অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ৮৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচিত উক্তির কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ পরিচিত। এবার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ইস্যুতে মন্তব্য করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন তিনি। বরাবরের মতো এবারও বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। তার বক্তব্যে খোদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে রেখে প্রণীত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী যতবার আদালতে বাতিল হবে, ততবার তা সংসদে পাস করা হবে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। উচ্চ আদালতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সংসদে আবারও ষোড়শ সংশোধনী পাস হবে এবং অনবরতভাবেই এটি করতে থাকব। দেখি জুডিশিয়ারি কতদূর যায়। গত শুক্রবার সিলেটে নিজ নির্বাচনী এলাকায় স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, জাতীয় সংসদ আইন সভা। সবার ঊর্ধ্বে তার স্থান। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানে এ অধিকার জাতীয় সংসদকে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সামরিক সরকার এ অধিকার (বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা) খর্ব করেছিল বিধায় সংসদে পুনরায় তা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, আমরা বিচারকদের নিয়োগ দিই। কিন্তু জনগণের প্রতিনিধিদের ওপর তারা খবরদারি করেন। বিচারকদের এমন আচরণ ঠিক নয়।আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কমপক্ষে ৮ জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে উদ্ধৃত হয়ে কিছু বলতে চাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতারা বলেন, অর্থমন্ত্রী সিনিয়র মানুষ। উনি উনার নির্বাচনী এলাকায় ছিলেন। এর মধ্যে সাংবাদিকরা কি জিজ্ঞেস করেছেন, আর উনি কী বলেছেনÑ এটা উনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটা আওয়ামী লীগের দলীয় বক্তব্য নয়। আওয়ামী লীগের ওই নেতারা আরও বলেন, ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়টা এখন জাতীয় সংসদ ও সুপ্রিমকোর্টের বিষয়। আদালতের ক্ষমতাবলে আদালত রায় দিয়েছেন, সংসদ তার ক্ষমতাবলে যা যা করার করবে। ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়ের বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সংসদের বাইরে কথা বলায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলেও জানান দলটির নেতারা।এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের এক আইনজীবী নেতা আমাদের সময়কে বলেন, অর্থমন্ত্রী যেটি বলেছেন সেটি বাস্তবে সম্ভব। জাতীয় সংসদ চাইলে আবারও ষোড়শ সংশোধনী সংসদে পাস করা যাবে। এ বিষয়ে তিনি ভারতের একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারতের একটি বিখ্যাত কেইসের নাম শাহ বানো (শাহ ভানু) কেইস। ওই কেইসে উচ্চ আদালতের রায় বাতিল করে দেয় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ভারতের জাতীয় সংসদ। সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ চাইলে আদালতের যে কেনো রায় পুনর্বিবেচনা করতে পারেÑ বলেও যোগ করেন তিনি।এদিকে গতকাল শনিবার এক প্রতিক্রিয়ায় ষোড়শ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন, তা অন্তঃসারশূন্য, সংবিধান ও আদালত পরিপন্থী। সরকার চাইলেও এ বিষয়ে নতুন কোনো আইন করতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, এটা চাইলেও বদলানো যাবে না। গত ৪৬ বছরের ইতিহাসে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের এমন কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। এটা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। সংবিধান মানলে রায় মানতে হবে।অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করতে ছাড়েননি বিএনপি নেতারা। গতকাল শনিবার পৃথক দুই অনুষ্ঠানে আবুল মাল আবদুল মুহিতের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপির দুই নেতা। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘ভয়ঙ্কর’ বলে আখ্যা দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, সরকারের একজন অত্যন্ত সিনিয়র মন্ত্রী গতকাল (শুক্রবার) বলেছেন, যতবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হবে, ততবারই আবার তারা সেই বিল বা আইন পাস করবেন। অর্থাৎ সংবিধানকে সংশোধন করবেন। এটা একটা ভয়ঙ্কর কথা। এটাতে প্রমাণ করে যে, সুপ্রিমকোর্ট বা আমাদের উচ্চতম আদালত বা বিচার বিভাগের প্রতি তাদের কোনো আস্থা নেই এবং তারা এ বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না।ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে একে ‘অশনি সংকেতের ইঙ্গিত’ বলেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্য বার্ধক্যজনিত বা ক্ষমতা হারানোর হতাশার বিকার। তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। সুতরাং তার বক্তব্য সরকারেরই বক্তব্য। এমনিতে এ দেশে গণতন্ত্রের রুগ্ন অবস্থা, মৃতপ্রায়; সেখানে অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যে একটা অশুভ ইঙ্গিত বহন করছে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আদালতের প্রতি ক্ষমতাসীনদের অশ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করেন বিএনপির এই নেতা।অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিভিন্ন মহল থেকে পাল্টা বক্তব্য এলেও কোনো কথা বলেননি আওয়ামী লীগের নেতারা। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর দলটির সাধারণ সম্পাদক গতকালই প্রথম এ বিষয়ে কথা বলেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের এক অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে বলেন, কেউ কেউ সুপ্রিমকোর্টের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ায় মহাখুশি। এরা এভাবেই খুশি হয়। আনন্দের জগায় মাথায় নিয়ে নৃত্য করছে। পাশের কক্ষে কিছুক্ষণ আগে বলে গেছেন তারা (বিএনপি) আশার আলো দেখছেন। অন্য ইস্যু মরে গেছে। এ আশার আলোও অচিরেই নিভে যাবে। প্রসঙ্গত, রায় যেদিন ঘোষণা করা হয়, সেদিন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে।আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের ৭৯৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহলে। আইনি বিষয়ে দক্ষ এমন কিছু নেতাকে এ ব্যাপারে করণীয় ঠিক করার নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে দলের নেতাদের সংসদের বাইরে কথাবার্তা বলতেও নিষেধ করে দেন তিনি। কিন্তু অর্থমন্ত্রী হঠাৎ এ বিষয়ে মুখ খুলে ফেলেন শুক্রবার। আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষ্যমতে, অর্থমন্ত্রী মুরব্বী মানুষ, বয়স হইছে উনার। সবসময় সবকিছু মনে থাকে না।