একান্তে স্বাক্ষাতকারে মোঃ ইলিয়াস হোসাইন :

সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ‘শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি, পতাকাবাহী সংগঠন জাতির মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া জীবন ও যৌবনের উত্তাপে শুদ্ধা সংগঠন সোনার বাংলা বিনির্মাণের কর্মী গড়ার পাঠশালা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সেই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসতে পেরে নিজেকে অনেক গর্ব মনে করি। বিদ্যার সঙ্গে বিনয়, শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষা, কর্র্মের সঙ্গে দেশপ্রেম এবং মানবীয় গুণাবলির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ পথচলার ৬৯বছর।

১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি সময়ের দাবিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুুর রহমান। সময়ের প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে চলা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের। জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই ভাষার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুথান, সর্বোপরি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের ছয় দশকের সবচেয়ে সফল সাহসী সারথি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রাজপথে ছিলেন সদা সোচ্চার। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ায় প্রতিবাদে ধর্র্মঘটে তিনি ও কয়েকজন সহকর্র্মীসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন জোরালো করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ ভূমিকা ছিল প্রণিধানযোগ্য।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুুর রহমানের নির্দেশনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৬২ সালে তৎকালীন আইয়ুব খান সরকার কর্তৃৃক গঠিত শরিফ কমিশন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর লক্ষে ও স্বার্র্থের অনুকূলে একটি গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিল। সেই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্টানের শিক্ষার্থীরা গণআন্দোলন ও গণজাগরণ তৈরি করে। সেই বাষট্রির রক্তঝরা দিনগুলোতে রক্ত ঝরেছে অসংখ্য ছাত্রলীগ নেতা কর্র্মীদের। ১৯৬৬ সালে বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সনদ ৬ দফা বাস্তবায়নে শেখ মুজিবুর রহমান আস্থা রেখেছিল তরুন ছাত্রনেতাদের ওপর। তিনি সে সময়কার ছাত্রনেতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন জেলায় জেলায় অবস্থান সুদৃড় করে ৬ দফার সপক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা সারা বাংলার মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফা দাবির গুরুত্ব তুলে ধরেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুথানেও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছিল রাজপথের প্রমিথিউস। ৬দফা নিয়ে আওয়ামীলীগের নেতাদের মধ্যে বিভেদ ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ৬দফার পক্ষে ছাত্রলীগের শক্ত অবস্থানে কারণে শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাব সর্র্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সেদিন আওয়ামীলীগের বৈঠকের বাইরে কঠোর পাহারা বসাতে হয়েছিল ছাত্রলীগ কর্মীদের। ১৯৭০-এর নির্র্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগের নিরস্কুস জয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় অংশ গ্রহনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্র্ন ভূমিকা পালন করেন একাবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের সর্র্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের দীর্ঘ পথচলা ছাত্রলীগ হারিয়েছে তার সহস্রাধিক নেতাকর্মীদের।

১৯৯৭১ সালের ৩ রা মার্চ বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের সমাবেশে বলেছিলেন, দানবের সঙ্গে লড়াইয়ে যে কোন পরিণতিকে মাথা পেতে বরণের জন্য আমরা প্রস্তুত। ২৩ বছর রক্ত দিয়ে এসেছি। প্রয়োজনবোধে বুকের রক্ত গঙ্গা বইয়ে দেব। তবুু সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বাংলার শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করবো না। তাই তো মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রাণের সংগঠনের ১৭ হাজার বীর যোদ্ধা তাদের বুকের তাজা রক্তে এঁকেছেন লাল-সবুজের পতাকা। এঁকেছেন ৫৬ হাজার বর্গমাইলেন এক সার্বভৌম মানচিত্র। সে সব বীর যোদ্ধাই আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের শক্তি, আমাদের সাহস। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীর মধ্যে আছে তরুন মুজিবের নান্দনিকতা ও আদর্শ, আছে কাজী নজরুলের বাঁধ ভাঙার শৌর্য, আছে ক্ষুদিরামের প্রত্যয়, আছে সুকান্তের অবিচল চেতনা। তাই তো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শিক্ষার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্র্থ সুরক্ষায় সবসময় মঙ্গল প্রদীপের আলোকবর্র্তিকা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দিগন্তে। যখন বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দে পরিনণত হয়েছিল, ঠিক তখনই বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটিকে নিভিয়ে দিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হিংস্র হায়েনারা আঘাত হানে। প্রত্যক্ষ মদদ দিলেন খন্দকার মোশতাক আর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫-পরবর্তী বঙ্গবন্ধু বিহিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে যে কালো মেঘ গ্রাস করেছিল, সেই মেঘ সরাতে প্রত্যাাশার সূর্য হাতে ১৯৮১ সালে প্রত্যাবর্র্তন করলেন আমাদের প্রাণের নেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা। সেদিন প্রিয় নেত্রীর পাশে ভ্যানগার্ডের ভূমিকায় ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৮৩ সালে শিক্ষা আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ১০ দফা তৈরিতে নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। শিক্ষার অধিকার প্রসারে ও ছাত্রসমাজের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ। ১৬ কোটি বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, সমৃদ্ধ. বাংলাদেশ বিনির্মাণের সু-নিপুুন কারিগর বিশ্বজয়ী নেত্রী, বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত নারীমুক্তির পথ প্রদর্র্শন দেশরতœ শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি মোকাবেলা পালন করেছে অগ্রণী ভূমিকা। সে সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দিনে তিন বেলা নিজ হাতে রুটি তৈরি করেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সারারাত জেগে প্রস্তুত করেছেন খাবার স্যালাইন। সেগুলো পৌঁছে দেওয়া হয়েছে দুর্র্গম এলাকার মানুষের কাছে। প্রসঙ্গত ১৯৯৮ সালের বন্যাসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একই কার্যক্রম নিয়ে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্র্থীদের সঙ্গে নিয়ে সর্বাতœক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল ছাত্রলীগ। ২০০২ সালের ২৩শে জুলাই বিএনপি’র পেটোয়া পুলিশ বাহিনী ও ছাত্রদলের ক্যডাররা গভীর রাতে শামসুন্নাহার হলে ঢুকে ছাত্রীদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করে সেদিন ছাত্রলীগ শামসুন্নাহার হলের ছাত্রীদের সম্ভমহানির হাত থেকে রক্ষা করে ও দোষীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে।

২০০৭ সালের ১৬ই জুলাই বিতর্কিত সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে আটক আমাদের প্রিয় নেত্রীর মুক্তি আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে প্রথম সাহসী উচ্চারণ তুলেছিল বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগের কর্মীরাই। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি দুস্থ শিশুদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, শীতার্র্তদের মাঝে শীতবস্ত বিতরণ, রক্তদান, বৃক্ষরোপণ, পথ শিশুদের জন্য ভ্রাম্যমান পাঠদান কর্মসূচি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দীর্ঘ দিনের চর্চা। ১৯৭৩ সালের ৪ঠা মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে বেটে খাওয়ালেও বাংলা সোনার বাংলা হবে না। যদি বাংলাদেশের ছেলে আপনারা সোনার বাংলা, সোনার মানুষ পয়দা করতে না পারেন। তাই তো বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীর ব্রত সোনার মানুষ হওয়ার। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তার সোনালি অতীতের মতো সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়বে। আর সে জন্যেই দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টায় ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মী তাদের মেধা ও শ্রম দিয়ে সর্র্বোচ্চ অবদান রাখছেন। রুপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নে প্রযুক্তি দক্ষ ছাত্রসমাজ তৈরিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কাজ করছে এবং করবে। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্য সমাধানের ১৯ দফা দাবি পেশ করেছে। ভবিষ্যতেও ছাত্রলীগ দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্র্থীদের সর্বোচ্চ শিক্ষা সেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তাকল্পে কাজ করবে।

নবীনদের মেধা দেশ গড়ার কাজে লাগুক স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে বিধৌত হোক নতুন প্রজন্মের বিবেক ও চেতনা। অনাগত প্রজন্মের লড়াই হোক সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আর মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে, সব অশুভ শক্তিকে পেছনে ফেলে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে, দেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এটাই আমাদের কাম্য। তাই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম।

স/এষ্

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন