সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় এবার পর্যটন শহর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির মেট্রো কাঝং হোল্ডিং (এমকেএইচ) বারহাদ কোম্পানি তাদের প্রস্তাবে বলেছে, সরকারের কাছ থেকে অনুমতি মিললে তারা বাগেরহাটের শরণখোলা এলাকায় পাঁচতারা হোটেল, ছোট-বড় কটেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ করবে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ আনুষঙ্গিক আরো স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। তবে মালয়েশিয়ার এই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে বন বিভাগ। সরকারের এ সংস্থা বলছে, মালয়েশিয়ার কোম্পানিটি শরণখোলার যে স্থানে পর্যটন শহর করতে চায় সেটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া-ইসিএ) মধ্যে অবস্থিত। সেখানে যেকোনো ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। তা ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে দূষণকারী পদার্থ সুন্দরবনের চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সুন্দরবন এলাকায় ইকোট্যুরিজম গড়ে তুলতে সম্প্রতি দেশের একটি সংস্থা থেকে প্রস্তাব এসেছে বন বিভাগে। একই সময়ে সুন্দরবনের ভেতরে আরো আটটি টাওয়ার স্থাপনের প্রস্তাব পাঠিয়েছে মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক। দুটি প্রস্তাবই বন বিভাগ থেকে নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন করে মালয়েশিয়ার একটি কোম্পানি থেকে পর্যটন শহর গড়ে তোলার প্রস্তাব এলো। এই প্রস্তাবেও ‘না’ বলে দিয়েছে বন বিভাগ। গত ডিসেম্বরে একটি চিঠিতে শরণখোলায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে একটি পর্যটন শহর গড়ে তোলার আগ্রহের কথা জানায় মালয়েশিয়ার মেট্রো কাঝং হোল্ডিং (এমকেএইচ) বারহাদ কোম্পানি। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ডেভেলপার কোম্পানিটি জানায়, সরকারের কাছ থেকে অনুমতি পেলে সেখানে পর্যটকদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ছোট ছোট কটেজ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি একটি ফায়ার সার্ভিসও করতে চায় তারা।  প্রস্তাবটি পাওয়ার পর সরেজমিন পরিদর্শন শেষে খুলনা ও বাগেরহাট থেকে দুটি প্রতিবেদন বন বিভাগের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। ওই দুই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তাবিত এলাকাটি সংরক্ষিত সুন্দরবন এলাকায় পড়েছে এবং সম্পূর্ণভাবে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) মধ্যে অবস্থিত।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৫ নম্বর ধারার উপধারা (১) এবং ৪ নম্বর ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সংরক্ষিত সুন্দরবনের বাইরের চতুর্দিকে ১০ কিলোমিটার এলাকা প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে ওই সব এলাকার মধ্যে মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দদূষণকারী কোনো শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর পাশাপাশি প্রাকৃতিক বন ও গাছপালা কাটা যাবে না। বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘মালয়েশিয়ার কাছ থেকে প্রস্তাব আসার পর সরেজমিন গিয়ে আমরা দেখেছি, প্রস্তাবিত জায়গাটি সুন্দরবনসংলগ্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। ওই এলাকা প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই সেখানে কোনো ধরনের পর্যটন শহর গড়ে তোলার সুযোগ নেই। আমরা আমাদের মতামত জানিয়েছি। ‘ মালয়েশিয়ার মেট্রো কাঝং হোল্ডিং (এমকেএইচ) বারহাদ কোম্পানি দেশে কার মাধ্যমে এই প্রস্তাব পাঠিয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাঈদুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় পর্যটন শহর গড়ে উঠলে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে খুলনা ও বাগেরহাটের বন বিভাগ থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের স্থাপনা তৈরি হলে মাটি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে দূষণকারী পদার্থ চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সুন্দরবনে অভয়ারণ্য কেন্দ্রগুলোতে পর্যটক ধারণক্ষমতা খুবই সীমিত। এই অবস্থায় বৃহৎ প্রকল্প গড়ে উঠলে প্রতিবেশ সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে না। তাছাড়া এই ধরনের ট্যুরিজম সংরক্ষিত সুন্দরবন এবং অভ্যন্তরে অভয়ারণ্য ও অভয়াশ্রমগুলোতে সংরক্ষণের ঝুঁকি বাড়াবে। সুন্দরবন সংরক্ষণের স্বার্থে মালয়েশিয়ার কোম্পানিটির পর্যটন শহর গড়ে তোলার প্রস্তাবকে নিরুৎসাহ করার কথা জানিয়েছে খুলনা ও বাগেরহাটের বন বিভাগ।

খুলনা থেকে সদ্য বিদায়ী বন সংরক্ষক জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা আপত্তি জানিয়েছি। আমরা বলেছি, সুন্দরবনকে তার মতো করে থাকতে দেওয়া উচিত।

স/এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন