মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি ঃ
পুরান ঢাকাবাসীর কোরবানীর পশু পছন্দের শীর্ষে মিরকাদিমের ধবল গরু। এছাড়াও ভূটান থেকে আনা ছোট ভুট্রো গরুরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সারাদেশে। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম একটি ঐতিহ্যবাহী বন্দর হলেও কেবলমাত্র ধবল গরুর জন্যই মিরকাদিম বিখ্যাত হয়েছে। আগে মিরকাদিমের পুরো এলাকা জুড়ে ঈদকে সামনে রেখে প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে প্রাকৃতিভাবে গরু মোটা তাজা করন করা হতো।এই মিরকাদিম পৌরসভায় যেসব এলাকায় গরু মোটাতাজা করন এবং প্রজনন পেশায় যারা নিয়োজিত ছিল তাদেরকে কুলো বলা হতো। কালের বিবর্তনে আস্তে আস্তে ধবল গরুর ঐতিহ্য কেউ ধরে রাখতে পারেনি।
এখন মিরকাদিমের ধবল গরুর নাম এবং সুনাম ব্যবহার করে পুরান ঢাকার কতিপয় কিছু অসাধু গরু ব্যবসায়ী ল্যাবটেলের মাধ্যমে সাদা গরুকে অল্পদিনেই মোটাতাজা করে প্রতারনার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা । আর ক্রেতা সাধারন ধবল গরুর নামে অন্য জেলার বাংলা গরু কিনে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে প্রতিবছর কোরবানীর ঈদে। সরেজমিনে মিরকাদিমে গিয়ে দেখা যায়. কোথাও কোন গরু মোটাতাজা করনের খামার নেই। কারো বাড়ীতে নেই গরু পালনের কোন ব্যবস্থা। পরিচর্চার করার জন্য জায়গা সংকট এবং প্রাকৃতিক খাবারের উৎস্য কমে যাওয়ায় খামারিরা এই পেশা বাদ দিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছে বলে জানান একাধিক এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ মিরকাদিমের ধবল গরুর নাম ব্যবহার করে পুরান ঢাকার গরু ব্যবসায়ী টিটু মোল্লা কয়েক বছর ধরে সাদা ধবল গরু ঈদের কয়েকদিন আগে মিরকাদিম ও এ আশপাশ এলাকায় এনে জড়ো করে।
গত বছর মিরকাদিমের টেঙ্গর আর গোপাল নগরে টিটু মোল্লার খামার ছিল। এ বছর তিনি সেটাকে কেরানীগঞ্জে নিয়ে গেছেন। তবে ঈদের আগে সেই খামারে ট্যাবলেটের মাধ্যমে মোটাতাজা করা সাদা বাংলা গরু গুলোকে মিরকাদিম বাজারে এনে তোলা হবে আর মিরকাদিমের ঐতিহ্যবাহী ধবল গরু বলে চালিয়ে দিবে। অপরদিকে ক্রেতারা হবেন প্রতারনার শিকার।
পুরান ঢাকার গরু ব্যবসায়ী টিটু মোল্লা ফোনালাপে জানান, পুরান ঢাকা এবং কেরানীগঞ্জ আমাদের খামার রয়েছে। প্রতিবছর মিরকাদিমে খামার করি । এ বছর মিরকাদিমের কোথাও খামার করিনি । আমরা ঈদের কয়েকদিন আগে মিরকাদিম হাটে গরু নিয়ে আসবো। অন্য জেলার বাংলা সাদা গরুগুলোকে মোটাতাজা করে মিরকাদিমের ধবল গরু বলে বিক্রি করে ক্রেতাদের ঠকাচ্ছেন কেন?এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ক্রেতারা দীর্ঘ বছর জেনেছে আমি মিরকাদিমের ঐতিহ্যবাহী ধবল গরু লালন পালন করে কোরবানীতে বিক্রি করি। এখন খামার অন্য জেলায় আছে এটা সত্যি । কোন জাতের গরু মোটাতাজা করি সেটা আমিই ভালো জানি।
অপরদিকে পুরো মিরকাদিম এলাকা ঘুরে শুধুমাত্র টেঙ্গরের একটি বাড়ীতেই ধবল গরুর পালন করতে দেখা যায়। বাপ দাদার পুরান এতিহ্য ধরে রাখতে কামাল এখনও ৪-৫ টি এতিহ্যবাহী ধবল গরু তার নিজ বাড়ীতে মোটাতাজা করন করছেন। কামাল এবং তার স্ত্রী ছাবিনা বেগম এ বছরও প্রাকৃতিক খাবার আর যতœ নিয়ে গরু লালন পালন করছেন কোরবানীর ঈদে বিক্রির জন্য। কামাল জানান, প্রতিবছর আমি ধবল গরু মোটাতাজা করে থাকি। আর কোন কোন বাড়ীতে গরু মোটাতাজা করা হয়? এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল বলেন,শুধুমাত্র আমি ছাড়া এবারও মিরকাদিমে কেউ কুরবানীর জন্য ধবল গরু লালন পালন করছেন না। খাবারের দাম এবং ঢাকার গরু ব্যবসায়ীদের কারনে এখন আর মিরকাদিমে ধবল গরু নেই । অন্য জেলার গরু ব্যবসায়ীরা আমাদের মিরকাদিমের ধবল গরুর নাম ব্যবহার করে ক্রেতা সাধারনের সাথে প্রতারনা করছেন।
স্থানীয় কোরবানীর গরু লালন- পালনকারী ইকবাল জানান,আগে প্রাকৃতিভাবে গরু মোটাতাজা করতাম এখন করিনা। কেন করেন না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে বাড়ীতে বাড়ীতে ধান. সরিষা, খেসারি ডাল ও তিল ভাঙ্গা হতো। সেখান থেকে খইল. খুদ পেতাম সেটা ছিল প্রাকৃতিক খাবার। এখন সব জিনিসেই ভেজাল দামও বেশী খরচে পোষায় না। তিনি আরো বলেন, এখন মিরকাদিমে কোন ধবল গরুর অস্তিত্ব নেই শুধু মাত্র নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
কুলো পাড়ার রুবেল মাদবর বলেন. পুরান ঢাকার কিছু অসাধু গরু ব্যবসায়ী শুধুমাত্র ধবল গরুর নাম ব্যবহার করে মানুষের সাথে প্রতারনা করে আসছে। আগে শুনতাম ঢাকার বিখ্যাত হাজীর বিরানী ঢাকাই পাওয়া যেত। এখন এটা নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত এসেছে। ক’দিন পর মুন্সীগঞ্জেও চলে আসবে অনেকটা এরকমই চলছে। ধবল গরুর নাম বিক্রি করে অন্য জেলার সাধারন গরুকে ধবল গরুর নাম দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মিরকাদিমের ঐতিহ্যবাহী ধবল গরুর সুনাম এবং ঐতিহ্য ফিরে পেতে পুরানো খামারীদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে সরকার এমনটাই প্রত্যাশা মিরকাদিম পৌর এলাকার কুলুপাড়াবাসীর।#
স/মা

