তাপস কুমার, নাটোর:
নাটোরের আশপাশে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল। চলনবিলের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে আত্রাই, গুড় নদী, বরনাই নদী, বড়াল নদী, তুলসী নদী, চেচুয়া নদী, ভাদাই নদী ও গুমানী নদী। মেঘ গর্জন করলেই অঝোর ধারায় নেমে পড়ে বর্ষণধারা। এমনই ঐতিহাসিক বিলগুলোর মধ্যে একটি চলনবিল। এর ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা বিশাল। আর নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা এই তিনটি জেলার প্রায় নয়টি উপজেলায় বিস্তৃত ডোবা খাল জলাশয় নিয়ে গঠিত চলনবিল। বর্ষাকালে যেদিকে চোখ যায় শুধুই জলরাশি আর ঢেউয়ের খেলা। আবার শুষ্ক মৌসুমে দিগন্তরেখায় সবুজের আলপনা। তবে বর্ষাকালে প্রাণ ফিরে পায় চলনবিল। তাই ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এই মৌসুমে চলনবিল হতে পারে উপযুক্ত গন্তব্য। দেশ-বিদেশে পরিচিত এই বিলকে পর্যটকদের জন্য মোটেল সুবিধাসহ কয়েকটি দর্শনীয় স্পটে অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই এটি দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকায় পরিণত হবে বলে মনে করছেন চলনবিলবাসী।
নাটোর জেলার সিংড়া ও গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনা জেলার বনয়ারীনগর, ফরিদপুর, চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলা মিলে গঠিত প্রায় ১২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের চলনবিল এখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে। তবে এখানে পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বহু প্রতœতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে। তার মধ্যে নাটোরের দর্শনীয় স্থানগুলোর অন্যতম আকর্ষণ হলো- উত্তরা গণভবন, রাণী ভবানী রাজবাড়ী, দয়ারামপুর রাজবাড়ি, বনপাড়া লুদ্রের রাণী মা মারিয়া ধর্মপল্লী, বোর্ণী মারীয়াবাদ ধর্মপল্লী, শহীদ সাগর, শিব মন্দির । তবে শরতের শেষের দিকে শুরু হয় দুর্গাপূজা। আর তখন এখানকার মন্দিরে বাজে অবিরাম ঢোল-বাদ্য, আকাশে ওরে রঙিন ফানুষ, কীর্তন গানে মুখরিত থাকে পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস। নাটোরের চারদিকে ফুটে থাকে কত না কাশফুল। আর এসব দেখতে দেখতে এক নিমিষেই ফিরে যাবেন অতীত যুগে। তখন স্মৃতিতে ভেসে উঠবে পূজা-পার্বণের সেই পুরনো দিনগুলোর কথা। প্রাচীনকালে ক্ষুদ্র ইট দিয়ে তৈরি প্রতিটি মন্দিরের গায়ে রয়েছে অপরূপ কারুকাজ।
আজও নাটোর কবির কল্পনায় অমর হয়ে আছে কাব্যে। প্রাচীন ঐতিহ্য ও প্রতœতাত্ত্বিক ঐশ্বর্য মন্ডিত বরেন্দ্র ভূমি সংলগ্ন নাটোর জেলা। ২৪.২৬০ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯.৯০ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে নারদ নদের উত্তর তীরে নাটোর শহর অবসিহত। আধুনিক কালের এ শহরটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এক অধ্যায়। একে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ সামন্তরাজ ও এক মহীয়সী নারীর রাজ্য শাসন ও জনকল্যান ব্যবস্থা। কথিত আছে মোঘল আমলের পাঠান জমিদার লস্কর খাঁ তাঁর সৈন্য সামন্তদের জন্য যে সহান (বর্তমান পুঠিয়া এলাকা) হতে রসদ সংগ্রহ করতেন, কালক্রমে তার নাম হয় লস্করপুর পরগনা। এই পরগনার একটি নীচু জলাভূমির নাম ছিল ছাইভাংগা বিল।
১৭১০ সনে রাজা রাম জীবন রায় এ সহানে মাটি ভরাট করে তার রাজধানী সহাপন করেন। কালত্রুমে তা প্রাসাদ, দীঘি, উদ্যান, মন্দির ও মনোরম অট্টালিকা দ্বারা সুসজ্জিত নগরিতে পরিনত হয়। মোঘল আমলের কিছুকাল বর্তমান নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা গ্রামে চাপিলা পরগনার কেন্দ্র এবং পরবর্তীতে জেলা সদর ছিল বলে জানা যায়। পরে চাপিলা অস্বাস্থ্যকর স্থান বিবেচিত হওয়ায় জেলা সদর নাটোরে স্থানান্তরিত হয়। ১৮২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নাটোরে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার সদর কার্যালয় ছিল। স্বাস্থ্যগত কারণে বিশেষকরে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের কারণে ইংরেজ সরকার ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে জেলা সদর নাটোর হতে রামপুর বোয়ালিয়ায় (বর্তমান রাজশাহী) স্থানান্তর করেন। নাটোর মহকুমা সৃষ্টি হয় ১৮৪৫ সালে। নাটোরকে স্বাস্থ্যকর করে গড়ে তোলার জন্য ১৮৬৯ সালে নাটোর পৌরসভা স্থাপিত হয়। ১৯৮৪ সালে নাটোর মহকুমা থেকে জেলায় রূপান্তরিত হয়।
এদিকে দেশের উৎপাদিত মাছের অন্যতম প্রধান উৎস নাটোরের চলনবিল অঞ্চল। কিন্তু প্রতি বছর এ অঞ্চলে কমছে মাছের উৎপাদন, বিলুপ্ত হচ্ছে মাছের প্রজাতি। অথচ মাছে ভাতে বাঙালি বাংলার চিরায়ত প্রবাদ। কিন্তু মানুষের নানামুখী হস্তক্ষেপের কারণে ইদানীং কমতে শুরু করেছে মাছের উৎস। একই সঙ্গে হুমকির মুখে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। তার মধ্যে কিছু মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে সম্পূর্ণরুপে। বিশেষ করে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, মানসম্মত পোনার অভাব, বিল এলাকায় প্রাকৃতিক জলাভূমির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, ফসলি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং ডিমওয়ালা মাছ ধরার কারণেই বিলুপ্ত হয়েছে দেশি প্রজাতির ২৫ রকমের মাছ। আর বিলুপ্তির পথে রয়েছে এমন মাছের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়।
অপরদিকে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চলনবিলের শুঁটকি মাছ চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। স্থানীয় বাজার সৃষ্টি, শুঁটকি সংরক্ষণাগার তৈরি আর সেই সঙ্গে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতিতে এই শুঁটকি তৈরি করতে পারলে তা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। যার ফলে মৎস্য সম্পদে ভরপুর চলনবিল এলাকার মৎস্যজীবীদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে শুঁটকি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে চলনবিলের মাছ স্বাদযুক্ত হওয়ায় এ মাছের শুঁটকির চাহিদাও বেশি। বিশেষ করে বছরের ৬ মাস টেংরা, পুঁটি, চান্দা, চিংড়ি, গুচিসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ শুকিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়।
নাটোর সদর উপজেলার প্রবীন ব্যক্তি গনেশ পালের সাথে কথা বললে তিনি জানান, বর্ষাকালে যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। চলনবিল জুড়ে শুরু হয় ঢেউয়ের খেলা। আবার শুষ্ক মৌসুমে মাঠভরা সবুুজ আর সবুজ, গোলাভরা ধান। তবে বর্তমানে দেশীয় প্রজাতির কিছু মাছ হারিয়ে যাচ্ছে।
স/মা

