রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড ও শিল্প এলাকার রাস্তা ফের দখলে চলে যাচ্ছে। তেজগাঁও মেইন রাস্তাসহ অলিগলিতে বাস-ট্রাকের সারি। এতে ভোগান্তিতে পড়ছে রাতে চলাচলরত পথচারী ও যানবাহন। দিনেও এমন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অথচ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার রাস্তা পার্কিংমুক্ত ঘোষণা করেছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র প্রয়াত আনিসুল হক। তার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পার হতে না হতেই ফের রাস্তা দখলে চলে যাচ্ছে। বাস-ট্রাক মালিক কর্তৃপক্ষ বলছে, রাস্তা দখল করা ছাড়া পার্কিংয়ের বিকল্প নেই। পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাস্তা দখল করে পার্কিং করা হচ্ছে। তাদের উচ্ছেদ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরের আগের ঘটনা। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তার জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে থাকত শত শত ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান।
ফলে রাস্তা দিয়ে যান চলাচল দূরের কথা পথচারীদের চলতেও কষ্ট হতো। কিন্তু ডিএনসিসির মেয়র প্রয়াত আনিসুল হক নির্বাচিত হয়ে সেই রাস্তা দখলমুক্ত করেন। তিনি ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড পার্কিংমুক্ত ঘোষণা করেন। যদিও এসব কাজ করতে গিয়ে তাকে বাধা-বিপত্তি ও একশ্রেণির প্রভাবশালীর তোপের মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার একটি ঘরে তাকে অবরুদ্ধও করে রাখা হয়। তবে জীবনের মায়া ত্যাগ করে এবং অন্যায়ের কাছে নতিস্বীকার না করে নগরবাসীর আস্থার প্রতিদান দিয়েছিলেন তিনি। পরে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে দুই লেনের প্রশস্ত রাস্তা ও অত্যাধুনিক টয়লেট নির্মাণ করেন। স্বস্তি ফিরে আসে নগরবাসীর মাঝে। রাস্তা দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে শুরু করে পথচারী, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, রিকশা-ভ্যানসহ ছোট যান। দূরত্ব কমে যায় তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারের। অথচ মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পার হতে না হতেই সেই রাস্তা ফের ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের দখলে চলে যাচ্ছে। তবে শুধু তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড নয়, অবৈধ দখল থেকে মুক্ত করা মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনের রাস্তা ও তেজগাঁও শিল্প এলাকার সড়কগুলো দখল নিয়েছেন বাস-ট্রাক, পিকআপ-ভ্যান চালকরা। রাত হলেই তারা সড়কে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করছেন। মঙ্গলবার রাতে সরেজমিন দেখা গেছে, তেজগাঁও মূল সড়কের দুই পাশে কোথাও এক লাইন, কোথাও দুই লাইনে করে পার্কিং করা হয়েছে শত শত ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও বাস। বিশেষ করে মহাখালী থেকে মগবাজার-ময়মনসিংহ রোডে ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুরগামী বাসগুলো মূল সড়কে দুই লাইনে দাঁড়িয়ে। ফলে এই সড়ক দিয়ে কোনোভাবে একটি বাস কিংবা ট্রাক যাতায়াত করতে গিয়েও ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এ কারণে গভীর রাতেও দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। একই অবস্থা তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের সামনের সড়ক ও ফনিক্স রোডে। শত শত ট্রাক সড়কের দুই পাশে দুই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এর ফলে ভোগান্তিতে পড়ছে ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী পথচারী ও যানবাহন। এই দুই এলাকার রাস্তা দিয়ে কোনোরকম একটি বাস কিংবা গাড়ি পার হতে পারলেও নাবিস্কো থেকে গুলশান লিঙ্ক রোডসহ শিল্পাঞ্চল এলাকার রাস্তাগুলোয় এমনভাবে গাড়ি রাখা হয়েছে যে, রিকশা চলাচল দূরের কথা মানুষ চলাচলেরও জায়গা থাকছে না। রাস্তায় অবৈধ এই পার্কিংয়ের কারণে ওই এলাকায় চুরি ও ছিনতাই বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পথচারী ও পরিবহন শ্রমিকরা। তারা বলছেন, মেয়র আনিসুল হক অসুস্থ হওয়ার পর থেকে রাস্তা দখল শুরু হয়েছে। তিনি মারা যাওয়ার পর তা আরও বেড়ে গেছে। দ্রুত এসব রাস্তা পার্কিংমুক্ত ও লাইটের ব্যবস্থা করে নগরবাসীর চলাচলের উপযোগী করা হোক।
গতকাল দুপুরে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেছে, তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে তেজগাঁও রেললাইনের দিকে একটু যেতেই উত্তর ও দক্ষিণ পাশের রাস্তা পিকআপ ভ্যানের দখলে। বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি ও ড্রাইভার্স ইউনিয়ন অফিস থেকে রেললাইন পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে ট্রাক রাখা। এতে যানজট তৈরি হয়েছে। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার ফনিক্স রোডের দুই পাশ ট্রাক ও প্রাইভেট কারের দখলে। ফলে বিপাকে পড়ছে এসব রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী পথচারী ও যানবাহন। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এক লাইন, দুই লাইন করে অবৈধভাবে রাস্তা দখল করে রাখছে বাস-ট্রাক। ফলে এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের উৎপাত বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে মাদক ও দেহ ব্যবসায়ীদের তৎপরতা। জনগণের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত রাস্তাগুলোকে দখলমুক্ত রাখা এবং লাইটের ব্যবস্থা করা দরকার। এতে নগরবাসী নিরাপদে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি এ কে এম বাকীবিল্লাহ জানান, মহাখালী বাস টার্মিনালের ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৮৫০ গাড়ির। অথচ গাড়ি রয়েছে ৪ হাজারের বেশি। ফলে তেজগাঁও শিল্প এলাকার বিভিন্ন ফাঁকা রাস্তায় এক লাইন করে বাস রাখা হচ্ছে। তাও বাস মালিক কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনের এক প্রকার সমঝোতার মাধ্যমে। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিকদের একাধিক অফিস রয়েছে। এ ছাড়া এসব এলাকায় ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানে মাল লোড-আনলোড করায় রাস্তায় জায়গার স্বল্পতা দেখা দেয়। কিন্তু কোনো ট্রাক লোড-আনলোড ছাড়া রাস্তায় দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। যদি কোনো যানবাহন দাঁড়ায়ও তাদের বলা মাত্র চলে যাবে। ব্যত্যয় হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স/এষ্

