রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলা আজও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। নৃশংস এ বোমা হামলার দীর্ঘ ১৬টি বছর পার হলেও মামলার বিচার সম্পন্ন হলো না।। বৈশাখ আসে বৈশাখ যায়, বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে।এবারের পহেলা বৈশাখে শুক্রবার ঘটনাটি ১৭ বছরে পড়বে।

বটমূলে হামলার ঘটনায় করা হত্যা মামলার বিচারকাজ শেষ হলেও সাক্ষীর অভাবে ঝুলে আছে বিস্ফোরক আইনে করা অপর মামলাটি। দফায় দফায় সমন জারির পরও সাক্ষী হাজির করতে পারেনি পুলিশ। মামলাটি বর্তমানে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিনের আদালতে বিচারাধীন।

২০০১ সালে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হলেও আট বছর পর ২০০৯ সালের প্রথম অভিযোগ গঠনের পর বিস্ফোরক মামলায় মাত্র ১৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। মাঝে প্রায় ৫ বছর মামলাটির বিচারকাজ স্থগিত ছিল। হত্যা মামলার রায়ের পর ২০১৪ সালে বিস্ফোরক মামলাটির বিচার পুনরায় শুরু হলে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এ মামলায় মাত্র দুজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষীর অভাবে বছরের পর বছর মামলাটি ঝুলে আছে।বিএনপি নেতা ও প্রাক্তন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ এ মামলার চার আসামি এখনও পলাতক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আবু বলেন, বিষ্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলাটির সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।তবে কবে নাগাদ মামলার কার্যক্রম শেষ হবে, তা সঠিকভাবে বলা কঠিন।

তিনি বলেন, ‘এই ঘটনায় করা দুটি মামলার মধ্যে একটির রায় হলেও অপর মামলায় সাক্ষীরা আসতে অবহেলা করছেন। সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আদালত যথাসময়ে সমন দিচ্ছেন।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘পুলিশ সাক্ষী হাজির করতে না পারায় বিনাবিচারে আসামিরা এক যুগেরও অধিক সময় ধরে কারাগারে রয়েছে। যা কারো জন্যই কাম্য নয়। মূলত বিচারের নামে প্রহসন চলছে। আইন অনুসারে সাক্ষী হাজিরের দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু পুলিশ তা করতে পারছে না।’

তদন্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আসামিরা একটি গাড়িতে করে ঘটনাস্থলে বোমা এনেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই গাড়ি কিংবা গাড়ির ড্রাইভারকে আদালতে আনতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ছায়ানট কর্তৃপক্ষের কেউই এ মামলায় সাক্ষী দিতে আসেননি।’

প্রায় তিন বছর আগে নিন্ম আদালতে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হলেও উচ্চ আদালতে মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়নি। ১৩ বছর পর ২০১৪ সালে বিচারিক আদালতের দেয়া হত্যা মামলার রায়ের বিরুদ্ধে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত ও যাবজীবনপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিলের শুনানিতে চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন চলছে।বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন আছে।

গত ১০ জানুয়ারি আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ৩ আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি উপস্থাপনের পর এ যুক্তিতর্ক শুরু হয়। ওইদিন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি মুফতি আব্দুল হান্নানের পক্ষে তার আইনজীবী মোহাম্মদ আলী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরিফ হাসান সুমনের পক্ষে সুজিত চ্যাটার্জি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত শাহাদাতুল্লাহ জুয়েলের পক্ষে মো. আজিজুল হক হাওলাদার এবং দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ৫ আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী এসএম শফিকুল ইসলাম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার সাব্বির ফয়েজ বলেন, ‘বিচারিক আদালতের রায় ও মামলার নথিসহ ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছার পর রায়ের পেপারবুক তৈরি করা হয়। এ মামলা বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের বেঞ্চে এখন শুনানি চলছে।

প্রসঙ্গত, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালানো হয়। হামলায় ঘটনাস্থলেই নয়জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে একজন মারা যান। এ ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ ওইদিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন।

২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর দুই মামলায় ১৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ২০১৪ সালের ২৩ জুন বিচারিক আদালত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। এরপর ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিলের শুনানির জন্য মামলাটি হাইকোর্টে আসে। হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হলেও বিস্ফোরক মামলাটি ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- মুফতি আব্দুল হান্নান, মাওলানা আকবর হোসেন, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে মাওলানা হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মাওলানা আবদুল হাই ও মাওলানা শফিকুর রহমান।

তাদের মধ্যে মুফতি আব্দুল হান্নান, মাওলানা আকবর হোসেন, আরিফ হাসান সুমন ও মাওলানা আবু বকর ওরফে মাওলানা হাফেজ সেলিম হাওলাদার কারাগারে এবং বাকিরা পলাতক রয়েছেন।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা সাব্বির, শেখ ফরিদ, মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা ইয়াহিয়া ও মাওলানা আবু তাহের।

স/ এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন