মেহেরপুরে আর্সেনিকের ভয়াবহ থাবায় মানুষ দিশেহারা॥ গত ১০ বছরে মারা গেছে কমপক্ষে ২০ জন

আবু লায়েছ লাবলু, মেহেরপুর প্রতিনিধি : মেহেরপুর জেলার এক আতঙ্কের নাম আর্সেনিক। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা না থাকায় জেলার মানুষ জেনে শুনেই এ বিষ পান করে চলেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা সদর উপজেলার আলমপুর গ্রামে। আর্সেনিক আতঙ্কে দিশেহারা পুরো গ্রামবাসী।

এছাড়াও মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের অস্থিত্ব পাওয়া গেছে সদর উপজেলার আমঝুপি, বেলতলাপাড়া, বুড়িপোতা, উজলপুর ও সুবিদপুর; গাংনী উপজেলার ভোলাডাঙ্গা ও তেঁতুলবাড়িয়া এবং মুজিবনগর উপজলার তারানগর ও জয়পুর  গ্রামের টিউবওয়েলের পানিতে।

নিরাপদ পানি না পেয়ে নিরুপায় হয়েই মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করায় আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ওইসব গ্রামের শতশত মানুষ।

এর সংক্রমন থেকে বাঁচতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছে আক্রান্ত এলাকার মানুষ।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী জেলায় আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ৭৯ জন। তবে আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেছে কিনা তা তাদের জানা নেই।

এলাকাবাসী ও জন-প্রতিনিধিদের হিসেবে, ১৯৯০ দশক থেকে এ পর্যন্ত আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে জেলার দুই শতাধিক মানুষ মৃত্যু বরণ করেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ।

আলমপুর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর থেকে কিছু কিছু রিং টিউবওয়েল, কয়েকটি এনজিও থেকে নিরাপদ পানির প্লান্ট স্থাপন করা হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

আবার কোনো কোনোটি বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সংস্কারের অভাবে বন্ধ হয়ে আছে।

ফলে নিরাপদ পানি না পেয়ে ভয়াবহ মাত্রার আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে এ গ্রামের মানুষ। মেহেরপুর জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯০ দশকের আগে আর্সেনিক সম্পর্কে এ জেলার মানুষের কোনো ধারণা ছিল না। কিছু কিছু মানুষের ত্বক খসখসে হওয়া ও শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষত সৃষ্টি হওয়ায় চিকিৎসা করতে গিয়ে আর্সেনিকের অস্তিত্ব ধরা পড়ে।
এরপর গণমাধ্যমে এ খবর প্রচারিত হলে মানুষ আর্সেনিক সম্পর্কে ধারণা পায়।

আর্সেনিক আক্রান্ত এলাকার ৯০-৯৫ ভাগ টিউবওয়েলে ভয়াবহ মাত্রায় আর্সেনিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর থেকে এ টিউবওয়েলগুলো লাল রং করে দেয়া হয়েছে। মানবদেহের জন্য আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা ০.৫ (শূণ্য দশমিক পাঁচ) পিপিবি। কিন্তু এখানকার টিউবওয়েলগুলোতে ২০০-৩০০ পিপিবি পর্যন্ত আর্সেনিক পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে গত ১০ বছরে আলমপুরে মারা গেছে কমপক্ষে ২০ জন।এখনো এ রোগে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকে। আক্রান্তদের মধ্যে শতাধিক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পরও অবস্থার পরির্বতন না হওয়ায় বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

আলমপুরের স্কুল শিক্ষক রাকিবুজ্জামান জানান, স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর আর্সেনিকমুক্ত পানির ব্যবস্থা করতে পারেনি। স্বাস্থ্য বিভাগও তেমন কোনো পরামর্শ দেয় না। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা না থাকার ফলে চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

আলমপুর দক্ষিণপাড়ার গৃহবধূ রিনা খাতুন জানান, গ্রামবাসীরা আর্সেনিক আক্রান্ত হওয়ায় পাশের কোনো গ্রামের মানুষ তাদের সঙ্গে মেলামেশা-আত্মীয়তা করতে চায় না। এরইমধ্যে বেশ কয়েকটি বিয়েও ভেঙ্গে গেছে।

আবার বিয়ের পর কয়েকজন নববধু বিষয়টি টের পেয়ে বাপের বাড়ি গিয়ে আর ফিরে আসেনি।

গ্রামের মোমেনা বেগম সরকারের কাছে দাবি করে বলেন- আমরা এদেশের নাগরিক। তাই সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার আমাদেরও আছে। সরকার দ্রুত আমাদের জন্য সাপ্লাইয়ের পানির ব্যবস্থা করবে এটাই তাদের প্রত্যাশা।

অন্যথায় গ্রামের সব মানুষকে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল গফফার মোল্লা জানান, মেহেরপুরে আর্সেনিকের ভয়াবহতা কমে আসতে শুরু করেছে। আলমপুরে পল্লী পানি সরবরাহ প্রকল্প থেকে রিং টিউবওয়েল দিয়ে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক সময়ে বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতা ছিলো।

এখন নেই। তারপরও অতি সত্বর এ গ্রামে একটি আর্সেনিক রিমুভাল প্লান্ট স্থাপনের ব্যবস্থা করা হবে। আর্সেনিক আক্রান্ত রোগিদের বেশি বেশি শাক- সবজি ও ভিটামিন জাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি ।

মেহেরপুর সির্ভিল সার্জন ডা. সামিম আরা নাজমিন জানান, খবর পেয়ে আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত মানুষের তালিকা করে ওষুধ সরবারহ করি।

একটি বিদেশী সংস্থা আমাদের সহযোগিতা করে আসছিল। ওই সংস্থাটির আর্সেনিক প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়ার ফলে আমরা কাজ করতে পারছি না। তবে আমাদের কাছে যারা আসে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে থাকি।

স/এষ্

Print Friendly, PDF & Email