বোলিং তোপ আর ব্যাটিং তাণ্ডবে উড়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ

নাঈম আহম্মেদ : ত্রিদেশীয় সিরিজের পঞ্চম ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে ২৪৮ রানের টার্গেট ছুঁড়ে দেয় উইন্ডিজ। ক্যারিবীয়ানদের ৫ উইকেটে হারিয়েছে টাইগাররা। বল বাকি ছিল আরও ১৬টি।

এই ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠলো টাইগাররা। তাও আবার সর্বোচ্চ ১০ পয়েন্ট নিয়ে। ৯ পয়েন্ট নিয়ে আগেই ফাইনাল নিশ্চিত করেছে জেসন হোল্ডারের দলটি।

মুখোমুখি দেখার আগের ম্যাচে ২৬১ রান করেও টাইগারদের কাছে ৮ উইকেটে হেরেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আগামী ১৫ মে নিয়ম রক্ষার ম্যাচে টাইগারদের বিপক্ষে নামবে ২ পয়েন্ট অর্জন করা স্বাগতিক আয়ারল্যান্ড। ১৭ মে ফাইনালে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ-উইন্ডিজ।

২৪৮ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে নেমে ওপেনার তামিম ইকবাল আর সৌম্য সরকার দারুণ শুরু করেন। দলীয় ৫৪ রানের মাথায় অ্যাশলে নার্শের বল মিস করে বোল্ড হন তামিম। তার আগে এই বাঁহাতি ওপেনার ২৩ বলে চারটি চারের সাহায্যে করেন ২১ রান। ৫২ রানের জুটি গড়েন সাকিব-সৌম্য।

দলীয় ১০৬ রানের মাথায় বিদায় নেন সাকিব। অ্যাশলে নার্শের বল এগিয়ে এসে খেলেছিলেন, ব্যাটে-বলে ঠিকভাবে না লাগলে ক্যাচ ওঠে শর্ট কাভারে। রোস্টন চেজের হাতে ধরা পড়ার আগে সাকিব ৩৫ বল তিনটি বাউন্ডারিতে করেন ২৯ রান।

স্কোরবোর্ডে মাত্র ১ রান যোগ হতেই বিদায় নেন ওপেনার সৌম্য সরকার। এই ম্যাচেও সৌম্য খেলেছেন দুর্দান্ত গতিতে। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ফিফটির দেখা পেয়েছেন। সাকিবের বিদায়ের পর একই ওভারে নার্শের বল খেলতে গিয়ে লেগসাইডে ক্যাচ তুলে দেন সৌম্য।

বিদায়ের আগে এই বাঁহাতি ওপেনার ৬৭ বলে চারটি চার আর দুটি ছক্কায় করেন ৫৪ রান। বাংলাদেশ দলীয় ১০৭ রানের মাথায় তৃতীয় উইকেট হারায়। টপঅর্ডারের তিনটি উইকেটই নেন ১০ ওভারে ৫৩ রান খরচ করা অ্যাশলে নার্শ।

দলীয় ১৯০ রানের মাথায় বিদায় নেন দারুণ ব্যাট করা মোহাম্মদ মিঠুন। জেসন হোল্ডারের বলে বোল্ড হওয়ার আগে তিনি করেন ৪৩ রান। তার ৫৩ বলে সাজানো ইনিংসে দুটি করে চার ও ছয়ের মার ছিল। জয় থেকে মাত্র ৮ রান দূরে থাকতে কেমার রোচের বল তুলে মারতে গিয়ে আউট হন মুশফিকুর রহিম।

বিদায়ের আগে টাইগার এই রানমেশিন ৭৩ বলে ৫টি চার আর একটি ছক্কায় করেন ৬৩ রান। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সঙ্গে যোগ করেন ৫০ রান। রিয়াদ ৩৪ বলে এক চার, এক ছক্কায় ৩০ রান করে অপরাজিত থাকেন। সাব্বির রহমান ০ রানে অপরাজিত থাকেন।

এর আগে সোমবার (১৩ মে) ডাবলিনে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন উইন্ডিজ দলপতি জেসন হোল্ডার। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ক্যারিবীয়ানরা তোলে ২৪৭ রান। চারটি উইকেট নিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান, মাশরাফি পান তিনটি উইকেট। কিপটে বোলিংয়ে আরেকবার নাম লিখেছেন সাকিব।

টাইগারদের তৃতীয় আর সিরিজের পঞ্চম এই ম্যাচটি শুরু হয় বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে চারটায়। এই ম্যাচের মধ্যদিয়ে ওয়ানডেতে অভিষেক হয় পাঁচটি টেস্ট ও তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলা পেসার আবু জায়েদ রাহির। ইনজুরিতে ছিটকে পড়েছেন সাইফউদ্দিন। অনুশীলনের সময় চোট পেয়েছেন এই পেস বোলিং অলরাউন্ডার। বাংলাদেশ দলে পরিবর্তন এই একটি। ইনিংসের প্রথম ওভারেই টাইগার দলপতি মাশরাফি অভিষিক্ত রাহির হাতে বল তুলে দেন।

ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারে মাশরাফির বলে সৌম্যর হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ওপেনার সুনীল আমব্রিস। ৪ বাউন্ডারিতে ১৯ বলে ২৩ রান করে স্লিপে থাকা সৌম্যর হাতে ক্যাচ তুলে দেন এই ক্যারিবীয়। দশম ওভারে মাশরাফির বলে ড্যারেন ব্রাভোর (৫) ক্যাচ ফেলে দেন মেহেদী মিরাজ। ১১তম ওভারে দলীয় ৫৬ রানের মাথায় দ্বিতীয় উইকেটের পতন হয়। মিরাজের বলে এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে পড়ে আউট হন ড্যারেন ব্রাভো (৬)।

১১তম ওভারের পর ২০তম ওভারে আবার সাফল্য পায় বাংলাদেশ। এবার উইকেট শিকারে নাম লেখান কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান। ফিজের দারুণ ডেলিভারিতে মিড উইকেটে দাঁড়ানো মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাতে ধরা পড়েন রোস্টন চেজ। বিদায়ের আগে ২৯ বলে দুই বাউন্ডারিতে তিনি করেন ১৯ রান। দলীয় ৯৯ রানে উইন্ডিজরা চতুর্থ উইকেট হারায়। আবারো আঘাত হানেন ফিজ। ২১তম ওভারের প্রথম বলে জোনাথন কার্টারকে (৩) এলবির ফাঁদে ফেলেন কাটার মাস্টার।

টাইগারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ৮৫ বল পর বাউন্ডারির দেখা পায় উইন্ডিজ। ৩৮তম ওভারে ইনিংসের প্রথম ওভার বাউন্ডারির দেখা পায় ক্যারিবীয়ানরা। ইনিংসের ৪২তম ওভারে ক্রমেই টাইগারদের গলার কাঁটা হয়ে ওঠা ওপেনার শাই হোপকে বিদায় করেন মাশরাফি। ব্যক্তিগত ৮৭ রানের মাথায় উইকেটের পেছনে মুশফিকের হাতে ধরা পড়েন এই সিরিজে তৃতীয় সেঞ্চুরির দিকে ছুটে চলা হোপ।

বাংলাদেশের বিপক্ষে টানা চতুর্থ সেঞ্চুরি বঞ্চিত হওয়া এই ক্যারিবীয়ান ১০৮ বলে ৬টি চার আর একটি ছক্কায় তার ইনিংসটি সাজান। এরপর মাশরাফি বিদায় করেন উইন্ডিজ দলপতি জেসন হোল্ডারকে। ৭৬ বলে তিনটি চার আর একটি ছক্কায় ব্যক্তিগত ৬২ রান বিদায় নেন হোল্ডার।

এরপর ইনিংসের ৪৫তম ওভারে সাকিব ফিরিয়ে দেন ৭ রান করা ফ্যাবিয়ান অ্যালেনকে। ৪৯তম ওভারে মোস্তাফিজের বল তুলে মারতে গিয়ে সাব্বিরের হাতে ধরা পড়েন ১৪ রান করা অ্যাশলে নার্শ। একই ওভারে ফিজের ডেলিভারিতে এলবির ফাঁদে পড়েন ৭ রান করা রেইমন রেইফার।

টাইগার দলপতি মাশরাফি ১০ ওভারে ৬০ রান দিয়ে তুলে নেন তিনটি উইকেট। মেহেদি হাসান মিরাজ ১০ ওভারে ৪১ রানের বিনিময়ে পান একটি উইকেট। সাকিব ১০ ওভারে ২৭ রান খরচায় পান একটি উইকেট। সৌম্য সরকার ২ ওভারে ১৫ রান দিয়ে উইকেট পাননি। মোস্তাফিজ ৯ ওভারে ৪৩ রান খরচায় পান চারটি উইকেট। আবু জায়েদ রাহি নিজের অভিষেক ম্যাচে ৯ ওভারে ৫৬ রান খরচায় কোনো উইকেট পাননি।

এর আগে নিজেদের প্রথম ও তৃতীয় ম্যাচে স্বাগতিক আয়ারল্যান্ডকে উড়িয়ে দেয় উইন্ডিজরা। প্রথম ম্যাচে ক্যারিবীয়ানরা জিতেছে ১৯৬ রানের বিশাল ব্যবধানে। আর দ্বিতীয় ম্যাচে ৩২৮ রানের টার্গেটে জিতেছে ৫ উইকেটের ব্যবধানে।

এদিকে, বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে উইন্ডিজকে হারিয়েছে ৮ উইকেটে। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে উইন্ডিজ তোলে ২৬১ রান। জবাবে তামিম-সৌম্যের দারুণ উদ্বোধনী জুটি পায় বাংলাদেশ। এরপর সাকিব আর মুশফিকের ব্যাটে ভর করে ম্যাচ জিতে নেয় ৮ উইকেটে। তবে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়।

দুই ম্যাচ জিতে আগেই ফাইনালে পা দিয়ে রেখেছে উইন্ডিজ। এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে উইন্ডিজ দলে অভিষিক্ত হয়েছেন রেইমন রেইফার।

উইন্ডিজ একাদশ: শাই হোপ, সুনীল অ্যামব্রিস, ড্যারেন ব্রাভো, রোস্টন চেজ, জোনাথন কার্টার, জেসন হোল্ডার, ফ্যাবিয়ান অ্যালেন, অ্যাশলে নার্শ, শেলডন কটরেল, কেমার রোচ, রেইমন রেইফার।

বাংলাদেশ একাদশ: তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মোহাম্মদ মিঠুন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাব্বির রহমান, মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা, মেহেদি হাসান মিরাজ, আবু জায়েদ রাহি এবং মোস্তাফিজুর রহমান।

স/এস্

Print Friendly, PDF & Email