ভয়ঙ্কর বাঁশী ওয়ালার দল অতঃপর তাদের করুণ পরিনতি

সাঈদ ইবনে হানিফ : যা আজ গল্প হয়ে আছে গ্রামের বর্শিয়ানদের মুখে। তাদের মুখ থেকে শোনা সেই ব্রিটিশ আমল অতঃপর পাকিস্তানী বরাবরই শত্রু মিত্রু উভয়ের আশ্রয় প্রশ্রয় দাতার ভূমিকা পালন করেছে এই অঞ্চলটি। যা আজকের অবস্থাতেও বিদ্যমান। আমাদের গ্রামের পূর্ব দিকে অর্থাৎ পাশের গ্রামের নাম বাগডাঙ্গা।

পাশাপাশি এই দুই গ্রামের মানুষ একে অপরের পরিপূরক। দীর্ঘ বছরের সেই হৃদরতা কখন যেন বিশাদে রূপ নেয় এলাকার সমাজ পতিদের মনে সেই আশাঙ্খা সব সময় কাজ করতে থাকে। কারণ ইতিমধ্যে বাঁশী ওয়ালা সন্ত্রাসীদের অভয়ারন্যে পরিনাত হয়েছে এলাকাতে। এলাকার অধিকাংশ যুবক তাদের দলেও ভিড়ছে।

তাদের কাজ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাজি, ডাকতি সহ মাদক কারবারী করা। ১৯৯৮ সালের শেষের দিকে এলাকায় অধিপত্ত বিস্তার নিয়ে বাঁশী ওয়ালাদের দুই গ্রুপে চরম দ্বন্দ্ব লেগে যায়। তাদের সেই দ্বন্দ্বরে জেরে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন খুন যখম ও হয়েছে। প্রতিদিন তাদের দ্বারা কেউ না কেউ নাজেহাল হচ্চে।

পার পাচ্ছে না সমাজপতিরাও দিনে দিনে বাঁশী ওয়ালাদের প্রভাব বাড়ছে তো বাড়ছেই। চিন্তায় পড়ে গেলেন এলাকার সমাজপতিরা। কিভাবে এলাকার এই সন্ত্রাসী তৎপরতা নির্মূল করে বাঁশী ওয়ালাদের কবল থেকে ভবিষ্যৎ প্রজম্ম কে রক্ষা করা যায়। তারা গোপনে সলাপরামর্শ করতে লাগলো।

বিশেষ করে এলাকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মৌলভী এলাকার বিজ্ঞ জনদের নিয়ে অতি গোপনে বৈঠকে বসলেন। কিভাবে ঐ সন্ত্রাসীদের নির্র্মূল করা যায়। অবশেষে বাঁশী ওয়ালাদের পাপের ঘড়া পূর্ণ হলো আল্লাহ প্রদত্ত নিয়মেই। সেদিন ছিলো ১৯৯৮ সালের ১২ই ডিসেম্বর। খুব ভোর বেলায় গ্রামের অভ্যন্তরে ঘুনী ঘোষ নগর বাজার এলাকাতে গুলির শব্দ শোনা যায়।

ভাল করে বুঝে উঠার আগেই চারিদিক থেকে মানুষের হৈ হুল্লা ডাক চিৎকার শুরু হলো। গ্রামবাসী কে কথায় আছ আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা যার হাতে যা আছে তাই নিয়ে ছড়লো বাজারের দিকে। এসে দেখে আহ্ কি সর্বনাশ সুবোধ দাদার হোটেলের পিছনে গুলি খেয়ে পড়ে আছে জাকির ভাই। যদিও সে পরিস্থিতির শিকার হয়ে বেশ কিছু দিন যাবৎ সন্ত্রাসী মূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে ছিলো। কিন্তু গ্রামবাসীর কাছে তিনি ছিলেন বাঁশী ওয়ালাদের প্রতিপক্ষ।

গ্রামের সাধারণ মানুষ জাকির ভাইকে এক প্রকার ভালবাসতেন। কারণ বাঁশী ওয়ালাদের অত্যাচারে গ্রামবাসী অতিষ্ঠ ছিলো। জাকির ছিলো ঐ বাঁশী ওয়ালাদের প্রতিপক্ষ। সমস্ত গ্রামবাসী তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিল জাকিরকে হত্যা করে বাঁশী ওয়ালার দল এই অঞ্চলকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিনাত করতে চাই। কিন্তু তা হতে দেওয়া যাবে না। ওদের পিছে ধাওয়া কর বললো নুর মোহাম্মদ মৌলভী। শুরু হলো জনতা কর্তৃক সন্ত্রাসীদের ধাওয়া। বাঁশী ওয়ালাদের দল অস্ত্র সজ্জিত ছিল। পিছনে কয়েকশত জনতা দেখে তারা অনেকটা হতবম্ব দিশেহারা।

বাঁশী ওয়ালাদের দল থেকে মাত্র একশত গজ দুরে আমি ও জনতার দল যশোর সদরের মুনসেফপুর নামক স্থানে পৌছানোর পর বাঁশী ওয়ালাদের দল আমাদের দিক লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করতে লাগলো। কিন্তু আমরা ভয় পায়নি। আমাদের সামনের কেউ তাদের ছোড়া সেই বোমা ধরে আবার তাদের দিকেই ছুড়ে মারলো। ফলে বাঁশী ওয়ালাদের দল আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।

জনতার তাড়া খেয়ে সেদিন ঐ সন্ত্রাসীরা স্বদল বলে যশোর সদরের নরেন্দ্রপুর গ্রামের বিভিন্ন ঘর বাড়িতে আত্মগোপন করার চেষ্টা করলো। সেদিন বাঁশী ওয়ালাদের দলের প্রধান সহ বেশির ভাগ সন্ত্রাসী আশ্রয় নিল ঐ গ্রামের আতিয়ার রহমানের বাড়িতে। তারা ঐ বাড়ির মহিলা ও শিশুদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিজেদের রক্ষা চেষ্টা করল।

কিস্তু ততক্ষণে আমাদের বিক্ষুব্ধ জনতার তোড়ে তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলো। সেদিন শীত কালের ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে দীর্ঘ ১০ কিলোমিটার পথা ধাওয়া করে একে একে ১১জন সন্ত্রাসীকে পিটিয়ে হত্যা করে বিক্ষুদ্ধ জনসাধারণ।

যা ইতিহাসের নির্মম স্বাক্ষী হলো (ইলেভেন মাডার) হিসাবে। এই ঘটনার পর আইনী জটিলতা কাটিয়ে উঠতে বেশ বেগ পেতে হলো সমাজপতিদের। এর পর এলাকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় নুর মোহাম্মদ মৌলভী, মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক, হোসেন আলী মোল্যা, ইসমাইল হোসেন মোল্যা, কালীপদ দেবনাথ, অধ্যাপক মশিয়ার রহমান সহ মসজিদের ইমাম ও এলাকার বিশিষ্ঠ জনেরা বিভিন্ন সভা সেমিনারের মাধ্যমে এলাকার তরুন যুবকদের প্রতি সন্ত্রাসী, চুরি, ডাকাতি, জুয়া মাদক ব্যবসা ও সেবনের কুফল সম্পর্কে সচেতন ও বাঁশী ওয়ালাদের করুণ পরিনতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সন্ত্রাসের পথে পা না বাড়াতে আহবান জানান। যা আজও অব্যহত আছে।

এলাকার সমাজপতিদের এই সচেতন বার্তা বদলে দিল একটি সন্ত্রাস প্রবণ এলাকার মানুষের জীবন মান। বিগত কয়েক বছরেই এই এলাকার সাধারণ মানুষ বাঁশী ওয়ালাদের আতঙ্ক কাটিয়ে এখন নিরাপদে ঘুমায়। এলাকাবাসী এখন দাবী করছেন সন্ত্রাস মুক্ত এই এলাকার সাধারণ মানুষ বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সাংস্কৃতিতে অন্যান্য এলাকার থেকে যথেষ্ট সুযোগ ভোগ করছে। এই ধারা অব্যহত থাকুক যুগ যুগান্তরে আর যেন কোন বাঁশী ওয়ালাদের দল সৃষ্টি না হয়।

আর যেন কোন ইলেভেন মাডারের পরিনতি ভোগ করতে না হয়। আমাদের সন্তান ও আগামী দিনের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন কোন ভাবেই সন্ত্রাসের দিকে পা এবং জুয়া মাদক সেবন ও ব্যবসায়র দিকে হাত না বাড়ায় সেদিকে সর্তক দৃষ্টি রাখাই হবে আমাদের প্রত্যেক অভিভাবকের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

ভয়ঙ্কর বাঁশী ওয়ালাদের দল গল্পের লেখকের বক্তব্য :
প্রিয় পাঠক বাঁশী ওয়ালাদের দল গল্প সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা। তারপরও যদি কোন তথ্য উপাত্থ বাদ পড়ে বা ভুল ভাবে উত্তাপিত হয় তবে ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। লেখকের মতে প্রতিটি দল বা সংগঠণ তৈরী হয় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে কিন্তু ক্ষনে ক্ষনে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে কছিু দুস্কৃতি লোক সেই সব দলের নাম ব্যবহার করে নানা প্রকার অন্যায় অপকর্ম চালিয়ে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে। যার দ্বায় ভার প্রকৃত পক্ষে ঐ সব দল বা সংগঠণ কখনই গ্রহন করে না এবং করবে না। একই ভাবে বাঁশী ওয়ালাদের দল এই এলাকায় তাদের কর্ম তৎপরতা চালাতে গিয়ে বেশ কিছু দলের নাম উচ্চারণ ও প্রচার করেছে। র্দুভাগ্য জনক হলেও সে কথা গুলো গল্পের মধ্যে না আসলে লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই এই রকম দল বা সংগঠণ দেশের কোথাও যদি থাকে আসা করি তারা গায়ে নেবেন না, ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। আমি গর্বিত ১৯৯৮ সালের ১২ ডিসেম্বরের ভোর বেলার সেই সন্ত্রাস নির্মূল আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভাবে শরীক হতে পেরে।

স/এষ্

Print Friendly, PDF & Email