ওভালে আজ ৩০৫ রান করেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিততে পারেনি বাংলাদেশ। রানে ভরা এই উইকেটে স্কোরটা যে কিছু নয়, সেটি বুঝেছে বাংলাদেশ। মাশরাফি বিন মুর্তজাও স্বীকার করে নিচ্ছেন রানটা কম হয়ে গেছে।
৩০০ রান—হৃষ্টপুষ্ট স্কোর বলতে হবে। কিন্তু এই সময়ে আইসিসির টুর্নামেন্টের রানপ্রসবা উইকেটে স্কোরটা যে নিরাপদ নয়, আজ ভালোভাবেই বুঝেছে বাংলাদেশ। ম্যাচ শেষে মাশরাফিও তা মানছেন, ‘৩০০ সব সময়ই ভালো স্কোর, তবে এই উইকেটে আমাদের রান কম হয়ে গেছে। তারা অসাধারণ ব্যাটিং করে ম্যাচটা আমাদের হাত থেকে নিয়ে গেছে।’
বাংলাদেশ প্রথম ৫ ওভারে করেছে ১৪, শেষ ৫ ওভারে ৪৩ রান। শুরুটা যেমন ধীর, শেষে উইকেট হাতে রেখেও ঝড়টা তীব্র করতে ব্যর্থ। সংগ্রহটা তাই বিশাল পাহাড়ে রূপ নেয়নি। কেন প্রত্যাশা অনুযায়ী রান হয়নি, সেটির ব্যাখ্যায় বাংলাদেশ ওয়ানডে অধিনায়ক বললেন, ‘শুরুতে উইকেটে সুইং ছিল। ব্যাটসম্যানরা একটু সময় নিয়েছে। তবে পরে সাত-আট উইকেট হাতে রেখে আমাদের আরও ভালো করা উচিত ছিল।’
বাংলাদেশ আজ আট ব্যাটসম্যান নিয়ে খেলেছে। এতে আরেকজন বোলারের প্রয়োজনীয়তা ভালোভাবে অনুভব করেছে বাংলাদেশ। একাদশ নির্বাচন ঠিক ছিল না কি না, সে প্রশ্ন তাই উঠছে। মাশরাফির উত্তর, ‘প্রথম ম্যাচ, তাই আটজন ব্যাটসম্যান নিয়ে খেলেছি। এটা নিয়ে ভাবতে হবে। মূল বোলারদের ভালো করতে হবে। বাড়তি একজন বোলার নিয়েও চিন্তা করতে হবে।’
বাংলাদেশের উপলব্ধি তাই দুটি: রানটা কম হয়ে গেছে, বোলারের সংখ্যাটাও।
তামিম কি ক্যাচটা আসলেই ঠিকভাবে নিতে পেরেছিলেন? এ প্রশ্নটা এখন অনেকের মনেই উঁকি দিচ্ছে। এটা নিয়ে কেবল আক্ষেপ করা যায়। সান্ত্বনা খোঁজা যায়। বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ ম্যাচ আসলে হেরে গেছে আরও আগে। অনায়াসে ৩০৫ রান তাড়া করে জিতেছে ইংল্যান্ড। ১৬ বল ও ৮ উইকেট হাতে রেখে। যা চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে রান তাড়া করে জেতার নতুন রেকর্ড।
ইনিংসের তৃতীয় ওভারে মোস্তাফিজের দুর্দান্ত ওই ক্যাচটিই শুধু ব্যতিক্রম। ওই ক্যাচের কাছাকাছি সময়েই শুধু কিছুক্ষণের জন্য মনে হয়েছিল, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে প্রত্যাবর্তন জয় দিয়েই করছে বাংলাদেশ। কিন্তু জেসন রয়ের আউটটা শেষ পর্যন্ত ম্যাচে কোনো প্রভাবই ফেলল না। সাকিবসহ মাত্র ৪ মূল বোলারকে নিয়ে মাঠে নামা বাংলাদেশের দুর্বল বোলিংয়ের পুরো ফায়দা তুলে নিল ইংল্যান্ড।
এ ম্যাচে বাংলাদেশের বোলিং থেকে সান্ত্বনা খুঁজতে গেলে প্রায় দেড় যুগ আগের স্মৃতিতে ফিরতে হচ্ছে, প্রতিপক্ষের অন্তত এক ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরি করতে না দেওয়া। এ ছাড়া আর যে সাফল্য নেই!
দুর্ভাগা ব্যাটসম্যানটির নাম অ্যালেক্স হেলস। ধীরে সুস্থে ইনিংস গড়ে আস্তে আস্তে খোলস ছেড়ে বের হতে শুরু করেছিলেন মাত্র। সাব্বির রহমানের লেগ স্পিন কাম অফ স্পিন বলে টানা দুই বলে চার-ছয় মেরে তৃতীয় বলটাতে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে আউট হয়েছেন সীমানায়। অবশ্য এর আগেই বাংলাদেশের সর্বনাশ লিখে ফেলেছেন তিনি। ৮৬ বলে ১১ চার ও ২ ছক্কায় তাঁর ৯৫ রানের ইনিংসই তো বাংলাদেশের ৩০৫ রানের পাহাড়কে টিলার রূপ দিয়ে দিল।
হেলস যখন আউট হলেন, জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের তখনো ১৪১ রান দরকার ছিল। বল ছিল ১৩২। কিন্তু জো রুট ও এউইন মরগান সেটা টের পেতে দিলে তো। একজন পরিপূর্ণ বোলারের অভাব যে বাংলাদেশ এর আগ থেকেই বোধ করতে শুরু করেছে! তবু ৩৬ তম ওভারে একটু আশা ফিরে পেয়েছিল বাংলাদেশ। যখন লং অনে মরগানের একটি শট ঝাঁপিয়ে তালুবন্দী করলেন তামিম। কিন্তু ওটা আউট ছিল কি না তা নিয়ে মাঠের আম্পায়ারের সন্দেহ টিভি আম্পায়ারও কাটাতে না পারায় লাভ হলো না কোনো। তখন ওই আউটটা হলে সমীকরণ দাঁড়াত ৮৬ বলে ১০২ রানে।
এমন অবস্থায় ম্যাচে ফিরতে হলে অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাতে হতো বাংলাদেশি বোলারদের। কিন্তু আগের ৩৫ ওভারে যা হয়নি, সেটা বাদবাকি সময়েও করা হয়নি। আজ দিনটা যে বোলারদেরই ছিল না। ম্যাচের কোনো মুহূর্তেই বাংলাদেশের বোলাররা কখনো আতঙ্ক ছড়াতে পারেননি। কখনো মনে হয়নি, একটু হলেও অস্বস্তিতে আছেন ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। রুট (১৩৩ *) ও মরগান (৭৫ *) মিলে তাই ১১৬ বলে ১৪৩ রানের জুটি গড়ে নিলেন প্রায় অনায়াসে।
আরও একবার বৃথা গেল তামিমের অসাধারণ এক ইনিংস। তাঁর ১২৮ ও মুশফিকের ৭৯ রানের ইনিংস দুটি; তৃতীয় উইকেটে দুজনের ১৬৬ রানের জুটিতে ৩০৫ রানের পুঁজি পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু পঞ্চম স্পেশালিস্ট বোলারের শূন্যতা সব বৃথা করে দিল।
টুর্নামেন্টের যা ফরম্যাট, তাতে এক ম্যাচ হারলেই সমীকরণ কঠিন হয়ে যায়। তবু বাংলাদেশ এই ম্যাচের ভুল শেখে শিখে, ইতিবাচক দিকগুলো থেকে প্রেরণা নিয়ে সামনের দিকেই তাকাবে নিশ্চয়ই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ৩০৫/৬ (তামিম ১২৮, মুশফিক ৭৯, সৌম্য ২৮, সাব্বির ২৪, ইমরুল ১৯, সাকিব ১০, মাহমুদউল্লাহ ৬*, মোসাদ্দেক ২*; প্লাঙ্কেট ৪/৫৯, স্টোকস ১/৪২, বল ১/৮২)।
উইকেট পতন: ১-৫৬ , ২-৯৫ , ৩-২৬১, ৪-২৬১, ৫-২৭৭, ৬-৩০০।
ইংল্যান্ড: ৪৭.২ ওভারে ৩০৮/২ (রুট ১৩৩*, মরগান ৭৫*,হেলস ৯৫; সাব্বির ১/১৩, মাশরাফি ১/৫৬)।
উইকেট পতন: ১-৬, ২-১৬৫।
ফল: ইংল্যান্ড ৮ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: জো রুট।
স/এষ্

