ঢাকারবিবার , ৭ মে ২০১৭
  1. Bangla
  2. chomoknews
  3. English
  4. অপরাধ
  5. অভিনন্দন
  6. আমাদের তথ্য
  7. কবিতা
  8. কর্পরেট
  9. কাব্য বিলাস
  10. কৃষি সংবাদ
  11. খুলনা
  12. খোলামত
  13. গল্প
  14. গাইড
  15. গ্রামবাংলার খবর

চলনবিলবাসী ৩৫ বছরেও এমন অবস্থার মুখোমুখি হয়নি

admin
মে ৭, ২০১৭ ১:৪৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এখন শুধুই চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ

তাপস কুমার, নাটোর:
এ যেন স্বপ্নের মধ্যে দুঃস্বপ্ন! কারো কাছে এটি মৌসুমের একমাত্র আবাদ। কারো কাছে ঋণের টাকায় আবাদ করা ফসল। বছরের এই সময়টা কৃষকের ঘরে চলতে থাকে নতুন ধান তোলার প্রস্তুতি, জমিতে চলে কৃষকের ফসল কাটার প্রাণান্ত পরিশ্রম।
অথচ এ বছর চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলায় চলছে কৃষকের নীরব কান্না। প্রকৃতির নির্মম প্রতিকূলতা চলনবিলবাসীর চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ বসিয়ে দিয়েছে। কৃষকের কষ্টের ফসল বোরো ধান ডুবেছে ভারী বর্ষণ ও বিলদহর-কৃষ্ণনগর বাঁধ দিয়ে ঢুকে পড়া আত্রাই নদীর পানিতে। এই পানিতেই ডুবেছে আলু, বাদাম, ভুট্টা, পাট, তরমুজ, করলাসহ অন্য ফসল। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফসল কাটার বিষয়টি। এমন বিপর্যয়েও কৃষকের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে শ্রমিকরা। স্বাভাবিকের চেয়ে চারগুণ মজুরি দিয়েও কৃষক পাচ্ছেন না ধানকাটার শ্রমিক। ফলে কৃষকের চোখের সামনেই পানির নিচে নষ্ট হচ্ছে ধানসহ অন্য ফসল। আর বিল এলাকার লাখ লাখ টাকার মাছের তো কোনো হিসাবই নেই। সব ভেসে গেছে। বাঁধ থাকলেও বাধা দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় খুব সহজেই পানি ঢুকেছে বাঁধসংলগ্ন সিংড়া উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে। আর গুরুদাসপুর উপজেলার দরদমা, পিপলা, বিলসা, হাড়িভাঙ্গা এলাকায় বৃষ্টির পানি না নামতে পেরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে কৃষকের আধাপাকা বোরো ধান। এভাবেই হাওরের কান্না এখন চলনবিলে। দুই উপজেলার কৃষকরা আতঙ্কিত হয়ে ইতোমধ্যে কেটে নিয়েছে অপরিপক্ব বোরো ধান। গত ৩৫ বছরেও এমন অবস্থার মুখোমুখি হয়নি চলনবিলবাসী। জানান দীর্ঘদিন ধরে সিংড়ায় বসবাসরত প্রবীণ লোকজন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাঁধ সংস্কার বা পুননির্মাণের বিষয়টি প্রয়োজন মনেই করেনি স্থানীয় প্রশাসন। বিল এলাকায় অপরিকল্পিত রাস্তা, কালভার্ট নির্মাণ এবং ফসলি জমিতে ইচ্ছেমতো পুকুর খননই এবারের বিপর্যয়ের মূল কারণ। এছাড়াও বছর ছয়েক আগে স্থানীয় মৎস্যজীবীদের ‘বাঁধ খুলে দেওয়ার’ হঠকারী সিদ্ধান্তে নিজেদের নীরব সমর্থনকেও দায়ী করছেন সিংড়ার ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক। তাদের দুর্ভাগ্য, এই ‘খুলে দেওয়া’ বাঁধ দিয়েই সর্বপ্রথম আত্রাই নদীর পানি প্রবেশ করে চলনবিলে। ফলে প্রচণ্ড স্রোতে মঙ্গলবার বিকাল থেকে চলনবিলে পানি ঢুকতে দেখা গেছে।
রবিবার সরেজমিন সিংড়া ও গুরুদাসপুরের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অসহায়ত্বের করুণ দৃশ্য। সিংড়া উপজেলার বিলদহর বাজার এলাকার কৃষক ওহাব মিয়ার ৩৬ বিঘা জমির সমস্ত বোরো ধান পাকার ঠিক আগে ডুবেছে পানিতে। ষাটোর্ধ্ব এই কৃষক মৌসুমের একমাত্র আবাদ চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। পরিবারে কর্মক্ষম কেউ না থাকায় কীভাবে এ ধান তিনি ঘরে তুলবেন তা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
পাটকোল গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাককে দেখা গেলো দুইভাইসহ ডুবে যাওয়া ধান কাটতে। একভাই কোমর পানিতে ডুবে ধান কাটছেন আর অন্য দুজন সেই ধান দড়িতে বেঁধে টেনে নিয়ে আসছেন বিলের পাড়ে। রাজ্জাক জানান, ধানকাটার জন্য দিনমজুর না পাওয়ায় কাজ ফেলে ভাইদের নিয়ে নিজেই নেমেছেন। আগে ২৫০ টাকা দিলেই যেখানে ধানকাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যেতো, সেখানে হাজার টাকায়ও রাজি হচ্ছেন না কেউ। তারা আরো বেশি টাকা চান।
বাঁধ সংলগ্ন কৃষ্ণনগর গ্রামের কৃষক মজিবর রহমান বলেন, ‘২৫ বিঘা জমির সব ধান এবার পানিতে গেলো, কীভাবে ব্যাংকের ঋণ শোধ করবো, কীভাবে সংসার চালাবো এই চিন্তায় ঘুম চলে গেছে ।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন জানান, কয়েক বছর এরকম ফসলহানির ঘটনা না ঘটায় কৃষকের এরকম অবস্থা মোকাবেলায় কোনো প্রস্তুতি ছিল না, যার দরুন এমন বিপর্যয়। তবে অচিরেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তার প্রত্যাশা।
সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল আহসান জানান, নতুন করে কোনো এলাকা প্লাবিত হয়নি। আবার আবহাওয়া ভালো থাকায় পানি একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। বিরূপ কিছু না ঘটলে আগামী দু-একদিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একইভাবে গুরুদাসপুরেও টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে পাকা ধান পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এখানে ক্ষয়ক্ষতি সিংড়ার চেয়ে কম হয়েছে। তবে এ এলাকায় ধানের প্রায় সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে মাছের। উপজেলার দরদমা, বিলশা, পিপলা, হাঁড়িভাঙ্গা, চাকলবিলে বৃষ্টির পানি জমে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাছ ভেসে যায় কয়েক লাখ টাকার। অতিবৃষ্টিতে জমিতে পানি আটকে থাকায় আতঙ্কে কৃষক পাকা ধানের পাশাপাশি আধাপাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন।
বিলশা গ্রামের কৃষক রুবেল আলী বলেন, ‘ধান ডুবতে দেখে নষ্ট হওয়ার ভয়ে কেটে নিয়েছি, কাঁচা-পাকা দেখার ফুরসত পাইনি’।
পিপলা গ্রামের বেলাল হোসেন আক্ষেপের সুরে জানান, ‘ধান কাটবো যে কামলাও মিলছে না। ভুট্টারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাছও গেছে ২ লাখ টাকার।’
বিয়াঘাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাম্মেল হক বলেন, ‘পুকুর খননের ফলাফল এবার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে গুরুদাসপুরবাসী। অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে পুকুর খননের কারণে মূলত এ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
তবে গুরুদাসপুর এলাকায় কী পরিমাণ ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তা সুস্পষ্ট জানাতে পারেননি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল করিম।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, উপজেলায় ধানের জমি প্লাবিত হয়েছে। সেই সঙ্গে মাছ ভেসে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন। তাদের সাহায্য করছে কৃষি বিভাগ।
বৃহস্পতিবার সিংড়া উপজেলার মোক্তারপুর, নিংগুইন, পাটকোল, সারদানগরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন। তিনি বলেন, অসময়ে নেমে আসা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য তালিকা তৈরি করতে ইতোমধ্যে কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কর্মকর্তাকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অতিদ্রুত নতুন বাঁধ ও স্লুইসগেইট নির্মাণ এবং পুরাতন বাঁধগুলো যাতে সংস্কার করা হয় সে বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এমন অবস্থায় শুক্রবার সিংড়া উপজেলা এসব দুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তবে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা সবার আগে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সিংড়া উপজেলায় প্রায় ১৫শ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে।

স/এষ্