৃত্তি। নৃশংসতা ধর্ষণের মনোবৃত্তির দোসর। আজকাল প্রায় রোজই নৃশংস ধর্ষণের ঘটনা জানতে পাই। আমাদের সময়টা নিষ্ঠুর কদর্য বৈষম্য আর সংঘাতে অস্থির। নৃশংসতা দেখতে দেখতে আমাদের মন অবশ হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের রক্ষকদের নিষ্ঠুরতা, সমাজের আর গোষ্ঠীর নিষ্ঠুরতা, ব্যক্তির নিষ্ঠুরতা। ঘাত, প্রতিঘাত, প্রতিশোধ। আমাদের এসব সয়ে যাচ্ছে। বোধগুলো ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। ভাবনাগুলো যান্ত্রিক।

তবুও মধুপুরের মতো ঘটনার কথা মাথা থেকে নামতে চায় না। গত শুক্রবার মেয়েটি শিক্ষক নিবন্ধনের পরীক্ষা দিয়ে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহে তাঁর বর্তমান চাকরির জায়গায় ফিরছিলেন। পরীক্ষা শেষ করে রওনা হওয়া, রাস্তাঘাটে যানজট—অনুমান করি, রাত সে জন্যও হয়েছিল। এখন পর্যন্ত যে তিনজন ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছেন, তাঁরা বলেছেন ধর্ষণের পর তাঁরা মেয়েটিকে মেরে ফেলেছেন ঘাড় মুচড়ে। তারপর বন এলাকায় রাস্তার পাশে ছুড়ে ফেলে গেছেন।

ভাবতে গেলে দম আটকে আসে, ভাই কীভাবে লাওয়ারিশ লাশের কথা জেনে থানায় খুঁজতে গিয়ে দেখলেন সেটা বোনের লাশ। সেই রাতে মেয়ে বাস থেকে ফোনে মাকে বলেছিলেন, বাসায় পৌঁছে খবর দেবেন। মা খবর পেলেন প্রায় তিন দিন পর গত সোমবার, মেয়ের লাশের। ভাইয়ের কাছ থেকে সবটা শুনে পুলিশ সোমবার রাতেই ওই বাসের পাঁচ কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁরা নাকি ঘটনার পরদিন থেকে নিয়মিত বাস চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

দম আটকে আসে। আতঙ্ক হয়। বোধ-বুদ্ধিহীন হতাশা মনকে গ্রাস করে।

আমি, আমরা বা আমাদের নিকটজন যে কেউ তো এমন একটা রাতে এমন একটা বাসে ঘরের উদ্দেশে যাত্রা করতে পারি। আমরা যে কেউই তো ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর লাশ হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে পারি। এই ধর্ষণ ও হত্যার কথা যাঁরা স্বীকার করেছেন, তাঁদের পরিবারের মেয়েদেরও ঠিক একই ঝুঁকি আছে।

ঝুঁকি কার কাছ থেকে? বরং প্রশ্ন করা যায়, কার কাছ থেকে না? ধর্ষণ যারা করে, তারা আমাদের চারপাশের আর দশটা পুরুষেরই মতো। ধর্ষণের মূলে আছে দুর্বলের ওপর জোর-খাটানো আগ্রাসী পৌরুষের ধারণা। মেয়েদের পুরুষের চেয়ে নিকৃষ্ট বলে ভাবার যুগ-যুগান্ত পুরোনো বদ্ধমূল মানসিকতা। অনেকে বলেন, মানুষের মনের জগতে বদল না এলে, মেয়েদের তথা সব মানুষের জীবনকে সমান দাম ও মর্যাদা দেওয়ার মানসিকতা গড়ে না উঠলে, ধর্ষণের মতো অপরাধ বন্ধ হবে না।

দিল্লিতে ‘নির্ভয়া’ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার ওপর তথ্যচিত্র বানিয়েছেন যুক্তরাজ্যনিবাসী চলচ্চিত্রকার লেজলি আডউইন। বছর দুই আগে ঢাকায় তাঁর সঙ্গে দেখা হলে তিনি বলেছিলেন, গলদটা সমাজের শিক্ষার মধ্যে। আর তিনি বলেছিলেন, আমাদের প্রজন্মের বা আমাদের সময়ের জন্য কোনো আশা নেই। ভবিষ্যতের একমাত্র আশা, আমরা যদি নতুন মনের মানুষ তৈরি করে যেতে পারি।

আমরা কি তা করছি? আমাদের এবং আমাদের গড়া এই সমাজের অসুস্থতার বিরুদ্ধে আমরা তো কই ক্ষোভে ফেটে পড়ছি না?

টাঙ্গাইলের মধুপুরে শালবনের মধ্য দিয়ে যাওয়া রাস্তার ওই অংশটি গা-ছমছমে নির্জন। ওই পথের নিয়মিত যাত্রীরা বলছে, সেখানে নাকি সন্ধ্যার পর যানবাহনের সঙ্গে পুলিশের পাহারা থাকার কথা। সেই দিন কি তা ছিল না? কেন? পুলিশ অবশ্য তৎপর হয়ে আসামিদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করেছে। হয়তো বিচারের আশাও করা যেতে পারে। কিন্তু তাতে এমন ঘটনা থামবে বলে ভরসা করতে পারছি না।

মধুপুরে নির্যাতিত নিহত মেয়েটির নাম আমার জানার দরকার নেই। তাঁর ছবি দেখার দরকার নেই। আমার অক্ষম হতবুদ্ধি মন নিয়ে আমি তাঁর কাছে ক্ষমা চাই। আর বলতে চাই, আমার মনের মধ্যে তাঁকে আমি চিনি। আতঙ্কিত, অসহায় আর বিপন্ন ওই মেয়েটি হতে পারি আমি বা আমারই ঘরের কোনো মেয়ে। যেকোনো দিন।

কুর্‌রাতুল–আইন–তাহ্‌মিনা: সাংবাদিক।

স/মা