নবাবগঞ্জ.দোহার (ঢাকা) প্রতিনিধি.
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন, ইটাভাটায় সরবরাহ ও মৎস্য খামার তৈরীর কৌশলকে কাজে লাগিয়ে ফসলী জমির মাটি বিক্রির ধুম পড়েছে। মাটি দস্যুদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা। কোথাও প্রকাশ্য, আবার কোথাও রাতের আধাঁরে প্রায় অর্ধশত স্থানে চলছে মাটির রমরমা ব্যবসা। এসব ব্যবসায় জড়িত রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সহযোগী সংগঠনের উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কতিপয় চেয়ারম্যান-মেম্বার পদমর্যাদার জনপ্রতিনিধিরা এসব অপকর্মের সাথে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাটি বিক্রির ব্যবসা চলমান রয়েছে বলে স্থানীয় জনসাধারণ অভিযোগ করেছেন। অপরিকল্পিত ভাবে মাটি কাটার কারণে এক দিকে যেমন পরিবেশের উপর প্রভাব পড়ছে। ঠিক তেমনি কমে যাচ্ছে ফসলী জমি।
এলাকাবাসীর দেয়া তথ্য অনুসারে, ভারত থেকে আমদানী করা মাহেন্দ্র নামের পরিবহনের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্রেতাদের ঠিকানায় পৌছে দেয়া হচ্ছে মাটি। অন্যদিকে মাহেন্দ্র পরিবহনের কারণে প্রতিনিয়ত কাঁচাপাকা সড়ক সমূহ খানা-খন্দে পরিণত হয়ে কোথাও বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তায় পানি জমে বিভিন্ন সময় দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। এতে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়নে নির্মিত রাস্তাঘাট ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার কৈলাইল, ভাঙ্গাভিটা, মালিকান্দা, দৌলতপুর, দিঘীরপাড়, দত্তখন্ড, পাতিলঝাপ, সুলতানপুর, কোন্ডা, খতিয়া, রুপারচর, তেলেঙ্গা, মেলেং, মাতাবপুর, ভাওয়ালিয়ার চক, কান্দামাত্রা, আজিজপুর, আগলা পূর্বপাড়া, মাইলাইল, খানেপুর, জয়কৃষ্ণপুর, বাইমাহাটি, তাশুল্যা, মৃধাকান্দা, সিংজোর ও দেওতলা এলাকায় ফসলি ও নদী পারের জমি থেকে ভেক্যুর সাহায্যে মাটি তুলে বিক্রি করছে এ চক্রটি। তবে এসব এলাকার বাসিন্দারা জানান, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশী তৎপরতায় দিনের বেলা মাটি কাটা বন্ধ থাকলেও রাতের অন্ধকারে বেশীর ভাগ মাটি কাটা হচ্ছে।
নবাবগঞ্জের এক প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা জানান, উপজেলার কৈলাইল ও ভাঙ্গাভিটা এলাকায় মাটি উত্তোলনের সিন্ডিকেট বেশ শক্ত। তাদের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে পাহারা বসিয়ে মাটি কাটা হয়। রাতের বেলা নির্জন বিলে এ বাহিনী অত্যন্ত ভয়ংকর বলে মনে করে ওই এলাকার সাধারণ মানুষ। এরা প্রত্যেকেই নেশাগ্রস্ত ও অস্ত্রধারী বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইছামতি নদীর কৈলাইল ও ভাঙ্গাভিটায় পুলিশ বা প্রশাসন অভিযান চালাতে গেলে ৫টি রাস্তার প্রবেশ মুখে এ সিন্ডিকেটের সদস্যরা উৎ পেতে থাকে। আগলা তেঁতুল তলা, কোমরগঞ্জ ট্রলার ঘাট, খারশুর ব্রিজ, মরিচা ট্রলারঘাট ও কৈলাইল বাজার । এসব স্থান দিয়ে পুলিশ যেতে দেখলেই তারা খবর পৌছে দেয়। ফলে দ্রুত সটকে পড়ে মাটি দস্যুরা।
এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, এমপি স্যারের পরামর্শক্রমে মাটি কাটার বিরুদ্ধে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার জিহাদ ঘোষণা করেছেন । তাই প্রতিদিন রাতে আমার থানা এলাকার টহল পুলিশ দুষ্টু চক্রকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
সম্প্রতি নবাবগঞ্জ উপজেলা আইনশৃৃংখলা কমিটির এক সভায় সাবেক মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম নবাবগঞ্জের নদী নালা ও খাল বিল থেকে অবৈধভাবে কেউ মাটি কাটলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন প্রশাসনকে।
একদিকে যেমন কমে যাচ্ছে কৃষি জমি ,অন্যদিকে পুকুর খননের নামে মাটি বিক্রির ফলে পার্শ্ববর্তী জমি ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে নবাবগঞ্জে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আবাদি জমির পাশ থেকে গভীর করে মাটি উত্তোলনের ফলে ফসলী জমির উর্বরতা কমে গিয়ে অনাবাদযোগ্য হয়ে পড়ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩শত ৫টি গ্রামের সমন্বয়ে ১৪ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নবাবগঞ্জ উপজেলা। ২৪৪.৮১ বর্গ কিলোমিটার অধ্যষিত কৃষিভিত্তিক এই উপজেলায় চাষযোগ্য ফসলি জমির পরিমান প্রায় ৩০,৮৯২ হেক্টর। নবাবগঞ্জ উপজেলাটি রাজধানী ঢাকার পার্শবর্তী এলাকা হওয়ার সুবাদে শোল্লা, যন্ত্রাইল, ও কৈলাইল ইউনিয়নে উৎপাদিত শাক সবজি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানী করা।
কৈলাইলের মালিকান্দা গ্রামের কৃষক সমিজ উদ্দিন জানান, আমার অধিকাংশ জমিতে রসুনের চাষ করি। লাভ ও বেশ। কিন্তু পাশের জমির মাটি কিনে নেয় প্রভাবশালী মহল। তাই এবার আর রসুনের চাষ করি নাই।
শোল্লা ইউনিয়নের কোন্ডা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মমিন মিয়া বলেন, আমাদের এলাকার বেশ কিছু লোক পুকুর খননের কথা বলে মাটি বিক্রি করে বছরের পর বছর। তাদের বাধা দেয়ার কেউ নাই।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল আমীন বলেন, কৃষি জমি রক্ষায় সচেতনতা জরুরি, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দিন দিন আবাদযোগ্য ভূমি কমে যাচ্ছে। তাই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে কৃষি জমি রক্ষায়।
উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা শাকিল আহমেদ বলেন, মাটি কাটার দায়ে আমরা অনেক এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল জরিমানা করেছি। মাননীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামের নির্দেশে সর্বত্রই মাটি কাটা বন্ধ করা হয়েছে। কেউ চুরি করে কাটলে দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স/এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন