মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টি গতকাল রাজধানীতে ডেকে আনে ছয় ঘণ্টার অসহনীয় যানজট আর সীমাহীন দুর্ভোগ। সামান্য বৃষ্টি মানেই জলজট, যানজট আর ভোগান্তি যেন ঢাকার নাগরিক জীবনের নিত্যদিনের সূচিতে পরিণত হয়েছে। দুপুরের এক ঘণ্টার বৃষ্টি নামতে সময় লেগেছে ছয় থেকে আট ঘণ্টা। কোনো কোনো এলাকার রাস্তা গভীর রাত পর্যন্ত পানিতেই ডুবে ছিল। এতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় নগরবাসীকে। এমনকি রাস্তার পাশের ফুটপাথগুলোও পানিতে ডুবে যাওয়ায় মানুষের হাঁটার কোনো উপায় ছিল না।

মালিবাগ, রাজারবাগ, আরামবাগ, ফকিরাপুল, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশে থাকা ডাস্টবিনের ময়লা বৃষ্টির পানিতে মিশে মারাত্মক দূষণ তৈরি করছে। বৃহস্পতিবারও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয় পানিবন্দী হয়ে পড়ে আগের দিনেই মতো। গতকাল সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই অফিস শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টা পরও কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারেননি। এ সময় তারা পানিবন্দী ছিলেন।

গতকাল সচিবালয়ের অভ্যন্তরে এমন কোনো খোলা জায়গা ছিল না যেখানে বৃষ্টির পানি জমেনি। দুপুর আড়াই থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ঢাকার প্রায় অর্ধেকই পানিতে তলিয়ে যায়। পড়ন্ত বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তায় অসংখ্য যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে মানুষকে ব্যয় করতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস হওয়ায় কর্মজীবী মানুষের মাঝে অফিস শেষে বাসার  ফেরার তাড়া একটু বেশিই কাজ করে। কিন্তু বৃষ্টি, জলজট, যানজট আর দুর্ভোগ অফিস ফেরত মানুষের মাঝে কোনো তাড়া সৃষ্টি করতে পারেনি এই দিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে, রিকশায়, বাসে কিংবা রাস্তায় কাটাতে হয়েছে রাজধানীবাসীকে। চট্টগ্রামের পর এবার ঢাকার রাস্তায়ও নৌকা চলতে দেখা গেছে। গতকাল রাজধানীর শান্তিনগরে বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া সড়কে লাইফবোট দিয়ে মানুষকে পারাপার করিয়ে দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এতে দেখা যায়, কয়েকটি নৌকা টেনে নিচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে এই বর্ষায় সব এলাকায় লাইফবোট সুবিধা দেওয়া সম্ভব না হলেও সবচেয়ে বেশি দুর্গত এলাকাগুলোতে ১০-১৫টি লাইফবোট এখন থেকে কাজ করবে। সরেজমিন দেখা যায়, দুপুরের পর বৃষ্টি থামার সঙ্গে সঙ্গে থমকে যায় রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো। শাহবাগ থেকে টঙ্গীগামী প্রধান সড়ক, নিউমার্কেট থেকে মিরপুরগামী সড়ক, রামপুরা বনশ্রী, পুরানা পল্টন, নয়া পল্টন, ফকিরাপুল, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ীসহ প্রায় সব সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হয় গভীর রাত পর্যন্ত। এতে স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রী, অফিস ফেরত মানুষসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। হাঁটু পানি ভেঙে হাঁটার সময় অনেকেই সরকারের বিভিন্ন দফতর, সিটি করপোরেশন ওয়াসার প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। পথচারীদের অনেকেই বলতে থাকেন বর্ষার আগে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করলে এত বেশি দুর্ভোগ হতো না। একদিকে বৃষ্টি পড়ছে। অন্যদিকে চলছে মাসের পর মাস ধরে বিভিন্ন রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি। এতে মাটির নিচে থাকা সার্ভিস লাইনগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি কোনোভাবেই নামতে পারছে না। এ ছাড়া পানি ভেঙ্গেও মানুষ নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারেনি। কেননা কেউই জানেন না কার সামনে কি রয়েছে। রাস্তাঘাটগুলো এমনভাবে কাটা হয়েছে যে কোথায় ইট, বালু, সুড়কি আর কোথায় লোহার রড রয়েছে তা বোঝা মুশকিল। এসব কারণে পানিতে হেঁটে চলা মানুষ অহরহ দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। আগের দিনের মতো গতকাল বনানী-এয়ারপোর্ট রোডে বিকাল ছয়টার দিকে শ্যালো মেশিন বসিয়ে পানি অপসারণ করতে দেখা গেছে। নয়াপল্টন, পুরানাপল্টন, মতিঝিল, আরামবাগ, মালিবাগ, মৌচাক, বনশ্রী, শান্তিনগর, কাকরাইল মোড়ে গভীর রাত পর্যন্ত হাঁটু পরিমাণ পানি জমে ছিল। এক ঘণ্টার বৃষ্টি ঢাকাবাসীকে যতটা না ভুগিয়েছে তার চেয়ে বেশি ভুগিয়েছে অসহনীয় যানজট আর জলাবদ্ধতা। অনেক জায়গায় পথচারীদের রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা এবং পাবলিক বাসের ভিতরেও মানুষকে হাঁসফাঁস করতে দেখা গেছে।

 কোথাও কোথাও মাথার ওপরে বৃষ্টি আর রাস্তায় জমে থাকা পানিতে একাকার হয়ে মানুষ রাস্তায় হেঁটেছে। এ সময় অনেককে খোলা ম্যানহোল কিংবা গর্তের মধ্যেও পড়ে যেতে দেখা যায়।

বাটা সিগন্যাল থেকে হাতিরপুল বাজার পর্যন্ত পুরোটা হাঁটুপানির নিচে। সেই পানিতে আটকে ছিল শত শত গাড়ির মিছিল। অনেকেই গাড়ি ঘুরিয়ে অন্য পথে যেতে চেয়ে উল্টা আরও দীর্ঘ যানজটে বসে থেকেছেন। কাঁটাবন পার হয়ে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত আসার পর বাংলামোটরের দিকেও ছিল একই অবস্থা। ফার্মগেট থেকে টঙ্গীগামী ভিআইপি রাস্তাটি তলিয়ে যায় হাঁটু পানিতে। গতকাল পুরো ঢাকার চিত্র ছিল এমনই।

ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছিল গতকাল জলাবদ্ধতার বিভিন্ন ছবি এবং খবর। অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় আটকে পড়ে ফেসবুকে জলাবদ্ধতার সঙ্গে  সেলফি তুলে ও অন্যের খবর শেয়ার করেছেন। এ সময় অনেকেই সিটির মেয়রদের বিষোদগার করেন।

স/মা

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন