তিস্তার পানি চুক্তি ভারত কখন সই করবে, তা জানতে চেয়েছিল বাংলাদেশ। জবাবে অভিন্ন ওই নদীটির পানি ভাগাভাগির চুক্তি করার বিষয়ে গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, একমাত্র তাঁর এবং শেখ হাসিনার সরকারই দ্রুত তিস্তার পানি ভাগাভাগির সমাধান করতে পারবে। তাঁর মতে, তিস্তা শুধু ভারত আর বাংলাদেশের জন্যই নয়, দুই দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মোদির পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ বিষয়গুলো (তিস্তা চুক্তি, গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ শুরু এবং অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা) দ্রুত সমাধানের ব্যাপারে ভারতের সহযোগিতা পাব।’

গতকাল শনিবার দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর এই সফরের অন্যতম প্রতিক্ষীত বিষয় তিস্তা নিয়ে এমন অবস্থানের কথা জানান দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীরা। একান্ত আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর তাঁরা গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বক্তৃতা করেন। এর আগে সরকারি পর্যায়ে সই হওয়া ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের মধ্যে ৪টি বিনিময় করা হয়। মোড়ক উন্মোচন করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটির হিন্দি সংস্করণের। এরপর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন হয় খুলনা ও কলকাতার মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেনের পরীক্ষামূলক চলাচল, খুলনা-কলকাতা বাস চলাচল এবং পশ্চিমবঙ্গের রাধিকাপুর থেকে ট্রেনে করে বিরলে বাংলাদেশের জন্য ডিজেল পরিবহনের।

বক্তৃতাপর্ব শেষ করে শেখ হাসিনাকে নিয়ে মধ্যহ্নভোজে যান নরেন্দ্র মোদি। এরপর নরেন্দ্র মোদির গাড়িতে চড়ে মানেকশ সেন্টারে যান শেখ হাসিনা। সেখানে তাঁরা একাত্তরে শহীদ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাত পরিবারের সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দেন।

ভারত সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল দুপুরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে ২২টি চুক্তি ও চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি l ছবি: ফোকাস বাংলাভারত সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল দুপুরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে ২২টি চুক্তি ও চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি l ছবি: ফোকাস বাংলাসকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে গার্ড অব অনার নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান নরেন্দ্র মোদি। এরপর শেখ হাসিনা রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান। সেখান থেকে হায়দরাবাদ হাউসে যান শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিতে।

গতকাল দুপুরে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের সামনে বক্তৃতা পর্বের শুরুর দিকে সঞ্চালকদের শব্দ প্রয়োগ শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির হাসির খোরাক তৈরি করে। বিশেষ করে তাঁদের মঞ্চ থেকে নেমে আসতে ‘স্টেপ ডাউন’ (সাধারণত সরে যাওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়) শব্দটি প্রয়োগ করেন সঞ্চালক। এটি শুনেই হো হো করে হেসে ওঠেন দুই প্রধানমন্ত্রী। কয়েক সেকেন্ডের বিরতিতে হলঘরে উপস্থিত অন্যরাও বিষয়টি বুঝে হাসতে শুরু করেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর হাসির রেশ ছিল প্রায় এক মিনিট।

নরেন্দ্র মোদি তাঁর বক্তৃতার শুরুতে বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে শুভেচ্ছা জানান বাংলাদেশের জনগণকে। শেখ হাসিনার দিল্লি সফর দুই দেশের বন্ধুত্বের আরেকটি সোনালি যুগের অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দুই প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থবহ পদক্ষেপ নিতে রাজি হন। বিশেষ করে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে নতুন ক্ষেত্র ঠিক করে সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন তাঁরা। নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমরা নতুন কিছু ক্ষেত্র, বিশেষ করে উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চাই, যার সঙ্গে দুই দেশের তরুণদের নিবিড় সম্পর্ক আছে।’

বাংলাদেশের উন্নতিতে সব সময় পাশে থাকার প্রসঙ্গ টেনে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার। আমাদের সহযোগিতা যাতে অবশ্যই সাধারণ মানুষের উপকারে আসে, তা নিশ্চিত করতে ভারত ও বাংলাদেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশকে তৃতীয় ঋণ চুক্তির আওতায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার (৩৬ হাজার কোটি টাকা) দেওয়ার কথা জানান তিনি। গত ছয় বছরে এ নিয়ে বাংলাদেশকে ৮ বিলিয়ন ডলারের (৬৪ হাজার কোটি টাকা) বেশি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

বহুল আলোচিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখার সমঝোতা স্মারক প্রসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে আমরা দীর্ঘদিনের আলোচিত চুক্তি সম্পন্ন করেছি। বাংলাদেশের সমরাস্ত্র কেনাকাটার জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের (৪ হাজার কোটি টাকা) ঋণ চুক্তি করা হয়েছে। বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই এই কেনাকাটা হবে।’

নরেন্দ্র মোদি এবং শেখ হাসিনার সরকারই তিস্তা চুক্তি করবে বলে জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এ ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদি তাঁর অঙ্গীকার ও ভবিষ্যতে প্রয়াস অব্যাহত রাখার কথা বলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি ভারতের জন্য, বাংলাদেশের জন্য সর্বোপরি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তার ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে দায়িত্ব আছে, সেটিও তিনি তাঁকে মনে করিয়ে দেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভারতের সন্তুষ্টির কথা উল্লেখ করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, এই সম্পর্কটা রক্ত আর কয়েক প্রজন্মের আত্মীয়তার বাঁধনে শক্ত হয়েছে। এই সম্পর্ক দুই দেশের জনগণের জন্য আরও ভালো ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ কামনা করে।

দুই দেশের সরকারি পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, তিস্তা কবে, কখন সই হচ্ছে তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে মেলেনি। তবে আগামী দুই দিন এই কাজ কতটা এগিয়ে নেওয়া যায়, তার একটা উদ্যোগ আছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে এ মুহূর্তে দিল্লিতে অবস্থান করছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ দুই দফায় শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতার কথা বলার সুযোগ হবে। কালও তাঁদের কথা হবে আরেক দফা। এর পাশাপাশি ভারতের রাষ্ট্র্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও মমতার কথা বলার সম্ভাবনা থাকছে বলে জানিয়েছে এখানকার সরকারি মহল।

শেখ হাসিনা তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘দুই দেশের চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে আমরা আলোচনা করেছি। আমাদের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের সব দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।’

একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ জন্য বাংলাদেশ গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। ভারত সফরের সময় ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর শহীদ সদস্যদের সম্মান জানাতে পেরে তাঁর আনন্দের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে ভারত সমর্থন দিতে রাজি হওয়ায় তিনি এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির পাশাপাশি অপরাধ কার্যক্রম দূর এবং শান্তিপূর্ণ সীমান্ত প্রতিষ্ঠায় দুই দেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। দুই প্রধানমন্ত্রী তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, পদ্মা-গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প এবং নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছি। আমি আশা করব এসব বিষয়ে দ্রুত সমাধানের জন্য ভারতের সহযোগিতা পাব।’

শেখ হাসিনা বলেন, আজ দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি সইয়ের ফলে বিভিন্ন জায়গায় সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম ইত্যাদি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তা ছাড়া পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে অ্যান্টি ডাম্পিং আরোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে রাজি হয়েছি।’

নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী চিন্তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর ফলে যে শুধু ভারত এগিয়ে যাচ্ছে তা নয় বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা।

দুই দেশের মধ্যে মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আগরতলায় বাংলাদেশের ভিসা অফিসকে যুগোপযোগী করে সহকারী হাইকমিশন ও গুয়াহাটিতে নতুন সহকারী হাইকমিশন খোলার কথা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। ভারতও বাংলাদেশে অনেক ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র চালু করবে। এতে দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তি মজবুত ও সম্প্রসারিত হবে বলে জানান তিনি।

স/নিপা

         
print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন