।মুস্তাক মুহাম্মদ।

বাজান আমার কি করলো ওরা । হমস্ত গা ব্যাথা। বাজান চলো অন্য কোতায় পলায় যায়্। এইহানে থাকলে আমি  বাচুন না। ওরা আবারডা আমার ধরবে। বাজান আমার একটু ডাক্তার ডেকাবা। আমার গা ব্যথা্, খোদার দুনিযাডায় কোনো বিচার নেই। কোনহানে যাবা। আট বছরের রেশমী বাবা রহিমের বুকে মাথা রেখে কেঁদে কেঁদে কথাগুলো বলছে। রহিমের বুক ভেসে যাচ্ছে রেমশীর অশ্রুতে। রেশমীর ফ্রকের হাতা ছেড়া, বুকের কাছ থেকে ছেড়া।হাঁটুর কাছ থেকে ছেলোয়ারে  ছেড়া দিয়ে সাদা পা রক্তে লাল হয়েছে তা দেখা যাচ্ছে। রহিম ছেড়াটা দেখে চিৎকার দিলো- আল্লাহ , এই রকতো তুমি কি করে সহ্য করো, তোমার আরস কেঁপে উঠছে না। খোদাগো এর বিচার আমি পাবু না।তুমি বিচার করো । এহন আমি কোতায় যাবো , তুমি আমার শেষ ভরসা। ওমা এ কি ! রক্ত! খোদা গো এহন আমি কি করবু, মেয়ের পা দে তো রকতে ভেসে যাচ্ছে। প্যান ভিজে গেছে রকতে। একন আমি কার কাছে যাবো। আমার কি উপায় আছে।কি হবে আমার । ওগো রেশমীর মা তাড়াতাড়ি আয়।

রহিম বাড়ির কাছ গিয়ে চিৎকার দিতে থাকে। রেশমীর মা চাউল ধুয়া পানি ছাগলের দেওয়া বাদ দিয়ে ছুটে যায় বাবা- মেয়ের দিকে।ওরে রেশমীর বাপ  এ আমার কি সববোনাশ হলো । এ আমার কি সববোনাশ হলো। মেয়েটা হকালে ভাত খেয়ে খেলতে গেলো। আর এহন এ কি হলো। ও খুদা গো একি হলো আমার । চিৎকার দিয়ে মেয়েটা কোলে নিয়ে নবিছন চুমো খেতে খেতে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমার সোনার এ কি হলো। রেশমীর বাপ তুমি ফকিরের মারে খবুর দেও। মাইডারে ঝারাতে হবে। তেল টেনে দিতে হবু। আমি নুন পানি গরম করে মেয়েডারে ধুয়ায় দিই।

রহিমের বাড়ি গ্রামের এক মাথায়। ওর বাড়ির পর থেকে মাঠ শুরু । ওদের চিৎকার চেচামেছি শুনে দুই একজন ছুটে এসেছে । কেউ বলছে কি হলো । ও তো সকালে দেখলাম, খার আম বাগানের দিকে যাচ্ছিল । আমি তকন মাটে আসছি, কি হলো। ওই বাগনটা হলো কাল । বাগানে গাজাখোরদের আড্ডা। কে করলো এমুন কাম।নবিছন  পানি গরম করতে করতে বললো, ওই কাল আছে না, শরিফে।  রেশমীর বাপেরও বড়। ওর বউ আছে বাল বাচ্চা আছে । আমার মানিকটারে এমুন করলু কেন রে আল্লাহ।

ফকিরের মা এসে গেছে।উঠানে পা রাখার আগেই বললো, ওরে বউ রে অবস্থা বেশি ভাল না।  গরম পানি কর, ওকে ধুতে হবে। কি করেছে জালি মেয়েটারে । দুধের বাচ্চার গায়ে হাত দিতে বিবেক কাপলো না জানোয়রটার।  ওতোটুকুন মেযে ওর কি কিছু হয়েসে। জানোয়ারে ঘরে গতর আলা বউ ,থুয়ে তই এই দুধের বাচ্চাটার এই কাজ করতে পারলি । তোরও তো এমুন দুইডা মেয়ে আছে। তাদের মুখ তোর মনে পড়লু না রে জানোয়ার। রেশমী যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে।

ফকিরের মা গরম পানি ‍দিয়ে ওকে ধুয়ায়ে দিয়ে বলল, জলছা করে দে গেলাম আবার আসবু বিকেল বেলা। রক্ত বন্ধু হয়ে যাবে। তুই নেকড়া দে মুছে মুছে দিস।রহিম কনে গেছে। রহিম আসলে মিজান ডাকতারের কাছে একটু যেতে বলিস। ব্যথার ওষুদ দিলে ব্যথা চলে যাবে নি।  ওইটুকু মেয়ে ওর উপর কি কম  ধকল গেলে রক্ত বের হয়! কাল বৈশাখী যকন বয় তহন সব চুরমার করে যায়। মেয়েডার উপর দিয়ে কি কম কাল বৈশাখী গেলো।রকতো বের হচ্ছে। জায়গাডা ফেটে গেছে। নাঙলের ফালা যখন যায় তহন চিড়তে চিড়তে যায়।  রহিম আইছিস, আমি আবার চলে যাচ্ছিলাম- গে  দুটো রানতি হবে।মেয়েডারে তো কুত্তার বাচ্ছা কামড়ে শেষ করেছে।ঝাড়ায়ে দিছি, জলসা করে দিছি  , আমার যা করার করেছি। একন তুই মিজান ডাকতারের কাছে যা , ব্যথার ওষুদ আনতি হবে। রেকতো বের হচ্ছে। ফেটে গেছে । লজ্জা শরম করলে মেয়ে বাচবু না।

রহিম তুই তো আইছিস । এখন আমি কি করি বল । তিন দিন আগের ঘটনা। তুই আইছিস তিন দিন পর। এখন তোর মেয়ে ভাল আছে। আমার তো আবার জনগন নিয়ে চলতে হয়।  তুই এই সকালে আইছিস। ভাল হয়েছে। আমি বিষয়টি আগে ভাল করে শুনে নিই । শরিফ এই কাজ করেছে কিনা। আমি মানুষের মুখে সব শুনেছি। কিন্তু শরিফের কাছ থেকে শুনার দরকার। তুই যা্ ব্যবস্থা আমি করে দিবানি। বিকেলে আয়। দারোগা প্রশান্ত বাবু থাকবেনি। আরও দুচার জন। আমি মেম্বর হলে কি হবে । আমার তো সমাজ নে চলতে হয়।সবাই যা বলে আমিও চাই করবানি। তবে চিন্তা করিস না। একটা ভাল ব্যবস্থা হয়ে যাবে। যা… , আমি লোকজন বলে রাখবানি। শোন তোর বউয়ের না একটা কাড করে দিছি, মাসে মাসে ‍ত্রিশ কেজি করে চাল পাস । দু বছর পেয়ে যাবি। তোদের প্রতি আমার খ্যোল না থাকলে কি করি দিতাম।  কাড করার সময় সবা্র কাছ থেকে ১০০০ করে টাকা নিছি। তুই গরীব বলে আমি ৫০০টাকা নে তোর কাড করে দিছি।  ৫০০ টাকায় কাড হয় । স্যারদের কত অনুরোধ করে দশটা কাডের মধ্যে তোরটা চালায়ে দিছি। আমার গাটির তে টাকা দিতে হয়েছিল। তোর ভালবাসি বলেতো আমি এই কাডটা করে দিছি। আচ্চা, তুই তোর ওয়াড সভাপতির কাছে একটু যা । আচ্চা ঠিক আছে, তোর যেতে হবে না আমি বলবো। তুই মেয়েডারে নিয়ে বিকেলে আমার বাড়িতে আয়। এই সময় মেম্বারের মেয়েটা স্কুলে যাবে বলে চিৎকার দেয় , বাবা আমার স্কুলে দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি এসো, নাস্তা খেতে হবে। তাহলে যা বললাম তাই কর রহিম , বিকেলে আয়্ শশীর স্কুলে যেতে হবে। আজ আবার অভিভাবক সমাবেশ।যা যা বললাম তাই কর।রহিম চলে যাবার পর মেম্বার শরিফের কাছে ফোন দিয়ে যা যা করার দরকার বলে দেয়।

রহিম তোর কথা তো ‍শূনলাম , একটু হায় তুলে ক্যাম্পের বড় বাবু বলল। শরিফ তোর গরু নিয়ে গেছে তুই বললি। শরিফ কি বলিস বলে মুখটা শরীফের দিকে দিয়ে বলল, গরু বিষয়ে  কিছু বল।

শরিফ  চেয়ার থেকে উঠে বলল, গ্রামের গন্যমান্য ব্যক্তি আছে । সবায় কে  আমার সালাম , ছেলামলাইকুম।

দশদিন আগে দলীয় প্রোগ্রামের জন্য আমি রহিমের কাছ থেকে গরু কিনি। সভাপতি আছে। গরুর মাংসের  জন্য বরাদ্দ ছিল। যা বরাদ্দ ছিল আমি তা রহিমকে দেদিছি।  আর কি করতে পারি। রহিম গরু বেচে একন কচ্ছে মিথ্যি কথা।

রহিম দিশা না পেয়ে বলল, ডাহা মিথ্যি কতা, আমি গরু বেচবো না কিন্তুক তিনচার জন গে আমার গরু খুলে নে আসলো। আসার সময় আমার হাতে দুহাজার টাকা দেছে । অতো বড় গরুর দাম দুহাজার টাকা…..!!!

একন এক কেজি গোশতের দাম সাড়ে চারশো টেকা। আর আমার তিনমন ওজনের গরুর দাম দুহাজার টাকা! আমি সে টেকা ওদের মুখের সামনে চেলে ফেলায় দিলে ওরা সে টেকা নে আমার মারে। আর ভয় দেখায় ।বলে, তুই ইকিনি কি করে থাকিস আমরা দেখে নেব। তারপর তিনদিন আগে শনিবারে আমার মেয়ে খেলা করতে  আম বাগানে গেলি ওরা আমার বাচ্ছা মেয়েডাকে রেপ করে । মেয়েডা আমার মরে যায় যায়। বাচে…! এত …টুকু মেয়ে।  মিজান ডাকতার দেখেছে। মেয়েটা আমার একনো ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে।

শরিফ কথা কেড়ে নিয়ে বলল, সব মিথ্যি কতা। আমি পয়তাল্লিশ হাজার টাকা ওরে দিছি। আর দুহাজার টাকা পরে দেবো বলি। পরে আমি দুহাজার টাকা দে আসি। আমার সাথে শাকু , সাব্বির ছিল। একন কি মিথ্যি বলে! গবীররা সব সময় মিথ্যি বলে।

 রহিম চিৎকার দিয়ে  কেঁদে কেঁদে বলে , সব মিথ্যি কতা । সব মিত্যি কতা।  খোদা তোর মুখে ঠাডা ফেলায় না কেনো। তোর মত হারামির মরণ হয় না কেন।

শরিফ তেজে উঠে রহিমকে মারতে যায়। মেম্বার নিস্তার করে। শরিফ বলে , আমি তোর মেয়েকে কিছু করিনি। ও আম বাগানে আম কুড়াতে যায়। গাছ তে পড়ে গে ওর এমন হয়েছে। আর বলে কিনা , আমি রেপ করেছি। আমি আরো ওকে তুলে দিই। আর আমার বিরুদ্দে অপবাদ।উপকার করলে পেট বাধে। এ কি ছেদাড়ি অপবাদ।

মেম্বার বলল, চুপ কর সম্মানিত সবার সামনে আমি বলছি, রহিম গরিব মানুষ ,। মেয়েটা গাছ থেকে পড়ে কেটে গেছে । ডাকতার খরচের জন্য আমি  পাচশো টাকা  টাকা দেবো। শরিফ তুই পাঁচশো টাকা দিস।গরিব মানুষ কি আর করবে। টাকা কটা পেলে ওর উপকার হবে ।এই কথা বলে মেম্বার পকেট থেকে ১০০০ টাকার নোট বের করে বলল, যা আমিই ১০০০টাকা দিলাম। তোর উপকার হোক। তোর ভালবাসি বলেই তো দিলাম । মানুষের উপকার করতে হয়। মানুষ মানুষের জন্য।

যদি মানুষ মানুষের জন্য হয় । অমানুষ অমানুষের জন্য । দানব দানবরে জন্য।  মানুষের জন্য দানবের পরান তো কাদবে না। রহিম টাকাটা হাতে নিয়ে থুতু মেরে মেম্বারের সামলন ছুড়ে ফেলে দিযে চলে যেতে যেতে কাঁদতে কাঁদতে বলে , আল্লা তোদের বিচার করবে ।তোদের মত নিমক হারামিদের বিচার আল্লা করবে। তোদের মত খারাপ অসুর দানব এই পৃথিবীতে আর নেই। আমার মেয়ের রেপ করে এক হাজার টেকা দিস উজ্জতের দাম । গরু মেয়ে জুতা দান। তোদের যেনো মা মেয়ে বোন না হয়্ ।এই পৃথিবীতে যেনা আর কেউ মেয়ের বাপ না হয়। হে আল্লা তুমি আর কাউকে মেয়ের বাপ করো না।ন্ষ্পিাষ শিশুর যে দেশে ধর্ষণ হতে হয় সে দেশে  মেয়ে আর দিও না। যে দেশে ৮ বছরী মেয়ে ধর্ষণ হয় , সে দেশে কোনো মেয়ের আর জন্ম দিও না।  আল্লাহ যে দ্যাশে বিচার নেই সে দেশে তুমি গজব দেও।  আর আমারে তুমি তুলে নাও। আমি এই মাটিতে আর থাকতে পারছি না।

পরদিন সকালে পত্রিকায় সংবাদ হলো “  বঙ্গপুর বাবা – মেয়ের ট্রেনে কেটে মৃত্যু”

রেশমীরা মরে পৃথিবীর বিচার ব্যবস্থা বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাল। রহিম নিজে মরে নিজেকে মুক্ত করলো। পৃথিবীতে কি নিরীহদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। রহিম – রেশমীরা ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা গেলো্ আর  শরিফ, মেম্বার, মোড়লদের কেনো মৃত্যু হয় না। তারা যুগে যুগে কেনো ফিরে আসে? কবে দেশ মুক্ত হবে, ন্যায় বিচার পাবে জনগন।

স/এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন