ঈদকে সামনে রেখে ভেজাল ও নিম্নমানের সেমাই তৈরি নিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা। নোংরার মধ্যে শ্রমিকরা পা দিয়ে ময়দা মাখিয়ে ‘মণ্ড’ তৈরি করছেন। আর এরপর পোড়া পামওয়েল তেল ও ডালডা মিশিয়ে সেমাই ভেজে প্যাকেট লাগানো হচ্ছে ঘি দিয়ে ভাজা সেমাই হিসেবে। প্রতিনিয়ত এ ধরনের ভেজাল খাবার খেয়ে দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বাঁধছে মানুষের শরীরে।

সরেজমিন বগুড়ার আদমদীঘির ‘নূর’ সেমাই কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, নোংরা স্যাঁতসেঁতে মেঝের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে ময়দা। এই ময়দার মধ্যে পানি দিয়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে মণ্ড তৈরি করছেন শ্রমিকরা। গরমে ঘাম ঝড়ছে শ্রমিকদের। এই ঘাম গিয়ে মিশছে সেমাইয়ের মণ্ডের মধ্যে। মেঝেতে রাখা মণ্ডে পড়ে আছে মাছি এবং বিভিন্ন রকমের পোকামাকড়। এভাবে মণ্ড বা খামির করে মেশিনে বানানো হচ্ছে চিকন এবং লাচ্ছা সেমাই। সেমাইতে মেশানো হচ্ছে কৃত্তিম বিভিন্ন রং। মেশিনে সেমাই কাটা শেষে খোলা উঠানের মধ্যে ফেলে রাখা হচ্ছে। এভাবে খোলা আকাশের নিচে রাস্তার ধারে রোদে শুকানো হচ্ছে সেমাই। সেমাই শুকালে নিয়ে আসা হচ্ছে ভাজার জন্য। কড়াইতে আগের পোড়া পামওয়েল তেলের মধ্যে ডালডা দিয়ে ভাজা হচ্ছে সেমাই। এরপর তুলে রাখা হচ্ছে ঝাঁঝড়িতে। সেখান থেকে তেল চুইয়ে পড়ে জমা হচ্ছে একটি পাত্রে।   পাত্র ভরে গেলেই ওই পোড়া তেল কড়াইতে ঢেলে দিয়ে আবার ভাজা হচ্ছে। সেমাই ভাজার পর চকচকে বিএসটিআই এর ভুয়া সিল লাগানো মোড়কে তুলে ট্রাকযোগে সেমাই পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের জেলা, উপজেলা থেকে শুরু করে প্রতিটি গ্রামের দোকানে। শুধু একটি নয় অধিকাংশ কারখানারই দৃশ্য এমন। বগুড়ার আদমদীঘি ছাড়াও শহরতলী, শাহজাহানপুর, দুপচাঁচিয়ার প্রায় অধিকাংশ ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে এ সব ভেজাল সেমাইয়ের কারখানা। শুধু বগুড়া নয় এ অবস্থা পুরো দেশেরই। রাজধানীর পুরান ঢাকা, সায়েদাবাদ এবং কেরানীগঞ্জ এলাকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এরকম অসংখ্য সেমাইয়ের কারখানা। শুধু ভেজাল সেমাই নয় এভাবে তৈরি হচ্ছে ছানা এবং রসালো বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। দুই মাসের পুরনো সিরাতে ডুবিয়ে তৈরি করা হচ্ছে মিষ্টি। এ ছাড়া এসব কারখানার নোংরা পরিবেশে তৈরি হয় চানাচুর, বিস্কিট এবং চিপস। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কিছু জায়গায় অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে ধরেছে এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের। কিন্তু তার সংখ্যা খুবই নগণ্য। সারা বছর তো চলেই, রমজানের শুরু থেকে তত্পর হয়ে ওঠে এই অসাধু ভেজাল ব্যবসায়ীর দল। চকচকে মোড়কে মুড়িয়ে বিএসটিআই এর ভুয়া সিল লাগিয়ে এসব ভেজাল অখাদ্য তুলে দেয় মানুষের হাতে। এসব ভেজাল খাবার খেয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে কোটি মানুষের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, এসব ভেজাল খাবার খেয়ে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে গ্যাসটিক, ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিসসহ বিভিন্ন রোগে। এ ছাড়া এসব খাবারে বিভিন্ন রকমের জীবাণু মিশে থাকায় অনেক সময় টাইফয়েড এবং প্যারা টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। বৃদ্ধ এবং শিশুদের এসব খাবারে মারাত্মক ক্ষতি হয়। আর এই ভেজাল খাবারে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গর্ভবতী মা। এসব ক্ষতিকর জীবাণুতে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে নবজাতক।

স/এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন