নব্য জেএমবির প্রধান মুসা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। সিলেটের আতিয়া মহলে টানা ৪ দিনের অভিযানে ৪ জঙ্গি নিহত হয়। এর মধ্যে একজন মুসা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, অভিযানে যে চার জঙ্গি নিহত হয়েছে তাদের মধ্যে একজন মুসা। এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। মুসা যে ছবি দিয়ে বাসা ভাড়া নিয়েছিল আর আমাদের কাছে যে ছবি রয়েছে তার সঙ্গে হুবহু মিলে রয়েছে। এতে করেই আমরা নিশ্চিত যে নিহত চার জঙ্গির একজন মুসা।

এদিকে এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে নব্য জেএমবির প্রধান মুসা অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। এর আগে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় জঙ্গি নেতা মারজান। তার আগে নারায়ণগঞ্জের অভিযানে নিহত হয় তামিম চৌধুরী। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ে শুধুমাত্র মেজর জিয়া ছাড়া বাকি সবার মৃত্যু হল।

মুসা যেভাবে গোয়েন্দা নজরে আসে : মুসার বিষয়টি তারা প্রথমে জানতে পারেন গত ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে অভিযানের পর। আজিপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধার তানভীর কাদেরীর কিশোর ছেলের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মাঈনুল ওরফে মুসার কথা বলে।

জঙ্গি তানভীরের কিশোর ছেলে তার জবানবন্দিতে বলে, ‘মেজর জাহিদ ও মাঈনুল ওরফে মুসার সঙ্গে আমার বাবার দীর্ঘদিন আগে থেকে পরিচয় ছিল। আমার বাবা, মেজর জাহিদ ও মুসাসহ উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি মসজিদে নামাজ পড়তো। তারা প্রায়ই উত্তরার লাইফ স্কুলের মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে একসঙ্গে জগিং করতো।’

ওই কিশোর আরও বলে, ‘বাবার মাধ্যমেই মেজর জাহিদ ও মুসার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। আমাকে ও আমার ভাইকে মুসা অংক, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের বিষয় পড়াতো।’

কিশোরটি জবানবন্দিতে আরও বলে, ‘প্রায়ই আমার বাসায় জাহিদ আংকেল, আন্টি (জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার), মেয়ে জুনায়রা ওরফে পিংকি এবং মুসা আংকেল আন্টিসহ যাতায়াত করতো। জাহিদ আংকেলের বাসা ছিল উত্তরা ১৩ নং সেক্টরে। তাদের বাসায় আমরাও যেতাম। মুসা আংকেলও আন্টিসহ ওই বাসায় যেত।’

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, উত্তরার লাইফ স্কুলে এক সময়ে শিক্ষকতা করতো মাঈনুল ওরফে মুসা। সেখান থেকেই নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ও তানভীর কাদেরীর সঙ্গে তার পরিচয়। এক পর্যায়ে নব্য জেএমবির দলে ভিড়ে মুসা। ধীরে ধীরে সে নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠে। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিল এই মুসা। তামিম চৌধুরীসহ নব্য জেএমবির তানভীর কাদেরী, জাহিদ, রাশেদ, জাহাঙ্গীর, মারজান, বাসারুজ্জামানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হতো তার। আজিমপুরের আস্তানা থেকে উদ্ধারের পর জাহিদের মেয়ে পিংকী ওই সময় সিটিটিসির কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল, তার মা মুসা আংকেলের বাসায় গিয়েছে। তাহরীম ও পিংকীর দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরেই মুসাকে খুঁজতে শুরু করে পুলিশ সদস্যরা।

যেভাবে জঙ্গিবাদে আসে মুসা : ২০০৪ সাল থেকেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে বর্তমানে নব্য জেএমবির প্রধান মঈনুল ওরফে মুসা। ওই সময়ে রাজশাহী অঞ্চলে বাংলা ভাইয়ের অপারেশন শুরু হলে তার হাত ধরেই সে জেএমবিতে যোগ দেয়। পরে দীর্ঘদিন পলাতক থাকলেও পরে প্রকাশ্যে আসে। গত ৮ মাস আগে সে তার নিজ বাড়ি রাজশাহীর বাগমারার বুজ্রুকোলা গ্রামে গিয়ে সৌদি আরব যাবে বলে ৩ লাখ টাকার জমি বিক্রি করে বাড়ি থেকে চলে আসে। এরপর তার আর বাড়ির সঙ্গে কোনও যোগাযোগ ছিল না। আর ঢাকায় মেজর জাহিদ আর মুসা একই বিল্ডিংয়ে ছিল। উত্তরার ৬ তলার ওই ফ্ল্যাটে তারা প্রায়ই মিটিং করতো।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নব্য জেএমবির প্রধান মুসা এটি তার সাংগঠনিক নাম। তার নাম মঈনুল ইসলাম। তার বাবার নাম আবুল কালাম মোল্লা। তিনি স্থানীয় মসজিদের মোয়াজ্জিন ছিলেন। সম্প্রতি তিনি মারা যান। তার মায়ের নাম সুফিয়া বেগম। গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারার বাসুপাড়া ইউনিয়নের বুজ্রকোলায়। ২০০৪-০৫ সেশনে মুসা বাগমারার তাহিরপুর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল। ২০০৪ সালের এপ্রিল থেকে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে রাজশাহী অঞ্চল তথা বাগমারা, নওগাঁর আত্রাই, রাণীনগর, নাটোরের নলডাঙ্গায় অভিযান শুরু হলে সে জেএমবিতে যোগদান করে। ওই সময় বাংলা ভাইয়ের সহযোগী হওয়ার সুবাদে এলাকায় দাপট দেখাতো এবং লোকজনকে জেএমবিতে যোগদানে উৎসাহ দিতো। যারা তার বিরোধীতা করতো তাদের ধরে এনে নির্যাতন করাও ছিল মুসার কাজ। পরবর্তীতে বাংলা ভাইয়ের আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর মুসাও কিছুদিন আত্মপোপনে ছিল। এরপর সে আবার এলাকায় ফিরে আসে। এইচএসসি পাস করার পর রাজশাহী কলেজে ভর্তি হয়। পরে সেখান থেকে রেফার্ড নিয়ে ঢাকা কলেজে চলে আসে। এরপর সেখান থেকে পাস করার পর উত্তরার লাইফ স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করে। শিক্ষকতা করলেও মুসা জেএমবিতে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। এরই মাঝে অর্থাৎ আড়াই বছর আগে সে বাসুপাড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাঁইপাড়া গ্রামের আব্দুস সামাদের মেয়ে তৃষ্ণামনিকে বিয়েও করে। বিয়ের পর সে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৬ তলা এক বাড়িতে ভাড়া থাকতো। আর এখানেই থাকতো নব্য জেএমবির আরেক নেতা আজিমপুরের অভিযানে আত্মঘাতী সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদ। মেজর জাহিদের মেয়ে লাইফ স্কুলে পড়তো বলে তাদের মধ্যে হৃদ্যতা গড়ে উঠে। আর এখানেই আরেক নেতা তানভির কাদিরসহ নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম চৌধুরী, জিয়াসহ অন্যান্য নেতাদের নিয়ে ওই বাসার ছাদে মিটিং করতো।

মঈনুল ওরফে মুসার মা সুফিয়া বেগম সাংবাদিকদের জানান, তার ছেলে সর্বশেষ এপ্রিল মে’র দিকে বাড়ি আসে। এ সময় সে জানায় সৌদি আরব যাবে টাকার দরকার। পরে জমি বিক্রি করে ৩ লাখ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যায়। এরপর একদিন কথা হয়েছে। এরপর থেকে আর কোনও যোগাযোগ ছিল না।

তিনি বলেন, আশকোনার ঘটনার পর পত্রিকা আর টেলিভিশনে দেখে আমি ছেলের ঘটনা জানতে পারি। মেজর জাহিদ আর আমার ছেলে উত্তরার একই বাড়িতে থাকতো। এ কারণে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।

তিনি আরো বলেন, মেজর জাহিদের এক মেয়েও ওই স্কুলে পড়তো। আমিও ওই বাসায় কয়েকবার গিয়েছি। সেখানে দেখেছি আমার ছেলে, মেজর জাহিদসহ আরও অনেকে ছাদের উপর মিটিং করতো।

স/নিপা

         
print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন