ঢাকাশুক্রবার , ২৮ এপ্রিল ২০১৭
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

ডিজিটাল শিক্ষকদের এ্যানালগ জীবন নাটোরে অর্ধশত আইসিটি শিক্ষকের মানবেতর জীবন

admin
এপ্রিল ২৮, ২০১৭ ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি
বেতন ছাড়ে অর্থ মন্ত্রণালয় আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠি চালাচালির যাঁতাকলে পড়েছেন দেশের ১ হাজার ৭শ ৩০ জন আইসিটি শিক্ষক। দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগদানের প্রায় ৬ বছরেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি এসব শিক্ষকদের। আইসিটি শিক্ষক হওয়া স্বত্বেও দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পেয়ে তাদের কাটাতে হচ্ছে এ্যানালগ জীবন যেখানে না পাড়ছেন চাকুরি ছাড়তে- না পারছেন বেতন ভাতা পেয়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে।
দেশব্যাপী দীর্ঘ আন্দোলন আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস পাওয়ার পরও দীর্ঘ প্রায় ৬ বছরেও মেলেনি বেতন। মাস শেষে অন্যান্য শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কম্পিউটারের ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখালেও সং¬িশ্লষ্ট আইসিটি শিক্ষকের বেতন হয়নি আজও। পরিবারের শিশু-সন্তানসহ অন্যান্য সদস্যদের মুখে হাসি ফোটানোর আন্তরিক চেষ্টা থাকলেও বেতন না পাওয়ায় বুকের মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা আর ক্ষোভ নিয়ে দিনাতিপাত করছেন আইসিটি শিক্ষকরা।
তথ্যমতে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কম্পিউটার শিক্ষা চালু করেন। সে সময় কম্পিউটার বিষয়ে নিয়োগকৃত প্রায় ১২ হাজার শিক্ষকের বেতন ভাতাও প্রদান করা হয়। পরবর্তিতে আবারও ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বর দেশব্যাপী বেশ কিছু সংখ্যক কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। এরপর ২০১২ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টি আবশ্যিক বিষয় হিসেবে পাঠ্য সূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই বিষয়টি পড়ানোর জন্য দায়িত্ব পান কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। বর্তমানে নাটোরে বেতন না পাওয়া এসব আইসিটি শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় অর্ধশত আর সারা দেশে ১ হাজার ৭শ ৩০ জন ।
সিংড়া উপজেলার বৃষ্ণপুর ইটালী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের আইসিটি শিক্ষক মশিউর রহমান জানান, তার পরিবারের ৭ ভাই ২ বোনের মধ্যে তিনি ৫ নম্বর। ২০০৫ সালে তিনি বগুড়ার আজিজুল হক কলেজ থেকে এমএ পাশ করার পর ২০১২ সালের শেষের দিকে তিনি নিয়োগ পান। পরিবারের শিক্ষিত ছেলে হিসেবে তার ওপর অন্য সকল সদস্যরাই বিভিন্ন আশা করে থাকেন কিন্তু বেতন না পাওয়ায় তিনি তার পরিবারের বড় ও ছোটদের কাছে প্রত্যাশিত আদর বা শ্রদ্ধার পরিবর্তে তিরস্কারের পাত্র হয়েছেন। এমনকি তার স্ত্রী ও ৬ বছর বয়সের একমাত্র ছেলে সোয়াইর মাঝে মাঝে কিছু আবদার করলেও তিনি তা রক্ষা করতে পারেন না। স্ত্রীর কাছে স্বামীর বা ছেলের কাছে বাবার সামান্য দাবী পূরণ করতে না পারার অসামর্থ কি যে কষ্টের তা তিনি ক্ষণে ক্ষণে উপলব্ধি করছেন। একজন অশিক্ষিত দিন মজুরও দিন শেষে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরলে পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি দেখতে পায় অথচ এমএ পাশ করার পরও বেতন না হওয়ায় তিনি সেই দিন মজুরের সমান সম্মানও পান না বলে দাবী করেন তিনি।
সিংড়া বাজারের বালুয়া-বাসুয়া এলাকার আলহাজ্ব আব্দুর রহিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের আইসিটি শিক্ষক রুখসানা পারভীন জানান, ২০১৪ সালে তিনি নিয়োগ পান। তার স্বামীরা যৌথ পরিবারে বসবাস করেন। পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ৮ জন। পরিবারে তার স্বামীই এখন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার স্বামী একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বহুকষ্টে স্বামী ও শ্বশুড় পরিবারের লোকজনকে ম্যানেজ করে তিনি চাকুরীতে যোগদান করেছিলেন। তার বর্তমানে এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলেটি স্থানীয় ইংলিশ মিডিয়াম বিয়াম স্কুলের ছাত্র। পরিবারের লোকজন আশা করেছিলেন, চাকুরী করে তিনি পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছুটা সহায়তা করতে পারবেন। এছাড়া তার আশা ছিল, চাকুরী করে বেতনের একটা অংশ দরিদ্র বাবা-মা-ভাই-বোনকে প্রতি মাসে দিবেন। ছেলে-মেয়ের শখ পূরণ করবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন চাকুরী করা হলেও আজ পর্যন্ত তার বেতন পাশ হয়নি। মাঝে মাঝেই স্বামী ও পরিবারের লোকজন বিরক্ত হয়ে তাকে চাকুরী থেকে পদত্যাগ করতে বলে কেননা চাকুরী করতে গিয়ে তিনি তার ছেলে-মেয়েদের যথার্থ দেখাশোনা করতে পারেন না।
এক প্রশ্নের জবাবে রুখসানা পারভীন দাবী করেন,বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারের বর্তমান সরকারের ভূমিকা অনস্বীকার্য দেশের সকল শিক্ষকদের বেতন দিগুন করেই এই সরকার সন্তুষ্ট হয়নি বরং শিক্ষকদের উৎসব পালনের কথা চিন্তা করে সম্প্রতি প্রায় ৬শ কোটি টাকা উৎসব ভাতা বরাদ্দ দিয়েছেন। কিন্তু দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বানানোর অঙ্গিকারে আবদ্ধ যে সকল কম্পিউটার শিক্ষক নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। তাদের মধ্য ১৭৩০জন শিক্ষককে বঞ্চিত রেখেছে সকল সুবিধা থেকে এ যেনো আনন্দ উৎসবে বঞ্চিত মানূষের কান্না। দেশকে সমৃদ্ধশালী এবং মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে এই ১৭৩০জন কম্পিউটার শিক্ষককে সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না দাবী করে তিনি অনতিবিলম্বে তিনিসহ এমপিও বঞ্চিত সকল আইসিটি শিক্ষকদের বেতন চালুর জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবী জানান।
তিনি আরও দাবী করেন, তার পরেও অনেকে অন্য বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে তাদের বেতনাদী মাস মাস উত্তোলন করছেন কিন্তু তিনি পাচ্ছেন না। চাকুরী পেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরিবর্তে মনের অন্যান্য আশা পূরণের চিন্তাও এখন ক্ষিণ হয়ে গেছে বলে দাবী করেন তিনি।
নাটোর জেলার এমপিও বঞ্চিত আইসিটি শিক্ষকদের দাবী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণের প্রায় শেষ সন্ধিক্ষণে পৌছেছে বাংলাদেশ। এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের যে কেউ ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা ভোগ করছে। অথচ কোমলমতি শিশুদের আইসিটি বিষয়ের যারা শিক্ষক তাদের বেতন বঞ্চিত রেখে একদিকে যেমন এসব শিক্ষকদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে অপরদিকে বেতন বঞ্চিত এসকল শিক্ষকরা পেটে ক্ষুধা রেখে সঠিক পাঠদান করতেও বাধাগ্রস্থ হচ্ছেন।
তাই সরকারের পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কারিগর এসকল শিক্ষকদের অনতিবিলম্বে এমপিও প্রদান করা হোক এমনটাই প্রত্যাশা করছেন মানবেতর জীবন যাপন কারী জেলার আইসিটি শিক্ষকরা।
বিষয়টি সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ এমপিও বঞ্চিত আইসিটি শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি আশিকুজ্জামান বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এমপিও বঞ্চিত আইসিটি শিক্ষকদের বেতন চালুর দাবীতে তারা সংগঠনের পক্ষ থেকে ঢাকায় দীর্ঘ ২৩ দিন আন্দোলন করেছিলেন (১৫.৫.১৬ থেকে ৬.৬.১৬)। এসময় শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ওয়াহেদুজ্জামান স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সমস্যাটি সমাধানে তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু সে আশ্বাস এখনও পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সারা দেশে ১ হাজার ৭শ ৩০ জন আইসিটি শিক্ষকের বেতন ছাড়ের বিষয়টি এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তদন্তাধিন বলে তিনি শিক্ষামন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র থেকে সম্প্রতি শুনেছিলেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি বরং অর্থ মন্ত্রণালয় আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। আর এই চিঠি চালাচালির যাঁতাকলে পড়ে দুর্বিসহ এ্যানালগ জীবন যাপন করছেন দেশের এই ১ হাজার ৭শ ৩০ জন আইসিটি শিক্ষক।
তিনি দাবী করেন, ২৩.২.২০১৭ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে চিঠি প্রেরণ করে। আর ০১.০৩.২০১৭ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরকে চিঠি প্রদান করেন।
এর প্রেক্ষিতে গত ৯ এপ্রিল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ওয়াহেদুজ্জামান স্বাস্বরিত এক চিঠিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয় যে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট আইসিটি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সংখ্যা ৮ হাজার ৯শ ২৫ জন। এদের মধ্যে বেতন পান ৭ হাজার ৭শ ৩ জন। বেতন পান না ১ হাজার ২শ ২২ জন। দেশের কলেজ পর্যায়ে মোট আইসিটি বিষয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা ১ হাজার ৫শ ৭৪ জন। এদের মধ্যে বেতন পান ১ হাজার ৩শ ৯২ জন। অপরদিকে বেতন পান না ১শ ৮২ জন। মাদ্রাসাগুলোতে আইসিটি বিষয়ে মোট নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সংখ্যা ৩ হাজার ৬৬ জন। এদের মধ্যে বেতন পান ২ হাজার ৭শ ৭৩ জন। আর বেতন পান না ২শ ৯২ জন। সবমিলিয়ে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেতন না পাওয়া আইসিটি শিক্ষকদের সংখ্যা ১৭৩০ জন। একই পত্রে উল্লে¬খ করা হয়, বিজ্ঞান বিষয়ে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেতন না পাওয়া শিক্ষকদের সংখ্যা ২১৮ জন।

স/এষ্