৩ হাজারের অধিক রোগীকে বিনামূল্যে ৪৫ হাজার সেবা প্রদানের মাইল ফলক

তাপস কুমার, নাটোর:
প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের পরম আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে নাটোরের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র। তাদেরকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে চিকিৎসার মাধ্যমে জীবনের মূলধারায় নিয়ে আসতে কাজ করে যাচ্ছে কেন্দ্রটি। ইতোমধ্যে ৩ হাজারের অধিক রোগীকে বিনামূল্যে ৪৫ হাজার সেবা প্রদানের মাইল ফলক স্পর্শ করেছে এই কেন্দ্র। গ্রামীণ জনপদে সেবা পৌঁছে দিচ্ছে থেরাপী ভ্যান, প্রতিবন্ধীদের মাঝে বিতরণ করছে সহায়ক উপকরণ।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত সারাদেশে ১০৩ টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের মধ্যে নাটোর শহরের কানাইখালীতে স্থাপিত এই কেন্দ্রটি অন্যতম। মে ২০১২ স্থাপিত কেন্দ্রটিতে এ পর্যন্ত নিবন্ধনকৃত চিকিৎসা গ্রহীতার সংখ্যা ৩ হাজার ৭৩ জন। এসব চিকিৎসা গ্রহীতারা ১২টি পর্যায়ে ৪৫ হাজার ৫২৭টি সেবা গ্রহণ করেছেন।
একজন ফিজিওথেরাপি কনসালটেন্ট, একজন ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিষ্ট, ২ জন করে থেরাপী সহকারী ও টেকনিশিয়ান সহ ১০ দক্ষ জনবলে এই কেন্দ্রে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পীচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং স্পীচ প্যাথলজি সেবা প্রদান করা হয়। শনিবার থেকে বুধবার- ৫ কর্ম দিবসে ৯ টা হতে ৫ টা পর্যন্ত সময়ে অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধী, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসু¯্য’তাজনিত প্রতিবন্ধী, বাক প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রম ইত্যাদি অসু¯্য’তা জনিত ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
আল্ট্রাসাউন্ড ফেরাপি, আই.এফ.টি, টেন্স, ই.এম.এস, এস.ডাব্লিউ.ডি, আই.আর.আর, ট্রাকশন সেটসহ মোট ৭৫টি আধুনিক যন্ত্রপাতির ২টি করে সেট সহযোগে সেবা গ্রহীতারা এই কেন্দ্রে বিনামূল্যে সেবা পাচ্ছেন। কেন্দ্রের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৩ সহস্রাধিক সেবা গ্রহীতার মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী বা প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা সর্বোচ্চ ২ হাজার ১৫০ জন, সেরিব্রাল পালসি ৪০০ জন, বাক প্রতিবন্ধী ১২৭ জন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ৮২ জন, শ্রবণ প্রতিবন্ধী ৭০ জন, অটিজম ৫০ জন, মানসিক প্রতিবন্ধী ৪২ জন উল্লেখযোগ্য। বাত ব্যথা ও প্যারালাইসিস ছাড়া মূলত শিশুরাই সেবা গ্রহীতা।
নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন সেবা গ্রহীতার প্রত্যেকেই ২ থেকে ৩ টি বিষয়ে সেবা গ্রহণ করে থাকেন। তবে স্পীচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপি সেবা গ্রহণের আধিক্যের কথা জানিয়ে টেকনিশিয়ান মমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন এই দুইটি বিষয়ে সেবা গ্রহীতার সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ জন। থেরাপি সহকারী শারমিন ইসলাম জানান, ইলেকট্রিক থেরাপি ও এক্সারসাইজ নিতে এই কেন্দ্রে উল্লেযোগ্য সংখ্যক রোগী আসেন।
স্ট্রোকে আক্রান্ত পঞ্চাশোর্ধ খন্দকার কামরুজ্জামান হুইল চেয়ারে এসে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে চিকিৎসা নেওয়া শুরু করেন। বর্তমানে স্বাভাবিক চলাফেরা করা কামরুজ্জামান বলেন, থেরাপি নিয়ে হাত-পায়ের অবসতা দূর হয়েছে। স্ট্রোকের অপর রোগী প্রণয় কুমার সরকার বলেন, ৮ মাসে থেরাপি নিয়ে মুখের বাঁকা ভাব দূর এখন স্বাভাবিক কথা বলতে পারছি। অটিজমে আক্রান্ত শিশু অনুরাগ এই কেন্দ্রে ৬ মাসের চিকিৎসা নিয়ে এখন কথা বলতে পারে, হাঁটা চলা করতে পারে, পোশাক পরতে পারে বলে জানালেন তার বাবা তপন কুমার ঘোষ। সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ছোট্ট মোহনা, সাবিহার মত শিশুদের অভিভাবকরা এই সেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে স্বস্তি ফেরার কথা জানালেন।
কেন্দ্রের ফিজিওথেরাপি কনসালটেন্ট ডাঃ সাবিনা জেসমিন বলেন, নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর সেবা গ্রহীতার সেবা গ্রহণের চাহিদা নিরূপণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এরপর শুরু হয় সমন্বিত চিকিৎসা সেবা প্রদান প্রক্রিয়া। রোগী ও অভিভাবকদের জন্য কাউন্সিলিং এবং গ্রুপ স্টাডিও থাকে আমাদের চিকিৎসা সেবায়।
চিকিৎসা সেবা প্রদানের বাইরে প্রতিবন্ধী জরিপ কার্যক্রমও করে থাকে এই কেন্দ্র। ডাঃ সাবিনা জেসমিন জানান, গত ১ বছরে ২৮০ জন কে প্রতিবন্ধী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
কেন্দ্রের প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা ভক্ত প্রসাদ দাস বলেন, শুধু বিনামূল্যে চিকিৎসা নয়, চাহিদা অনুযায়ী প্রতিবন্ধীদের মাঝে সহায়ক উপকরণও বিতরণ করে এই কেন্দ্র। এ পর্যন্ত ২৫৬টি হুইল চেয়ার, ৩০টি স্ট্যান্ডিং ফ্রেম, ২০টি ট্রাই-সাইকেল, ৭৪টি হিয়ারিং এইড এবং ৩৪টি সাদাছড়ি বিতরণ করা হয়েছে।
চলমান রয়েছে অত্যাধুনিক থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের ইউনিয়ন পর্যায়ের চিকিৎসা সেবা ক্যাম্পেইন কার্যক্রম। এই ক্যাম্পেইন কার্যক্রমে থেরাপি ভ্যান থেকে এপ্রিল মাসে জেলার ৮টি স্থানে ৫৮৯ জন রোগীকে ১ হাজার ৬৫৫টি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে এবং চাহিদা সম্পন্ন রোগীদের নাটোর কেন্দ্রে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানান কেন্দ্রের প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা।
বিগত ৫ বছর ধরে প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদানের মধ্য দিয়ে জীবনের মূলধারায় নিয়ে আসতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে নাটোরের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রটি। এভাবে উপকৃত হচ্ছে হাজারো পরিবার, সমাজ, সর্বপরি রাষ্ট্র।

স/এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন

Power by

Download Free AZ | Free Wordpress Themes