রাজধানীর বনানীর দ্য রেইন ট্রি হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে দুই তরুণী ধর্ষণ মামলার প্রধান অভিযুক্ত আসাম সাফাত আহমেদ (২৬) ওই হোটেলর ডিরেক্টর মাহির হারুনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।  তথ্য জানিয়েছেন সাফাত আহমেদের (২৬) সাবেক স্ত্রী ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ওরফে লামিয়া আশা (২৫)।

রাজধানীর বনানীর দ্য রেইন ট্রি হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ১১ ঘন্টা অস্ত্রের মুখে রেখে জোর করে মদপান করিয়ে দুই তরুণীকে (২৩) ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তিন তরুণসহ মোট ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা (মামলা নম্বর-৮) করেছেন ভুক্তভোগী দুই তরুণী। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২৮ মার্চ পূর্বপরিচিত সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ ওই দুই তরুণীকে জন্মদিনের দাওয়াত দেয়। এরপর তাদের বনানীর ‘কে’ ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বরে রেইনট্রি নামের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সেখানে দুই তরুণীকে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণ করে সাফাত ও নাঈম। এ ঘটনা সাফাতের গাড়িচালক বিল্লালকে দিয়ে ভিডিও করানো হয় বলেও উল্লেখ করা হয় এজাহারে। ধর্ষণ মামলার আসামিরা হলো- সাফাত আহমদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও সাফাতের দেহরক্ষী (অজ্ঞাতনামা)।

ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা  জানিয়েছেন, মাহিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় তার হোটেলে প্রায়ই বন্ধু্, বান্ধবী ও নামী মডেলদের নিয়ে আড্ডা জমাতেন সাফাত। আরেক ধর্ষক নাঈম মডেলদের সেখানে ডেকে নিতেন। তারপর রাতভর মদপান ও ইয়াবা সেবন কর হই-হুল্লোড় করতেন। ঘটনার দিনও সাফাতের জন্য হোটেলের ৭০১ ও ৭০২ নম্বর রুম বুক করা হয়। শুধু তাই নয়, জন্মদিন উপলক্ষে সাফাতের জন্য একটি কেকও উপহার দেয় মাহির। জন্মদিনের আগে ওরা সবাইকে বলেছিল উদযাপন করতে বন্ধুরা মিলে সিলেটে যাবে। একটা ক্রাইম করবে বলেই হয়তো সবাইকে মিথ্যা বলেছিল। ওই দিন হোটেলটির ৭০১ ও ৭০২ নম্বর রুম বুক করেছিল ‘ধর্ষক’ সাফাত।

তিনি বলেছেন, ‘সাফাতকে বিয়ে করার পর আমি জানতে পারি সে নিয়মিত ইয়াবা সেবন করে। এর আগেও বিয়ে করেছে, বেশিদিন তার কাউকে ভাল লাগে না। একাধক মডেলের সাথে ওর শারীরক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আমি তখন এগুলোকে পাত্তা দেইনি। পরিকল্পিতভাবে দুই তরুণীকে ধর্ষণের পর সাফাতের অপকর্ম আড়াল করতেই তার বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিম এখন আমাকে জড়িয়ে নানা কথা বলছেন। মা-বাপ কি জানেন না তার ছেলেরা কোথায়? বাবা যদি ছেলেকে উৎসাহ দেয় তাহলে এমন ঘটনা তো ঘটবেই।’

মাহির হারুন ওই হোটেলটির একজন পরিচালক বলেও রেইনট্রি হোটেলের অ্যাক্সিকিউটিভ ইন্টারনাল অপারেশন (ইআইও) ফারজান আরা রিমির কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কিন্তু এ ছাড়া আর কোনো তথ্য তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

তিনি জানিয়েছেন, ওইদিন এ ধরনের কোনো ঘটনা আদৌ ঘটেছিল কিনা তা তাদের জানার বিষয় নয়। কারণ ওই সময় কেউ হোটেল কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেননি। এতদিন পর মামলা হওয়ায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে যে কিছু আন্দাজ করা সম্ভব তাও হচ্ছে না। কারণ, এক মাসের বেশি সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ রাখা হয় না। হোটেলের প্রাইভেসি ও স্বার্থবিরোধী কোনো তথ্য দিতে তিনি বাধ্য নন। পুলিশের পক্ষ থেকে যা জানতে চাওয়া হয়েছে তা জানানো হয়েছে।

ওই হোটেলটির জেনারেল ম্যানেজার ফ্রাঙ্ক ফরগেট বলেছেন, ‘পুলিশ তাদের মতো করে তদন্ত করছে, এটা তাদের দায়িত্ব। ইতোমধ্যে তারা হোটেলে এসে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছে। এমনকি সিসিটিভি ফুটেজও চেক করেছে। যে মেয়েরা এসেছিলেন তারা জন্মদিনের পার্টিতে এসেছিল বলেই জানি। তবে কে কে এসেছিল সেটি জানার কথা নয়। এখানে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটার তথ্য আগে জানা ছিল না।’

এদিকে, সাফাতের পারিবারিক ও রেইন ট্রি হোটেল সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের সঙ্গে পরিবারের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে ‘সাফাত কোথায় আছে জানা নাই’ বার বার বলা হলেও তার সঙ্গে পরিবারের ফোনে যোগাযোগ রয়েছে। সে কোথায় আছে তার বাবা জানেন। সর্বশেষ বুধবার সকালেও সাফাতের সাথে তার বাবা কথা বলেছেন। তার বন্ধু দ্য রেইন ট্রি হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের পরিচালক মাহির হারুনের বাবা সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন ঝালকাঠী-১ আসনের এমপি এবং ওই হোটেলটির মালিক। সাফাত ও মাহির এক সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকা (আইএসডি) নামের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় সাফাত প্রায়ই পার্টি করতে মাহিরের হোটেলে যেতেন। এমনকি দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ‘ধর্ষণের’ দিনও মাহিরের মাধ্যমেই রুমগুলো বুক করেছিল সাফাত। এ জন্যই ওই দিন দুই তরুণী চিৎকার করলেও কেউই সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেননি। সে দিনের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাতে ধারণ করা সেদিনের ভিডিও পাওয়া যায় নি।

সাফাতের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ জানিয়েছেন, গত ৮ মে সকালে সাফাত বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। তারপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। সে কোথায় আছে তা জানি না।

কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের তৎপরতায় সিলেট শহরের পাঠানটোলা মদিনা মার্কেট এলাকা থেকে মামলার এক নম্বর আসামী সাফাত আহমেদ (২৬) ও তিন নম্বর আসামী সাদমান সাকিফকে (২৪) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছিল বলে জানা গেছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার গোলাম কিবরিয়া এ সব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

স/এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন