তাপস কুমার, নাটোর:
ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের দাপট, বাধা দিলেই অস্ত্রের ঝনঝনানি। বহিরাগতদের অভয়াশ্রম এখন নাটোরের নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারী কলেজ। কলেজে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতই অবাধ বিচরণ তাদের। কোনরকম বাধা ছাড়াই কলেজে ঢুকছে তারা। ক্যাম্পাসের বঙ্গবন্ধু ভবন ও প্রশাসনিক ভবনজুড়ে তাদের এক অন্যরকম আধিপত্য। একই অবস্থা কলেজ ছাত্রাবাসেও। সাধারন ছাত্রদের কক্ষগুলো তারা ব্যবহার করছে আগ্নেয়াস্ত্রসহ ধারালো অস্ত্র মজুদের নিরাপদ স্থান হিসেবে। তাদের প্রথম টার্গেট উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্রীরা। কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে এরা উত্যক্ত করছে ছাত্রীদের। আর সাধারণ ছাত্রদের জিম্মি করে কেড়ে নিচ্ছে নগদ টাকা-মোবাইল ফোনসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। তাদের বেপরোয়া আচরণে কলেজ ক্যাম্পাস কাঁপছে অস্ত্রের ঝনঝনানিতে। এসব বিষয় যাদের দেখার কথা, সেই কলেজ কর্তৃপক্ষ আমলেই নিচ্ছে না বিষয়টি।
অভিযোগ উঠেছে, কয়েক মাস যাবৎ ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের দৌরাতœ আগের সব রেকর্ড ভেঙ্গেছে। গত ১লা জুলাই থেকে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হবার পর থেকেই ১৫/২০ জন বখাটের একটি দল কলেজে অবাধে প্রবেশ করছে। নবনির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবনের নীচতলায় একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগ ও প্রশাসনিক ভবনে মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের ক্লাস চলার সময় বখাটেরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে দুই ভবনের বারান্দায় রীতিমত শোডাউন করে ও ছাত্রীদের উদ্দ্যশ্য করে অশালীন মন্তব্য করে। এমন বিব্রতকর অবস্থায় শিক্ষকরা দরজা বন্ধ করে ক্লাস নিতে বাধ্য হয়। ক্লাস শেষে শিক্ষক বেরিয়ে গেলে বখাটেরা শ্রেণিকক্ষে ঢুকে ছাত্রীদের উত্যক্ত করে।
ছাত্রীদের অভিযোগ, বখাটেরা তাদের উত্যক্ত করেই ক্ষান্ত হয় না। তাদের জন্য নির্ধারিত বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ও অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে। অনেকেই লজ্জায় এসব কথা শিক্ষকদের বলতে পারে না। এদের অশালীন কথাবার্তা থেকে শিক্ষিকারাও রক্ষা পায়না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের এক ছাত্রী জানা, কিছুদিন আগে তার এক সহপাঠীকে বখাটেরা উত্যক্ত করে। এর প্রতিবাদ করলে ওই ছাত্রীকে ক্লাস শেষে বাড়ি যাবার সময় কলেজের ভেতরেই যৌন হয়রানি করা হয়। এরপর ভয়ে সে কোন অভিযোগ করেনি।
জাহাঙ্গীর আলম নামে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র জানায়, কয়েক সপ্তাহ আগে কলেজ ছাত্রাবাসের সামনে কয়েকজন বহিরাগত যুবক তার পথরোধ করে ধারালো অস্ত্রের সামনে মোবাইল ফোন ও নগদ ১৬০০ টাকা কেড়ে নেয়। ঘটনাটি কাউকে জানালে তারা পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে পুলিশে দেয়ার হুমকি দেয়। পরে এক বড় ভাইয়ের মধ্যস্থতায় ফোন ফিরে পেলেও নগদ টাকা পায়নি সে।
বহিরাগতদের এমন বখাটেপনা কলেজ ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ থাকলেও তারা অস্ত্র, ছুরি ব্যবহার করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বড়গাছা ও স্টেশন বাজার এলাকায় ছিনতাই করে। ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত অস্ত্র রাখার জন্য নিরাপদস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে কলেজের শেরে বাংলা ছাত্রাবাস। গত বুধবার ছাত্রী উত্যক্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাজু ও বাপ্পির নেতৃত্বে একদল বহিরাগত যুবক কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। ওইদিন পুলিশ কলেজ ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে ১১৫ নম্বর কক্ষ থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, দুইটি ম্যাগাজিন, চারটি বুলেট ও চাইনিজ কুড়াল উদ্ধার করে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে নাটোর সদর থানায় অস্ত্র আইনে মমলা দায়ের করেন। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ছাত্রাবাসটি থেকে অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের এক শিক্ষক জানান, মূলত মাদক সিন্ডিকেটের কারণেই ক্যাম্পাসসহ পরিত্যাক্ত ছাত্রাবাসে বহিরাগতদের দৌরাতœ বেড়েছে। এদের সাথে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী জড়িত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছে না কলেজ কর্তৃপক্ষ। শুধু ঘটনা ঘটার পরই পুলিশকে জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি এস এম শাহাদাত রাজীব বলেন, কার্যকর ছাত্রসংসদ না থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবী গুলো তুলে ধরার মত কোন জায়গা নাই। ফলে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের দাপট বেড়েছে।
ছাত্রাবাসে অস্ত্রের মজুদ সম্পর্কে জানতে চাইলে ছাত্রাবাস সুপার অশোক কুমার পাল জানান, ছাত্রাবাসটি পরিত্যাক্ত ঘোষণার পর ছাত্রদের ছাত্রাবাস ছাড়তে নোটিম দেয়া হয়। অনেকে চলে গেলেও সেখানে কয়েকজন ছাত্র নিজ দায়িত্বে থাকে। তাদের জিম্মি করে বহিরাগতদের কেউ কেউ থাকে পারে।
এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সামসুজ্জামান বহিরাগতদের দৌরাতœ বাড়ার কথা স্বীকার করে জানান, কলেজ ক্যাম্পাস অরক্ষিত এবং ছাত্র সংসদ না থাকায় বহিরাগতদের প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হলে এই সমস্যা থাকবেনা বলে দাবী করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত না হয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
স/এষ্

