রাজধানীতে কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র ইন্দোনেশিয়া এবং কেনিয়া ভ্রমণের আড়ালে মানবপাচার করে চলেছে। ইউরোপ এবং অষ্ট্রেলিয়া যাওয়ার প্রলোভনে পাচারকারীদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কিছু মানুষ।

শুক্রবার কেনিয়ার নাইরোবি যাওয়ার পথে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ৭৩ জনকে আটক করে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবি)। তার আগে ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার পথে ৭০ জনকে আটক করা হয়।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চাঙ্ক্ষা থেকে এ পথে যাওয়া লোকজন একদিকে যেমন বিপদে পড়ছে অন্যদিকে দেশের সুনামও ক্ষুণ্ন করছে। আর যে সিন্ডিকেট এ কাজে সহযোগীতা করছে তাদের গ্রেফতারে কাজ করা হচ্ছে।

এপিবির সহকারী পুলিশ সুপার তারিক আহমেদ বলছেন, কেনিয়া যাওয়ার জন্য বাংলাদেশিদের জন্য অনঅ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা রয়েছে। এ সুযোগ নিয়ে একটি সিন্ডিকেট ইউরোপ যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে তারা সেখানে নেয়। এরপর লিবিয়া অথবা এর পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে নিয়ে সাগরে নৌকা অথবা ট্রলারে করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে তারা গ্রিস বা মেসিডোনিয়ায় নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। একদিকে যেমন এটি অবৈধ অন্যদিকে প্রাণহানীর শঙ্কাও রয়েছে। এছাড়াও পাচারকারী চক্র নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ওই দেশে নিয়ে যাওয়ার পর দেশে তার আত্মীয়-স্বজনকে মুক্তিপণ হিসেবে বিশাল অংকের টাকা দাবি করে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ সকল ঘটনায় মামলা দায়ের হয়। পরে মামলার তদন্ত করে অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডি। তবে আমরা শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সেই জন্য আমরা সতর্ক রয়েছে।

অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিদেশ গমনেচ্ছুদের প্রথমে আকাশপথে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও বালিতে পৌঁছে দিচ্ছে মানব পাচারকারীরা। সেখান থেকে সাগরপথে তাদের নেয়া হচ্ছে মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া নিউগিনি ও তৎসংলগ্ন মহাসাগরীয় কিছু দ্বীপপুঞ্জে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, আগে ঢাকা থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী যাত্রী ছিল প্রতি বছর গড়ে ৫০০ জন। অন-অ্যারাইভাল ভিসা চালু হওয়ার পর গত তিন মাসেই দেশটিতে ভ্রমণে গেছে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি। এর ৫০ শতাংশই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে করপোরেট ভ্রমণে যাওয়া কর্মী।

বর্তমানে ঢাকা থেকে ইন্দোনেশিয়ায় যাত্রী পরিবহন করছে ছয়টি এয়ারলাইনস। ভাড়া কম হওয়ায় ঢাকা থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী যাত্রী সবচেয়ে বেশি পরিবহন করছে মালিন্দো এয়ার ও টাইগার এয়ারওয়েজ। ঢাকা থেকে মালিন্দো এয়ারের ফ্লাইট রয়েছে প্রতিদিন দুটি করে। আর টাইগার এয়ারওয়েজ ফ্লাইট পরিচালনা করছে দৈনিক একটি করে। এছাড়া ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস ও এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট রয়েছে দৈনিক দুটি করে। দৈনিক একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে থাই এয়ারওয়েজ ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস।

২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে বোমা হামলার পর দেশটিতে পর্যটকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক কমে যায়। এ অবস্থায় পর্যটক আকর্ষণে ইন্দোনেশিয়া সরকার বিমানবন্দরে অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা দিচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬৫টি দেশের নাগরিক এ সুবিধা পাচ্ছে। মানব পাচারকারীরা সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেকার যুবকদের সংগ্রহ করছে।

বৈধপথে প্রচলিত বাজারগুলোয় জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়ায় এবং নতুন বাজারগুলোয় সুবিধা করতে না পারায় অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। গত বছরও সমুদ্রপথে মানব পাচারের অন্যতম রুট ছিল বঙ্গোপসাগর। তবে সরকারের নজরদারির পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। এ কারণে কৌশল পরিবর্তন করেছে মানব পাচারকারীরা।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক সেলিম রেজা বলেন, সরকার সমুদ্রপথে বিদেশ পাড়ি না দেয়ার জন্য এলাকাভিত্তিক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বিদেশে চাকরির নামে কেউ যাতে দালালের খপ্পরে না পড়ে, সে ব্যাপারেও জনসচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে।

বঙ্গোপসাগর দিয়ে মানব পাচার সংকুচিত হওয়ার কারণেই মূলত নতুন রুট হিসেবে ইন্দোনেশিয়াকে বেছে নিচ্ছে মানব পাচারকারীরা।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ভিসা ছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় যারা যায়, তাদের পাসপোর্টে লো-প্রোফাইল থাকলে ছাড়পত্র দেয়া হয় না। তবে পাচারকারী চক্র এত শক্তিশালী যে, তাদের খপ্পরে পড়া ব্যক্তিদের ভারত, নেপালসহ পাশের দেশগুলোর ভিসা নিয়ে ঘুরে আসার ব্যবস্থা করে। ফলে ইমিগ্রেশন পুলিশও অনেক সময় বুঝতে পারে না। তবে আগে থেকে তথ্য থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়।

কিছুদিন আগ পর্যন্তও বঙ্গোপসাগর দিয়ে ব্যাপক হারে মানব পাচারের ঘটনা ঘটে। মৃত্যুঝুঁকি ও সহিংসতার আশঙ্কা সত্ত্বেও বিগত কয়েক বছর সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হয় অসংখ্য বাংলাদেশি।

জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ এই তিন মাসে বঙ্গোপসাগর দিয়ে ২৫ হাজার লোক সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছিল। এর অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশি। ২০১৪ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ অবৈধভাবে সমুদ্রপথে যাত্রা করে। এর মধ্যে শুধু বঙ্গোপসাগর দিয়েই গেছে ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ, যার বেশির ভাগেরই গন্তব্য থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া। এভাবে ২০১২ সাল থেকে গত তিন বছরে বঙ্গোপসাগর দিয়ে মালয়েশিয়া গেছে কমপক্ষে দেড় লাখ মানুষ।

এ বিষয়ে সিআইডি উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক শাহআলম মিয়া বলেন, ইতোমধ্যে আমরা বেশ কয়েকজন মানবপাচারকারীকে গ্রেফতার করেছি। বর্তমান সময়ে অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ নিয়ে একটি চক্র মানবপাচার করছে। এ ধরনের কয়েকটি সিন্ডিকেট চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের গ্রেফতার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

স/শা

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন