দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরের পর বছর সমাবর্তন অনুষ্ঠান হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে একটি সনদ নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের কথা থাকলেও সমাবর্তন না হওয়ায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর ক্যাম্পাস ছাড়তে হয় মূল সনদ ছাড়াই। সাময়িক সনদ দিয়েই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হচ্ছে তাদের। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিতভাবে সমাবর্তন যেন সোনার হরিণ হয়ে গেছে। শিক্ষাজীবন শেষে সমাবর্তন হবে, শিক্ষার্থীরা আচার্যের কাছ থেকে সনদপত্র নেবেন— এ স্বপ্ন আর বাস্তবায়ন হয় না তাদের। যদিও প্রতিবছর সমবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা উচিত। এতে শিক্ষার্থীরা উৎসাহ-উদ্দীপনা পায়। তাদের মধ্যে কর্মস্পৃহা জাগ্রত হয়।

প্রতিবছর সমাবর্তনের নিয়ম থাকলেও প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সমাবর্তন হয়নি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের বেগম রোকেয়াসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৫ বছর ধরে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) গত ২৫ বছরে মাত্র দুবার সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। মূল সনদ না পেয়ে সাময়িক সনদ দিয়ে চাকরি করতে গিয়ে বিপাকেও পড়তে হয়। নিম্নমানের কাগজে দেওয়া এসব সাময়িক সনদের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকে। তাই প্রতিবছর সমাবর্তন হওয়া উচিত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠার এক দশক পার করলেও এখনো সমাবর্তন পাননি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠ সম্পন্ন করা লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী। প্রতিটি বিভাগের সাত থেকে আটটি স্নাতক সম্পন্ন করা ব্যাচ বের হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সমাবর্তনের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন এই শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় সমাবর্তনের আয়োজন করা যাচ্ছে না। কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসের জন্য মাটি ভরাট করা হচ্ছে। সেখানেই আগামী বছর সমাবর্তনের আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় গত ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ভেদে ছয় থেকে সাতটি ব্যাচ বের হলেও তাদের  সমাবর্তনের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক যুগের বেশি কোনো সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়নি। এর কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনীহাকে দায়ী করছেন শিক্ষকরা। সমাবর্তন ছাড়াই মূল সনদ প্রদান করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা। জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের ২৭ এপ্রিল এখানে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ৫ ডিসেম্বর। ২০০২ সালের ২৮ মার্চ তৃতীয় ও সর্বশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সমাবর্তনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারি বলেন, সমাবর্তন অনুষ্ঠানের জন্য পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এর তারিখ চেয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর তারিখ অনুমোদন দিলেই আমরা অনুষ্ঠানের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করব। আশা করছি এ বছরের শেষের দিকেই সমাবর্তন করা যাবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর গত ২৫ বছরে সমাবর্তন হয়েছে মাত্র দুবার। ১৯৯৮ সালের ২৯ এপ্রিল প্রথম এবং ২০০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৫তম একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠকে তৃতীয় সমাবর্তনের ঘোষণা দিলেও তা আয়োজন করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় সমাবর্তনের পর প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী  স্নাতক, স্নাতকোত্তর শেষ করলেও তাদের ভাগ্যে সমাবর্তন জোটেনি। দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯৯-২০০০ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হলেও ২০১০ সালে প্রথম সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়। এরপর বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ছয়টি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের স্নাতক সম্পন্ন হলেও তারা সমাবর্তনের সুযোগ পাননি। কবে নাগাদ আগামী সমাবর্তনের আয়োজন করা হবে এ ব্যাপারেও নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি বিশ্ববিদ্যালয়টির পক্ষ থেকে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সর্বশেষ সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন বিভাগের অন্তত চারটি শিক্ষাবর্ষের ছাত্র-ছাত্রীরা স্নাতক-স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সমাবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন সমাবর্তন না হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রতি বছর সমাবর্তন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই তা দীর্ঘদিন হয় না। এর পেছনে নানা কারণও রয়েছে। সমাবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত স্থান সঙ্কুলান না থাকাও একটি বড় কারণ। এ ছাড়া সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মহামান্য রাষ্ট্রপতি অথবা চ্যান্সেলরের প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী উপস্থিত থাকেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এ দুই ব্যক্তির সময় স্বল্পতাও সমাবর্তন যথাসময়ে না হওয়ার একটি কারণ।

স/এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন