এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট অফিস : বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে অতি দরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের সৃজনশীল কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নজরদারির দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নজরদারি না থাকায় এ অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ৪০ দিনের কর্মসূচির নামে চলছে পুকুরচুরি। যার কারণে এ এলাকায় মানুষের মুখে মুখে কর্মসূচি এখন ‘৪০ দিনের চুরি কর্মসূচি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের মহৎ কর্মসূচি।
উপজেলার ১৬ ইউনিয়নে এই কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে গত ৬ মে থেকে একযোগে শুরু হয়েছে কর্মসংস্থান কর্মসূচি। প্রতিটি ইউনিয়নেই সংশ্লিষ্ট মেম্বারদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এ কর্মসূচির কার্যক্রম। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন সরকারি কর্মকর্তা ট্যাক অফিসার হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। তদারকি না থাকায় প্রতিটি প্রকল্পে ইউপি সদস্যরা নির্ধারিত শ্রমিক সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ আবার কোথাও দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিক দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। আবার অনেকে শ্রমিক তালিকায় নামে আছে কিন্তু কাজে নেই। শ্রমিক তালিকায় রয়েছে ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ থেকে দলীয় নেতাকর্মীরা।
সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রকল্প ঘুরে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। উপজেলার বহরবুনিয়া ইউনিয়নের দুটি প্রজেক্টে পাওয়া গেছে ব্যপক অসংগতি গিয়ে দেখা গেছে
মার্চ থেকে মে বা জুন মাস পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলে তেমন কোন কাজ থাকে না। এ সময় অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর কষ্টে দিন কাটে। এমনটি ভেবে বর্তমান সরকার বছরের প্রথমদিকে ৫/৬ মাস ধরে চালু করেছেন অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচী। এই কাজের আওতায় শ্রমিকরা নিজ এলাকায় ৬ ঘন্টা কাজ করে ১শ’ ৭৫ টাকা বেতন পাবেন। প্রতিটি পর্বের কাজ চলবে ৪০ দিন। সকল ইউনিয়নে এ কাজের জন্য প্রকল্প তৈরী করা হয়েছে। যারা এই প্রকল্পে কাজ করবে তাদের নিবন্ধনও হয়ে আছে আগে ভাগেই।
এই কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে গত ৬ মে। কিন্তু কোন কোন প্রকল্পের কাজ আদৌ শুরু হয়নি। শুরু হওয়া অধিকাংশ প্রকল্পে নেই নিবন্ধিত ও নির্ধারিত সংখ্যক শ্রমিক। এই কর্মসূচীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্তই থাকছে অনিয়ম, দুর্নীতি। কাজ চলছে কাগজ কলমে। যার বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
রবিবার (১৪ মে) বহরবুনিয়া ইউনিয়নের দুটি প্রজেক্টে পাওয়া গেছে ব্যপক অসংগতি। ৩নং ওয়ার্ডের ফুলহাতা বাজারের কাছে চলছে একটি রাস্তা সংস্কারের কাজ। এখানে প্রতিদিন ১শ’ ৩১ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। কিন্তু কাজে আছেন মাত্র ১২ জন। এই প্রকল্পটি দেখাশোনার দায়িত্ব সংরক্ষিত নারী আসনের ইউপি সদস্য মাকসুদা বেগমের। তার স্বামী হারুন অর রশিদের নাম রয়েছে এখানে শ্রমিকের তালিকায়। প্রকল্পটি তিনিই তদারকি করছেন। তবে এখানে কতজন শ্রমিক কাজ করার কথা তা লেবার সর্দার দেলোয়ার হোসেন মোল্লার জানা নেই।
কর্মরত শ্রমিক শহিদুল হাওলাদার, হাসিব, ইমরান, লিয়াকত, ইলিয়াস, সোহেল, হাসান, রিপন ও আবেদ বলেন, ‘আমরা ১শ’ ফুট মাটি কেটে দিবো ১০ হাজার টাকায় এই চুক্তিতে কাজ করছি’। লেবার সর্দার বলেন, ‘শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই নগদ টাকার চুক্তিতে কাজ করানো হচ্ছে’।
১৩১ জন শ্রমিকের স্থলে মাত্র ১২ জন শ্রমিক ও কেন চুক্তিতে কাজ করানো হচ্ছে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য মাকসুদা বেগম ছবি বলেন, ‘কোন লোক কাজ করতে চায় না। তাই কাজের স্বার্থেই এভাবে চালানো হচ্ছে’।
এই ইউনিয়নের অপর একটি প্রকল্প রয়েছে ৪নং ওয়ার্ডে। কাগজ পত্রে এখানে শ্রমিক রয়েছে ৪২ জন। প্রকল্প এলাকায় গেলে স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, এখানে কোন কাজই শুরু হয়নি’। এ সম্পর্কে প্রজেক্ট চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য মো. মাসুদ হোসেন মোবাইল ফোনে জানান, ‘আমি ও চেয়ারম্যান সাহেব জরুরি কাজে ঢাকায় আছি। ফিরে এসে কাজ শুরু করবো’।
এ সম্পর্কে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এতো অসংগতি, অনিয়ম কোথাও থাকার কথা নয়। তবে আগামী দিন থেকে ওই ইউনিয়নের সকল প্রজেক্টের কাজ বিশেষভাবে নজরদারি করা হবে এবং তদন্তসাপেক্ষে উল্লেখিত অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচীর উপজেলা সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ ওবায়দুর রহমান বলেন, বহরবুনিয়া ইউনিয়নের বিষয়ে আমি অবগত হয়েছি। কোন প্রকার অনিয়ম প্রশ্রয় দেওয়া হবে না’।
এ বিষয়ে জানার জন্য ইউপি চেয়ারম্যান মো. রিপন তালুকদারের ০১৭১৫৭৫৭৩১২ নং মোবাইলে একাধিকবার রিং করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
স/এষ্

