মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে থামছেই না দালালদের দৌড়াত্ব , জিম্মিদশায় রোগীরা

এম.এম.রহমান.মুন্সীগঞ্জ: মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ভেতরে- বাইরে দীর্ঘ দিন ধরে বেপরোয়াভাবে পুরো হাসপাতাল এলাকা চষে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডাগায়নোষ্টিক সেন্টারের নিযুক্ত দালালদের একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট।

শহরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা প্রায় ২০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের মালিকরাই দাললদের রোগী নেওয়ার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। এসব দাললদের বেতন দেয় ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের মালিকরা।

কিন্তু তারা দায়িত্ব পালন করেন হাসপাতালের বিভিন্ন ডাক্তারদের রুমে। এক একটি ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের থাকে একাধিক দালাল। একজন থাকে ঘোরা ফেরার মধ্যে । আরেকজন থাকে কর্তব্যরত ডাক্তারদের রুমে। অন্যজন ব্যস্থ থাকেন রোগীদের নিয়ে নির্ধারিত ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে পরিক্ষা নিরিক্ষা করানোর কাজে। এভাবেই প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত জেনারেল হাসপাতাল জুড়ে চলে অর্ধ শতাধিক দালালের রোগী নেয়ার কার্যক্রম। বিভিন্ন ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের দালালদের সরাসরি প্রশ্রয় দিচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এসব দালালদের পুষে রাখেন কর্তব্যরত ডাক্তাররা ।

ডাক্তরাই রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরিক্ষা নিরিক্ষা দিয়ে দালালদের হাতে তুলে দেয় বাহিরে তার নিযুক্ত ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের পরিক্ষা করতে যাওয়ার জন্য । হাসপাতালে যেসব পরিক্ষা হয় সেগুলোও বাহিরে করায় শুধুমাত্র কমিশন পাওয়ার লোভে। এতে করে দালালরা বেপরোয়া হয়ে রোগীদের টেনে, ফুসলিয়ে দালালদের নির্ধারিত ল্যাবে নিয়ে পরিক্ষা করান।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, সকাল ৯টা থেকেই ডাক্তারদের রুমের সামনে দায়িত্ব পালন করছেন দেখা যায় বিভিন্ন ক্লিনিকেট দালালদের। রুম্রে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে আরেক গ্রুপ । রোগী দেখা নিয়ে চলে ডাক্তারদের ব্যস্থতা। রোগী রুমে ঢুকছে আবার বের হচ্ছে । রুমে দাঁড়িয়ে থাকা দালাল ইশারা করে আবার কখনও বলে ওর সাথে গিয়ে পরিক্ষাগুলো করে নিয়ে আসেন। তখন রোগীরা মনে করে রুমে দায়িত্বে থাকা লোকটা হয়তো ডাক্তারের লোক বা সরকারী কর্মচারী ।

সরল বিশ্বাসে রোগীরা দালালদের মাধ্যমে ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অন্যদিকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে ডায়াগনোষ্টিক ল্যাব এর মালিক ও কমিশন লোভী ডাক্তাররা। অন্যদিকে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা ডাক্তারদের রুমে গিয়ে ভিড় জমায় এবং ডাক্তারদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ঔষধ কোম্পানির ঔষধ লিখার পরামর্শ দেন।

অনুসন্ধানকালে দেখা গেছে দালালদের কর্মতৎপরতা। মহিলা রোগীর হাতে টিকেট দেখা মাত্রই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন বোরখা পড়া মহিলা দাললরা। গ্রাম থেকে আসা রোগীরা যখন জানতে চায় পরিক্ষা করাবো রুমটা কোথায়? তখনই দালালরা কৌশলে রোগীকে ভূল বুঝিয়ে বলে এখানে পরিক্ষা করালে ভালো হবেনা । মেশিন নষ্ট, সরকারী পরিক্ষা ভালো হবে না ।

আমার সাথে চলেন কমের মধ্যে করিয়ে দিবো। এভাবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোগীদের নিয়ে টানাটানি করেন প্রায় অর্ধশতাধিক দালাল। বহি: বিভাগে রোগীদের স্বজনদের সাথে সব সময় কখা বলার চেষ্টা করেন বোরখা পড়া দালালরা। ২য় তলায় কনসালটেন্ট ডাক্তারদের নিযুক্ত দালালরা রোগীদের অন্য ফাঁদে ফেলে ।

আসুন স্বল্পমূল্যে আপনার পরিক্ষাগুলো করে দিব। আপনাকে রিপোর্ট দেখাতে আর কষ্ট করে হাসপাতালে আসতে হবেনা।এ ডাক্তার আমাদের ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে বসেন। আবার ডাক্তাররা রোগীদেরকে সরাসরি দালালদের হাতে তুলে দিয়ে বলেন,ওদের সাথে গিয়ে পরিক্ষাগুলো করিয়ে নিয়ে আসেন। এতে করে গ্রাম থেকে আসা রোগীরা সরল বিশ্বাসে ডাক্তারের কথা মতো দালালদের সাথে গিয়ে বাহিরের ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে পরিক্ষা করান।

অনুসন্ধানকালে যেসব ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের দালালদের হাসপাতালে দেখা গেছে তারা হলেন, ফেমাস ক্লিনিক এর দোহা যার দায়িত্ব ডা: কামরুল হাসানের রুমে এবং আসলাম ব্যস্থ থাকে রোগীকে ফেমাস ক্লিনিকে নেওয়ার কাজে। স্বপ্ননীড় ডায়াগনোষ্টিক ক্লিনিকের দালাল নূর হোসেন, স্বপন আর শাহিদা এরাও রোগীদেরকে তাদের ক্লিনিটে অটো করে নিয়ে যাওয়ায় ব্যস্থ। নিউ স্কয়ারের শরীফ, কানন, শ্যামল, নিউ পপুলার ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের জুয়েল, নাজমা। বেষ্ট ক্লিনিকের সাত্তার। মর্ডান ক্লিনিকের বাবুল, ইয়াকুব, ডালিম, আমেনা, মুন্না । প্রাইম ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের স্বপন এবং জোৎসনা বেগম। রেনেসা ডায়াগনোষ্টিকেরও রয়েছে একাধিক দালাল ডক্টরস ক্লিনিকের মো: মীরা, রকিব, মুন্নি আক্তার, নাজমা। এদের সকলকেই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে রোগীদের ভাগিয়ে নিতে ব্যস্থ থাকতে দেয়া গেছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী মাহমুদা বেগম বলেন, হাসপাতালের ডাক্তাররা বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের দালালদের আশ্রয় দিচ্ছে। প্রকাশ্যে প্রতিটি রুমে ক্লিনিকের দালাল মেয়েরা বোরখা পড়ে সিরিয়াল ম্যানেজ করার অজুহাতে দাঁড়িয়ে থাকে। ডাক্তার রোগীর পরিক্ষা লিখার সাথে সাথে রোগীর হাত থেকে স্লিপ টেনে নিয়ে ভূল বুঝিয়ে বাহিরে পরিক্ষা করতে নিয়ে যায়। আমার মায়ের কাগজসহ আমার মাকে একজন দালাল বাইরে নিয়ে গিয়ে ১৫শ টাকার পরিক্ষা করাইছে। এখন ঔষধ কেনার টাকা নেই।

দালালের খপ্পরে পড়া আরেক রোগী সুরুজ মিয়া বলেন, কয়েকজন দালাল আমাকে জোর করে বাইরে নিয়ে যায়। আমি বলছি আমার কাছে টাকা নেই পরে এসে পরিক্ষা করাবো। তবুও তারা আমাকে নিয়ে বলে যা আছে জমা দিয়ে করে যান পরে পুরো টাকা দিয়ে রিপোর্ট নিয়েন। এখন রিপোর্ট নিয়ে আসলাম ১২ শ টাকা রাখছে। ডাক্তার আমার রিপোর্টগুলো দেখে বললো যা লিখছি তাই খাবেন। পরিক্ষায় কি ধরা পড়লো তার উত্তর না দিয়েই বলে কোন সমস্যা নেই । ঔষধ খান ভালো হয়ে যাবেন।

মুন্সীগঞ্জ জেলা ক্লিনিট ও ডায়াগনোষ্টিক ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি আয়নাল হক স্বপন বলেন, শুধু ক্লিনিক বা ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের নয় বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরাও ডাক্তারদের অফিস চলাকালীন সময়ে হাসপাতালে প্রবেশ করা ঠিক না। জরুরি ভিত্তিতে এদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তাহলে স্বল্প খরচে রোগীরা হাসপাতালেই পরিক্ষা নিরিক্ষা করাতে পারবে। তাতে সু চিকিৎসা নিশ্চিত হবে।

জেলা ক্লিনিট ও ডায়াগনোষ্টিক ওনার্স এসোসিয়েশন এর সাধারন সম্পাদক আক্কাস আলী বলেন, হাসপাতালে আমার কোন দালাল নেই। আমি সব সময় দালালদের বিরুদ্ধে । সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দালাল থাকা মানেই বদনাম আর রোগীদের ঠকানো।

এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ ফজলে রাব্বি বলেন, দালালদের নিয়ন্ত্রনের জন্য হাসপাতালে সিসি টিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া আমাদের ভ্রাম্যামান আদালতের কার্যক্রম চলমান আছে। ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সাপ্তাহে ২ দিন ভিজিট করতে পারবে দুপুর ১২ টার পর থেকে। এছাড়া জরুরি বিষয় ব্যতীত কোন সময় তারা হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারবে না।

হাসপাতালের ভেতরে- বাইরে রয়েছে দালাল সিন্ডিকেট। এদের ঐক্যও বেশ মজবুত। আর তাদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেন খোদ হাসপাতালের ডাক্তার ও স্টাফরা। অনেকটা সর্ষের মধ্যে ভূত। সাধারন রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে, দালালদেরকে প্রশ্রয় প্রদানকারীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে প্রশাসন এমনটাই দাবী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের।

স/এষ্

Print Friendly, PDF & Email