“বদলগাছিতে পথের ধারে সন্দেশ বেচেই দাদুর ৩৬বছর ”
“”সন্দেশ দাদুর হারনা মানা জীবনের গল্প””
খালিদ হোসেন মিলু, বদলগাছি(নওগাঁ) প্রতিনিধি: নওগাঁর বদলগাছি উপজেলা শহরের মাঝ পথ দিয়ে বয়ে চলা এক সময়ের খোরস্রোতা নদী ছোট যমুনা। নদীর উপরে বহু আগে নির্মিত বেইলি ব্রীজ। পুরাতন এই বেইলি ব্রীজের মোড়ে ৩যুগ ধরে বসে থাকা খানিকটা বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বৃদ্ধ আজিমুদ্দীনকে কমবেশি সকলেই চেনেন।
পুরাতন ব্রীজের পূর্ব পাশে মোড়ে উপরে টিনের ছাউনি চারপাশে খোলা আর ছাউনির নিচে চৌকিতে বসা ৮৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ তার সামনে রাখা আছে একটি সন্দেশ ভর্তি ডেস্কি। নেই বাড়তি কোনো চাকচিক্য। সাদামাটা ভাবে ডেস্কিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সন্দেশ। তবে বেচাকেনা চলছে দেদার। এটি নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার ছোট যমুনা নদীর পুরাতন বেইলী ব্রীজের পূর্বপাশে সন্দেশ দাদুর দোকান । সন্দেশ দাদুর দোকানের ছানার তৈরী সন্দেশের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন অঞ্চলে।
উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের কদমগাছি গ্রামের বাসিন্দা আয়েজ উদ্দীনের ছেলে আজিমুদ্দীন। তিন যুগ আগে পিতার অভাব অনটনের সংসারের হাল ধরতে ছেলে আজিমুদ্দীন নিজেই সন্দেশ তৈরি করে বিক্রি শুরু করেন। আস্তে আস্তে আশপাশের গ্রামে সেই সন্দেশ দাদুর ছানার সন্দেশের সুনাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এখন সেই সন্দেশ দাদুর সুস্বাদু ছানার তৈরি সন্দেশ এলাকার গন্ডী পেরিয়ে দাদুর সন্দেশ এর খ্যাতি দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
বয়স বেড়ে যাওয়ায় এখন আর নিজে সন্দেশ তৈরি করতে পারেনা তবে তার সুনাম ধরে রাখতে তার ছেলে এবারত এখন সন্দেশ তৈরি করেন। কাকডাকা ভোরে মুঘ থেকে উঠে শুরু হয় সন্দেশ তৈরীর কাজ।
দাদুর ছেলে আর ছেলের বউ দুজনেই সন্দেশ বানানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করেন। সন্দেশ তৈরির জন্য প্রথমে দুধ থেকে ছানা তৈরি করা হয়। এর মধ্যে এলাচ, চিনি অথবা গুড় দিয়ে মিশ্রণ তৈরি পর সন্দেশ তৈরি করে। সেই সন্দেশ দাদু নিয়ে গিয়ে ব্রীজের মোড়ে বিক্রি করেন। দোকানের সামনে ক্রেতাদের চিরচেনা ভিড়।
প্রতি কেজি ছানার সন্দেশ ৪শত টাকা দরে বিক্রি হয়। প্রতিদিন ৫ হাজার টাকার সন্দেশ বিক্রি হয় এতে ১হাজার টাকা লাভ হয়ে থাকে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ৫ বিকেল পর্যন্ত সন্দেশ বিক্রি করেন দাদু। পথে ধারে ব্রীজের মোড়ে ৩৬বছর ধরে সন্দেশ বিক্রি করেই চলে সন্দেশ দাদুর সংসার।
বদলগাছি ব্রীজের মোড়ে সন্দেশ খেতে খেতে গল্প হয় প্রতিবেদকের সাথে সন্দেশ দাদু আজিমুদ্দীনের। গল্পে গল্পে সন্দেশ দাদু জানান, পিতার অভাবের সংসারে লেখাপড়ার তেমন বেশি সুযোগ হয়নি।জীবন জীবিকার টানে এক সময় পেটের দায়ে পায়ে হেটে বদলগাছি থেকে সাপাহার, মদইল, সহ বিভিন্ন বাজারে গিয়ে মরিচ বিক্রি করতেন।
বাজারে পিপাসা পেলে ভাম্যমান সন্দেশ এর দোকানে এক পিচ সন্দেশ খেয়ে পেট ভরে পানি খেতেন। এক সময় ভাবলেন
তিনিও সন্দেশ বিক্রি করবেন। আর সেই থেকে শুরু হয় সন্দেশের ব্যবসা। ৩৬বছর যাবত দাদু সন্দেশ বিক্রি করছেন।
সন্দেশ বিক্রি করে দাদুর অভাবের সংসারে ভাগ্যরচাকা বদল হয়েছে। সংসার ফিরেছে স্বচ্ছলতা।সংসারে তার বউও ছেলেমেয়েদের ভরণপোষণ থেকে শুরু করে পুরোটা পরিবারের সকল চাহিদা মিটিয়ে সন্দেশ বিক্রি টাকায় কিনেছেন তিন বিঘা জমি, মাথা গোজার জন্য ঠাঁই হিসেবে নির্মাণ করেছেন ৫খোপ ইটের পাকা বাড়ি।
এখন সুখ ধরা দিয়েছে দাদুর সংসারে, কিন্তু সুখের সময় তার পাশে নেই সহধর্মিণী। বেশ কয়েক বছর আগে দাদুর সহধর্মিণী মারা গেছে।ছেলে ইবারত ও ছেলের বউ সহ নাতি নাতনীদের নিয়ে বেশ ভালোই চলছে দাদুর সংসার।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দাদুর দোকানের সামনে দেখা যায় মানুষের খানিকটা আনাগোনা । বর্ষ বরণে বাঙালি প্রাণের উৎসবে মেতে উঠেছে আর সেই উৎসবকে ঘিরে মিষ্টির চাহিদা বেড়ে গেছে। উৎসবের রঙে রাঙিয়ে অনেকেই দাদুর দোকানে সুস্বাদু সন্দেশ নিতে এসেছেন।
বদলগাছিতে বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছেন রতন। বদলগাছি আসার পর এখানে সন্দেশ খেতে তিনি এ দোকানে আসেন। রতন বলেন, এত ভালো সন্দেশ এর আগে কখনো খাইনি। দারুণ স্বাদ। সন্দেশের মানও বেশ ভালই।
হলুদ বিহার গ্রামের বাসিন্দা রনি বলেন, জেলার বাইরের মানুষের কাছেও দাদুর সন্দেশ পরিচিত। অনেকেই এই সন্দেশের স্বাদের ভক্ত। এই সন্দেশের কথা মনে হলেই জিবে পানি আসে। এই সন্দেশকে স্থানীয়রা নাম দিয়েছে ব্রীজের সন্দেশ আবার সন্দেশ দাদুর সন্দেশ নামে ও পরিচিত।
কোলা থেকে দাদুর দোকানে নিয়মিত সন্দেশ খেতে আসা মাহবুব, পিপলু, আবু সাইদ আঙুর, মিলন,লেবু সহ অনেকে জানান, আমরা প্রতিনিয়ত দাদুর দোকানে সন্দেশ খাওয়ার জন্য আসি।দাদুর ছানার সন্দেশ এর
স্বাদই আলাদা।
কোলা ইউপির সাবেক ইউপি সদস্য শাহিন বলেন, আমি প্রায় দাদুর দোকানে সন্দেশ নিতে আসি, আমার ছেলে মেয়ে দাদুর ছানার সন্দেশ খুব পছন্দ করে। সন্দেশ এর স্বাদ অতূলনীয়।
পাহাড়পুর থেকে এক তরুন এসেছে সন্দেশ নিতে নতুন ভাবিকে দাদুর সন্দেশ খাওয়ানোর জন্য।
কোন কাজই ছোট নয়, এমনটা প্রমাণ করেছেন ক্ষুদ্র সন্দেশ ব্যবসায়ী আজিমুদ্দীন। সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। সময়ের সাথে দাদুর সন্দেশ এর সুখ্যাতি এখন দেশ জুড়ে।
স/এষ্

