প্রতিশ্রুতি দিয়েও কেউ কথা রাখেনিপ্রতিশ্রুতি দিয়েও কেউ কথা রাখেনি বড়াইগ্রাম ট্র্যাজেডির নিহত পরিবারের কান্না থামেনি আজও
তাপস কুমার, নাটোর:
দিন, মাস ও বছর ঘুরে তৃতীয়বারের মত নাটোরের বড়াইগ্রামের ট্র্যাজেডি দিবসটি চলেও গেল নীরবে, অগোচরে ও অজান্তে গত ২০ অক্টোবর। দিবসটিতে নিহতদের স্মরণে ছিল না কোনো স্মরণ সভা বা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন। ছিল না সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে যানবাহন চালক বা জনগণ নিয়ে গণসচেতনতামূলক কোনো কর্মশালা। দিবসটি শুধু নিরবে কাঁদিয়েই গেল স্বামী হারা বিধবাকে, সন্তান হারা পিতা-মাতাকে এবং পিতা-মাতা হারা এতিমকে। ২০১৪ ইং সালের এই দিনে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে বড়াইগ্রামের রেজুর মোড়ে ঘটে যাওয়া দেশের সবচেয়ে বড় মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় ৩৭ জনের অকাল মৃত্যুর তৃতীয় বর্ষপূর্তি পার হয় গত ২০ অক্টোবর শুক্রবার। দেখতে-দেখতে তিনটি বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তান হারা মা আর স্বামী হারা বিধবাদের কান্না আজো থামেনি। নিহতদের বিধবা স্ত্রী, এতিম সন্তান, বাবা-মা এখনও নিজেদের স্বজনের শোকে অশ্রু বিসর্জন দেন। সরেজমিনে নিহতদের পরিবারের খোঁজ-খবর নিয়ে দেখা যায়, দুর্ঘটনার কথা মনে করে কেউবা শোক থামাতে না পেরে মনের অজান্তে বিলাপ করে কাঁদছেন তাদের প্রিয়জনদের জন্য। আবার সাংবাদিকদের পরিচয় পেয়ে কেউবা জড়িয়ে ধরে অঝোরে বিরামহীন কান্নায় প্রকাশ করলেন অকালে স্বজন হারানোর বুকে জমে থাকা ব্যাথার কথা। কেউবা দেখালেন কাঁচের আয়নাতে বেঁধে রাখা স্বজনদের ছবি। এ ছবিই এখন স্বজনদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও গত তিন বছরে ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আরো প্রায় আড়াইশ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে, তিন বছর পরও দুর্ঘটনার স্থানটিকে ব্ল্যাক স্পট ঘোষণা দেয়াসহ মোড়টিকে প্রশস্ত করার প্রতিশ্রুতি, আর নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের দাবী পূরণ আজও হয়নি। এর কারণে নিহতের স্বজনেরা হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জানা যায়, সেদিন একটি হত্যা মামলায় নাটোর কোর্টে হাজিরা দিয়ে অথৈ পরিবহণে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। পথে রেজুর মোড়ে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী কেয়া পরিবহণের সাথে অথৈ পরিবহণের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩৬ জন। এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে বেশ কিছু দিন পর মারা যান অপর এক স্কুল শিক্ষক। দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে দুজন বাদে সবাই জেলার বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। সেদিন দুর্ঘটনায় স্বজন হারানোর আচমকা সংবাদে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা এলাকা। দুর্ঘটনার পর নাটোর জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত নিহত ৩৭ জন হলেন- গুরুদাসপুর উপজেলা প্রকৌশলী চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানার পাইকপাড়া গ্রামের হাফিজুর রহমান (৫৫) এবং ফেনীর ফুলগাজী থানার বড়াইয়াগ্রামের বীরেন্দ্র কিশোর তিলকের ছেলে শৈলেন তিলক (৪০)। এ দুইজন বাদে গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড়ের রেজাউল করিম (৪৫), গাড়িষাপাড়ার আবুল খায়ের (৫৫), উত্তর নাড়িবাড়ির আলম (২৮), সিধুলী গ্রামের ময়েজ উদ্দিনের ছয় পুত্র যথাক্রমে আতাহার আলী (৬৫), রায়হান (৬৩), রব্বেল (৬০), সোহরাব (৫৭), ছহির (৪২), কহির (৩৮), একই গ্রামের আয়নাল (৩৫), এবাদ আলী (৬৫). লাবু (৩০), শরিফ (৩০), তোফাজ্জল (৩২), আলাল (৫৫), বাহাদুর (৩০), আজাদ আলী শেখ (৫৫), জহুরুল ইসলাম (৩৫) একই উপজেলার পাটপাড়া গ্রামের জাফর (৫৫), সোনাবাজু গ্রামের হানিফ শেখ (২৯), পুঠিমারি গ্রামের প্রভাষক রেজাউল হক (৪৫), তেলটুপি গ্রামের ফাতেমাতুজ্জোহরা (৮), রানী আক্তার (৩৫), বাবুল আক্তার বাবলু (৪০), জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার সংগ্রামপুর গ্রামের আ. রহমান (৫৫), তার স্ত্রী আরিফা (৪৫), বাজিতপুর গ্রামের কিসমত আলী (৫৫) ও আয়নাল হক (৩২), বড় পিঙ্গুইন গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অব্দুল কুদ্দুস (৬৬), খোকসা গ্রামের শ্রী কৃষ্ণপদ (৫০), জোনাইলের রহমত আলী (৫০), ইকরি গ্রামের মশিউর রহমান মনি (২৫) তার ভাগ্নি সেবা (৫), তারানগর গ্রামের জোনাইল ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক জামাল উদ্দিন (৩৮) তার মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস (৪), চামটা গ্রামের জানমোহাম্মদ মাষ্টার (৫৫), পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চকপাড়া গ্রামের স্কুল শিক্ষক আজাদুল বারী (৩৫)।
দুর্ঘটনার পর থেকেই উত্তরবঙ্গ ও বৃহত্তর রাজশাহীর প্রবেশ দ্বার হিসেবে খ্যাত দেশের ব্যস্ততম ৫৫ কিলোমটিার দীর্ঘ বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কটি চার লেনবিশিষ্ট প্রশস্তকরণ সহ রেজুর মোড়ে তাদের স্মরণে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের দাবী জানিয়ে আসছিলেন এলাকাবাসী। কিন্তু এ পর্যন্ত এখানে কোন স্মৃতি স্তম্ভ বা অন্য কোন নিদর্শন স্থাপন করা হয়নি। এতে রেজুর মোড়সহ মহাসড়কের অন্যান্য স্থানে দিন দিন দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। এদিকে, দুর্ঘটনার কয়েক ঘন্টা পরই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে সেতু ও সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের রেজুর মোড়কে ঝুকিপূর্ণ মোড়ের আওতায় এনে প্রশস্তকরণের আশ^াসও দিয়েছিলেন। দিবসটিতে গত শুক্রবার উপজেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের উদ্যোগে নিজস্ব কার্যালয়ে মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত আলোচনা সভায় স্মরণকালের বৃহত্তম দুর্ঘটনার এ দিবসটিকে কর্তৃপক্ষের নিকট ‘সড়ক দুর্ঘটনায় গণসচেতনতামূলক দিবস’ ঘোষণা দেওয়ারও দাবী জানান বক্তাগণ। বক্তাগণের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বনপাড়া শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা অনার্স কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা, আহম্মেদপুর আজম আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আসাদ-উজ-জামান, বনপাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জি.এম সামস্ নূর ও নাটোর জেলা নিরাপদ সড়ক চাই সংগঠনের সভাপতি সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা। সভাটি পরিচালনা করেন উপজেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম মৃধা ও সহসভাপতি মো. জাহিদুল ইসলাম। সভা শেষে নিহতদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
স/মা

