সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে বিএসএফকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহবান জানিয়েছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন। একই সঙ্গে ভারতীয় নাগরিকদের সচেতন বাড়ানোর উপরও গুরুত্বারোপ করেন।
বিজিবি বিএসএফ ৪৪ তম সম্মেলনের শেষ দিনে বিজিবি মহাপরিচালক বিএসএফ মহাপরিচালক এর সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক সাংবাদিকদের আলাপকালে এ কথা বলেন।
১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সীমান্ত সম্মেলনের বিষয়ে মঙ্গলবার বিকেলে বিজিবি সদর দপ্তরে এক সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্টিত হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
সম্মেলনে, বিজিবি মহাপরিচালক বাংলাদেশী নাগরিকদের গুলি করা ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ ধরণের মৃত্যুর ঘটনা শুন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বিএসএফ কর্তৃক সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন ও ভারতীয় নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিজিবি মহাপরিচালকের এমন উদ্বেগে বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, প্রাণঘাতি নয় এমন কৌশল অবলম্বন করার ফলে মৃত্যুর ঘটনা অনেক কমিয়ে আনা গেলেও অপরাধীদের দ্বারা বিএসএফ সদস্যদের উপর আক্রমণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিএসএফ সদস্যরা কেবল আত্মরক্ষার্থেই নন-লিথেল অস্ত্র দিয়ে ফায়ার করে। বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশী নাগরিকদের অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম বন্ধে বিজিবির সহযোগিতা কামনা করেন। মৃত্যুর ঘটনা শুণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে গবাদি পশু ও মাদক চোরাচালানপ্রবণ এলাকায় সমন্বিত যৌথ টহল, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের বিধি-নিষেধ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিজিবি ও বিএসএফ কর্তৃক যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হন। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা/হত্যার ক্ষেত্রে যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সনাক্তকরণ ও মূল্যায়নের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হন, যা এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে মতামত ও বোঝাপড়ার পার্থক্য কমিয়ে আনবে।
সম্মেলনে বিএসএফ মহাপরিচালক ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বাংলাদেশে সম্ভাব্য অবস্থান ধ্বংস এবং ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্তৃক অপহৃত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপদে মুক্তির লক্ষ্যে বিজিবির আরও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
এ প্রেক্ষিতে বিজিবি মহাপরিচালক সুস্পষ্ট ভাবে জানান, বাংলাদেশে কোন ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ক্যাম্প/অবস্থান নেই। বিজিবি মহাপরিচালক আরও জানান, বাংলাদেশ কখনও তার ভূমি অন্যকোন পক্ষকে বা কোন রাষ্ট্রের শত্রু পক্ষকে ব্যবহারের সুযোগ দেয় না এবং এটা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নীতিগত অবস্থান।
বিজিবি মহাপরিচালক পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নতুন ক্যাম্প নির্মাণের সুবিধার্থে ভারতের সীমান্ত সড়ক ব্যবহারের পরিকল্পনা অনুমোদনের জন্য ভারত সরকার এবং বিএসএফ এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এছাড়া প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকায় নিয়োজিত উভয় বাহিনীর সদস্যদের জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের ব্যাপারে উভয় পক্ষ সম্মত হন।
সমন্বিত সীমান্ত ব্যস্থাপনা পরিকল্পনা এর ওপর গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন ধরণের আন্ত:সীমান্ত অপরাধ যেমন- অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য যেমন; ইয়াবা (এমফিটামিন), জাল মুদ্রা, স্বর্ণ ও গবাদি পশু পাচার এবং সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ভেঙ্গে ফেলা, ডাকাতি, চুরি, অপহরণ ইত্যাদি প্রতিরোধে উভয় পক্ষই যথাযথ ও আন্তরিকভাবে সিবিএমপি বাস্তবায়নে সম্মত হন।
অস্ত্র গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক জাতীয় দ্রব্য চোরাচালানের বিষয়ে উভয় মহাপরিচালক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এসব প্রতিরোধে তাদের আন্তরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপারে সম্মত হন।
মানব পাচার ও অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হন। উভয় পক্ষের সদস্যদের যৌথ সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংগঠিত অপরাধী চক্রের তথ্য আদান-প্রদান, সীমান্তে অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধির লক্ষ্যে উভয় প্রতিনিধিদল সম্মত হন। এ সংক্রান্তে আন্ত:সীমান্ত অপরাধপ্রবণ এলাকার ম্যাপিং প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরী এবং মহাপরিচালক পর্যায়ের প্রতিটি বৈঠকের পূর্বে হালনাগাদ করা হবে।
বিএসএফ মহাপরিচালক জানান যে, পরিবেশ দূষণ রোধে ভারতের আগরতলা প্রান্তে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট- ইটিপি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের আখাউড়া প্রান্তে বক্স কালভার্টসহ ড্রেইনেজ নির্মাণ কাজ খুব শীঘ্রই শুরু হবে। একই সাথে এই স্থানটি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় এবং জয়েন্ট রিট্রিট সেরিমনি এর জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হবে।
বিএসএফ মহাপরিচালক ভারতের কারাগারে/সংশোধন কেন্দ্রে অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিকদের দ্রুত স্বদেশে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে তাদের জাতীয়তা যাচাইয়ের কাজ তরান্বিত করার অনুরোধ করেন। এ প্রেক্ষিতে বিজিবি মহাপরিচালক ভুক্তভোগী বাংলাদেশী নাগরিকদের সঠিক নাম, ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্যাদি প্রদানের অনুরোধ করেন, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাদের জাতীয়তা সনাক্তকরণের মাধ্যমে দ্রুততার সাথে প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়।
বিএসএফ মহাপরিচালক বৈঠকে অবহিত করেন যে, ভারত সরকার মেঘালয় প্রদেশ ছাড়া অন্যান্য এলাকার সীমান্ত পিলার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিএসএফকে অনুমতি প্রদান করেছে। এ প্রেক্ষিতে, উভয় পক্ষ সীমান্ত পিলার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের সাধারণ কর্মপদ্ধতি প্রণয়নে সম্মত হয়েছেন।
উভয় মহাপরিচালক ‘সীমান্ত হাট’ এর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ‘সীমান্ত পর্যটন’ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে নিজনিজ দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করতে সম্মত হন, যা সীমান্তে বসবাসকারী জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হবে।
বিএসএফ মহাপরিচালক জানান যে, বিজিবির ডগ প্রশিক্ষণ স্কুল স্থাপনের জন্য তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবেন।
বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনার পর পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছেন সেগুলো হলো; যৌথ প্রশিক্ষণ, যৌথ অনুশীলন, দুঃসাহসিক প্রশিক্ষণ যেমন- কায়াকিং , র্যাফটিং, সাইক্লিং, মাউন্টেন ক্লাইম্বিং ইত্যাদি, যৌথ ব্যান্ড ডিসপ্লে ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সফর বিনিময় যেমন- বিএসএফ ওয়াইভস্ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, সীমান্ত পরিবার কল্যাণ সমিতি, স্কুল শিক্ষার্থী, মিডিয়ার সাংবাদিক, শুটিং প্রতিযোগিতা, যৌথ রিট্টিট সেরিমনি যেগুলো উভয় বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়ন করা হবে। বিএসএফ পুরুষ ও মহিলা প্রশিক্ষক দ্বারা বিজিবি সদস্যদের ইয়োগা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া বিএসএফ বিজিবি সদস্যদের সন্তানদের মধ্য হতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভারতে মেডিক্যাল ও প্রকৌশল কলেজগুলোতে পড়াশুনার জন্য বৃত্তি প্রদান করবে।
উভয় মহাপরিচালক এবারের সম্মেলনের সফলতায় তাদের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তারা উভয়েই সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথভাবে কাজ করতে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। উভয় পক্ষ মহাপরিচালক পর্যায়ের পরবর্তী সীমান্ত সম্মেলন নয়াদিল্লীতে অক্টোবর/২০১৭ মাসের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সম্মত হন।
সম্মেলনে এ বিএসএফ মহাপরিচালক শ্রী কে কে শর্মা এর নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করেন। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন এর নেতৃত্বে ২৬ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করেন। প্রতিনিধিদল দু’টিতে উভয় বাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ, উভয় দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশন, বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশন, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
স/শা

