সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :
সুনামগঞ্জের দুর্যোগাক্রান্ত মানুষ দুর্যোগ ও ত্রাণ সচিবের বেফাঁস মন্তব্যের প্রতিবাদে ফুসে উঠেছে। এর প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন। ২১ এপ্রিল শুক্রবার রাতে শহরের শহীদ জগৎজ্যোতি পাঠাগার মিলনায়তনে কর্মী সমাবেশ ও দুপরে আলফাত উদ্দিন স্কোয়ারে (ট্রাফিক পয়েন্ট) এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। এর আগে ২০এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা,ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি,সেনাবাহিনীর দ্বারা ত্রাণ ও পূণর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা এবং হাওরের ফসলরক্ষায় নদী-খাল ও বিল খননের দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি দেন এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলেও ছাতকের একটি সভায় বক্তব্য রাখেন সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। সংগঠনের সদস্য সচিব সাংবাদিক বিন্দু তালুকদারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন,যুগ্ম আহবায়ক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান,বিজন সেন রায়,সংগঠনের সদস্য ও বিএনপি নেতা রুহুল আমীন,সংস্কৃতিকর্মী জাহাঙ্গীর আলম ও কৃষক আব্দুল কাইয়ুম প্রমুখ। এসময় বক্তারা বলেন, দুর্যোগ ও ত্রাণ সচিবের অপমানজনক মন্ত্যব্যে আমরা সুনামগঞ্জবাসী স্তম্ভিত। দুর্যোগকালিন সময়ে এ ধরণের উপহাস করায় তার শাস্তির দাবি করছি। অন্যথায় আন্দোলন তীব্রতর হবে বলেও হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন বক্তারা। প্রসঙ্গত,সুনামগঞ্জকে যারা দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তাদের কোন জ্ঞানই নেই- মন্তব্য করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ শাহ কামাল বলেন, দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নামে একটা আইন আছে। এই আইনের ২২ ধারায় বলা হয়েছে কোন এলাকার অর্ধেকের উপরে জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হয়। না জেনে যারা এমন এমন সস্তা দাবি জানায় তাদের কোন প্রকার জ্ঞানই নেই। ১৯ এপ্রিল বুধবার রাতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সচিব সঞ্চালকের দায়িত্ব নিয়ে সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবিতে আন্দোলনকারীদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলে এমন তীর্যক মন্তব্য করেন তিনি। অবজ্ঞার সুরে সচিব আরো বলেন, কিসের দুর্গত এলাকা ”একটি ছাগলও তো মারা যায়নি”।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিবের এমন মনগড়া তথ্য শোনার পর উপস্থিত জনপ্রতিনিধি, সুধীজন, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের লোকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সেইসাথে ফসলহারা কৃষকের পক্ষে আন্দোলনকারীদের নিয়ে সচিবের এমন কটূক্তির প্রতিবাদে উপস্থিত অধিকাংশ গণমাধ্যম কর্মীরা সভা থেকে বেরিয়ে আসেন। সভায় উপস্থিত সুধিজনরা জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২ এর ২২ ধারার কোন উপধারায় দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে অর্ধেকের বেশি মানুষ মারা যাওয়ার কোন শর্তের কথা কোথাও উল্লেখ নাই। সভার প্রধান অতিথি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ফসলহারা কৃষকদের প্রতি আন্তরিকতা রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, আমাদের এই দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি ও সামর্থ রয়েছে। ছয় মাস নয় প্রয়োজনে ছয় বছর হাওরাঞ্চলের কৃষকদেরকে খাওয়াবে শেখ হাসিনার সরকার। তবু কাউকে এ সরকার না খেয়ে মরতে দেবে না। শেখ হাসিনার গোডাউনে খাদ্যের কোন অভাব নেই উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, যতোদিন পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের পানি না সরে ততদিন পর্যন্ত কৃষকদের খাদ্যের যোগান দেবে সরকার। হতাশ হওয়ার কিছু নেই ওলি-আউলিয়ার দেশ সিলেটের মানুষের কিছুই হবে না। এ সময় মন্ত্রী সুনামগঞ্জ জেলার দেড় লাখ পরিবারকে তিন ধরনের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
সভায় সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন, দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হলে কোন এলাকার অর্ধেকের বেশি মানুষ মারা যেতে হবে। সচিবের এমন বক্তব্যের দ্বিমত পোষণ করেছি। আমি বলেছি মহামান্য রাষ্ট্রপতি সুনামগঞ্জে মতবিনিময় সভায় জাতির জনককে উদ্বৃতি করে বলেছেন, না কাঁদলে মা-ও দুধ খাওয়ায় না। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ড. জয়া সেনগুপ্তা এমপি, অ্যাডভোকেট শামছুন নাহার বেগম শাহানা রব্বানী এমপি, পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ এমপি, সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট, সুনামগঞ্জ পৌর মেয়র আইয়ুব বখত জগলুল, জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার বরকতুল্লাহ খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন, অধ্যক্ষ ইদ্রিস আলী বীরপ্রতিক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী সেলিম আহমদ তালুকদার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের সচিব, মহা পরিচালকসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে দুপুরে সুনামগঞ্জের অকালে তলিয়ে যাওয়া বিভিন্ন হাওর পরিদর্শন করেন মন্ত্রী। অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে, কোথাও বাঁধ না হওয়ায় একের পর এক হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার লাখ লাখ বোরো চাষী সর্বশান্ত হয়ে গেলে জেলাজুড়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, কৃষক সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ এপ্রিল শহরের আলফাত স্কয়ারে (ট্রাফিক পয়েন্ট) সুনামগঞ্জ-৪ আসনের এমপি পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ জনসভা করে জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান। একই দিন দুপুরে স্থানীয় শহীদ জগৎজ্যোতি পাঠাগার মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট ও পৌরসভার মেয়র আয়ুব বখত জগলুল।
এছাড়া দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন করে হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন নামের একটি সামাজিক সংগঠন। সংবাদ সম্মেলন করে জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী। জেলা আইনজীবী সমিতিও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দিয়ে সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানায়। একই দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন জেলা শাখা। সর্বশেষ ১৯ এপ্রিল বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবিতে জেলা শহরের শহীদ জগৎজ্যোতি পাঠাগার মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
এদিকে, গত ১৭ এপ্রিল রাতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সুধীজনের মতবিনিময় সভায় কিশোরগঞ্জের এমপি রাষ্ট্রপতিপুত্র রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলকে দুর্গত এলাকার ঘোষণার দাবি জানান।

স/ এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন

Power by

Download Free AZ | Free Wordpress Themes