মুন্সীগঞ্জে ফার্মেসী ব্যবসায়ীরাই দিচ্ছে সর্ব রোগের চিকিৎসা!

এম.এম.রহমান,মুন্সীগঞ্জ: মুন্সীগঞ্জ জেলা শহর ও উপজেলা গুলোতে ফার্মেসী ব্যবসারাই দিচ্ছে সর্ব রোগের চিকিৎসাসেবা । ছোট ছোট ফার্মেসীগুলো চলছে শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই।

একজন মুদি দোকানি পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যে ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। সেই একই ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই মুন্সীগঞ্জ জেলায় প্রায় শতাধিক ফার্মেসীতে দেয়া হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। একজন ঔষধ ফার্মেসী ব্যবসায়ীর নিয়ম অনুযায়ী রোগীদের প্রেসক্রিপশনে ডাক্তারের লেখা ঔষধগুলো বিক্রি করা করতে পারবে।

যদি তার ড্রাগ লাইসেন্স থাকে । কিন্তু ফার্মেসীর ব্যবসায়ীরাই নামের আগে স্বঘোষিত ডা: লিখে ডাক্তারের ভূমিকা পালন করে। দোকানের সাইনবোর্ডে নামের আগে ডাক্তার, ভিজিটিং কার্ডে ডাক্তার লিখে সেই ভিজিটিং কার্ড রোগীদেরও দিয়ে থাকে এসব অপচিকিৎসকরা। এদিকে বিভিন্ন নামে গড়ে ওঠা এসব ফার্মেসীতে কথিত হাতুরে পল্লী চিকিৎসক, ঔষধের দোকানিরা রোগীর মুখে রোগের বর্ননা শুনে এন্টিবায়োটিকসহ সব ধরনের ঔষধ বিক্রি করে ।

রোগীরাও তাদের দেয়া ঔষধ টাকা দিয়ে কিনে নেয়। একজন রোগীকে সাধারণ সমস্যায়ও কয়েক ধরনের ঔষধ খাওয়ারও পরামর্শ দিচ্ছে তারা। শিশু, নারী, পুরুষ সকল বয়সী রোগীদের সর্ব রোগের চিকিৎসা দিচ্ছে ফার্মেসী ব্যবসায়ী বা দোকানিরা। জেলা জুড়ে এমন অপকর্ম চললেও সিভিল সার্জন অফিসের লোকজন নীরব ভূমিকা পালন করে। সংবাদ কর্মীদের তারা জানায় যদি ফার্মেসী ব্যবসায়ী কিংবা দোকানিরা নিজস্ব প্যাডে বা কাগজে প্রেশক্রিপশন করে তাহলেই ব্যবস্থা নেয়া যাবে।

অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসনের দায়সারা বক্তব্য হলো জেলার কোন কোন ফার্মেসীতে লাইসেন্স নেই সেগুলোর তালিকা দিতে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে কথিত ডাক্তারদের নেই কোন ড্রাগ লাইসেন্স, নেই কোন কেমিষ্ট সার্টিফিকেট, পল্লী চিকিৎসা সনদ,নেই কোন সরকারী অনুমোদন। শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে কথিত এই হাতুরে ডাক্তাররা রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

দীর্ঘদিন ধরে শহরের অলিগলিতে, গ্রামগঞ্জের হাটবাজারে গড়ে ওঠা ফার্মেসীগুলোতে চলছে চিকিৎসাসেবা। ঔষধ প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি না থাকায় দিন দিন ফার্মেসীগুলোতে অপচিকিৎসা বৃদ্ধি পাচ্ছে । এতে করে সরকারী প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে সহজ সরল মানুষগুলো এসব ভুয়া নামধারী ডাক্তার. ফার্মেসীর দোকানির কাছে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছে। অন্যদিকে গ্রাম্য এলাকায় বিভিন্ন ভূইফোঁড় কোম্পানির নিম্ন মানের ঔষধ ও নকল ঔষধ সর্বরাহ বেড়েছে বহুগুন।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাপুরের জেলেপাড়ায় ও মিরকাদিম বাজারে রিপন নামের এক মুদি দোকানি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ঢাকার চক বাজার থেকে নকল ঔষধ এনে বিভিন্ন দোকান এবং ফার্মেসীতে পাইকারী বিক্রি করছে দেদারছে।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে গিয়ে দেখা মিলে ফার্মেসীগুলোতে রোগীদের সাথে প্রতারনার চিত্র। মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরেই রয়েছে ১০টি ফার্মেসী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব ফার্মেসীগুলোতে নানা বয়সী রোগীদের ভিড় লেগেই থাকে। মুন্সীগঞ্জ পোস্ট অফিসের সামনে থেকে শুরু করে কৃষি ব্যাংক পর্যন্ত এই রাস্তাটির পশ্চিমপাশেই রয়েছে সর্ব রোগের চিকিৎসার একাধিক প্রতিষ্ঠান।

এছাড়াও মিরকাদিম পৌর এলাকার রামগোপালপুরে মতিলাল, অরুন, নিতাই, কমলাঘাটে বলাই, সদরের মুন্সীরহাট, চরডুমুরিয়া বাজার, চিতলিয়া বাজার, বাংলাবাজারসহ জেলা সদরের বিভিন্ন হাট বাজারেও রয়েছে ফার্মেসী ব্যবসার আড়ালে শত শত ভুয়া ডাক্তারদের চিকিৎসা দেওয়ার ফার্মেসী । তাদের নিকটে গেলে মিলে সর্ব রোগের চিকিৎসা।

শুধু তাই নয় এসব ফার্মেসী দোকানি কিংবা কথিত ডাক্তারদের নিয়মিত ভিজিট করেন বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির লোক। এসব ফার্মেসীতে ফেনি, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন নামের ভূইফোঁড় কোম্পানির নকল ঔষধ পাওয়া যায়। এমনও কোম্পানির আছে যার নামে কেউ আগে শোনেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ফার্মেসী দোকানি জানান, ওরাডেক্সন যেকোন ঔষধের সাথে রোগীদের দিলে দ্রুত রোগ ভালো হয় । এছাড়াও ওরাডেক্সনসহ এই গ্রুপের নানা ধরনের ঔষধ আছে।

বিভিন্ন কোম্পানির এন্টিবায়োটিক দেয়া হয়। পাশাপাশি ক্যালভো ডি ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট বাধ্যতামুলক রোগীকে দেয়া হয় । রোগীরা এন্টিবায়োটিক খেয়ে দ্রুত রোগ মুক্তি লাভ করে বলেই ফার্মেসীগুলোতে নিম্ন এবং মধ্যবিত্ব আয়ের মানুষগুলো টাকা, সময় এবং ঝামেলা এড়াতে সরাসরি ফার্মেসীর ঔষধ সেবন করে ।

ফার্মেসীতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আরিফ জানান, সরকারী হাসপাতাল, বেসরকারী ক্লিনিক ও প্রাইভেট কোন ডাক্তার দেখালে গেলে রক্ত পরিক্ষা, ইসিজি,আল্ট্র সহ অনেক মেডিকেল টেষ্ট করায়। সরকারী হাসপাতালে গেলে ডাক্তারদের কারনেই বেসরকারী ক্লিনিকে যেতে হয় পরিক্ষা নিরিক্ষা করাতে।

বেসরকারী ক্লিনিকে ডাক্তার দেখালে ভিজিট, হাজার টাকার টেষ্ট, পরে রিপোর্টগুলোও ডাক্তার হাত ছুয়েই বলে ঠিক আছে ঔষধ খান। হিসাব মিলিয়ে দেখলাম সময়. টাকা বাঁচাতে আমরা এসব ডাক্তারদের কাছে আসি ।

আরেক রোগী উর্মি বেগম জানান, জানি এরা ডাক্তার না তবুও বাধ্য হয়েইএখানে চিকিৎসা নিতে আসি। টাকা দেই ঔষধ পাই। তারা তো ডাক্তারা না ? তাদেরকে ডাক্তার বলেন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানুষ মুখে মুখে ফার্মেসী ব্যসায়ীকে ডাক্তার বলে প্রচার করে। তারা এন্টিবায়োটিকসহ বহু ধরনের ঔষধ খেতে দেয় এবং ঔষধ খেয়ে রোগ ভালো হয়। আমার শিশু বাচ্চাকেও সব সময় মতি লাল ও অরুনকে দেখাই তারা ঔষধের দোকানদার।

অনুসন্ধানকালে কথা হয় মিরকাদিমের রামগোপালপুর দুধপট্রি এলাকার মতিলালের সাথে, তিনি বলেন, রোগীর প্রয়োজনে আর রোগীরা চায় তাই এন্টিবায়োটিক দেই। সব ধরনের রোগীরা আসে । আমি ভিজিট নেই না ঔষধ বিক্রি করি। একজন রোগীর সুস্থ্য হতে যে যে ঔষধ প্রয়োজন হয় সেগুলোই বিক্রি করি। জানি চিকিৎসা দেয়া বৈধ নয়।এ বাজারে আরো অনেক দোকানেই রোগী দেখে এবং ঔষধ দেয়। সব দোকানেই সকলেই রোগী দেখে ।

রামগোপালপুরে গিয়ে দেখা যায়, অরুন নামের এক ফার্মেসী দোকানি শিশুসহ সকল বয়সী রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে । তার দোকানে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় । ভিড় এড়িয়ে গিয়ে কথা হয় কথিত ভূয়া নামধারী ডাক্তার অরুন এর সাথে । তিনি সংবাদ কর্মীদের উপস্থিতিতেই একাধিক নারী ও শিশু রোগীর স্বজনদের কাছে চিকিৎসাসেবার নামে এন্টিবায়েটিকসহ হাজার টাকার ঔষধ বিক্রি করেন। ক্যামেরা দেখেই তিনি অকপটে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন ।

তিনি আরো বলেন, যারা নিম্ন আয়ের মানুষ তারা টাকার অভাবে ডাক্তারের ভিজিট দিতে পারেনা তাদেরকে সহযোগিতা করি। আমার সামর্থের মধ্যে কমবেশী চিকিৎসা দেই। শিশু রোগীদের ঠান্ডার সমস্যার জন্য নিয়ে আসে তাদেরকে নরমাল ঔষধ দেই। সবাই প্রেশক্রিপশন নিয়ে আসে না । এলাকাভিত্তিক কোন রোগীর কি রোগ এটা আমাদের জানা থাকে ।

রোগীরা এসে ঔষধের নাম বললে প্রেশক্রিপশন ছাড়াই ঔষধ বিক্রি করি। চিকিৎসা দেয়া বৈধ নয় স্বীকার করে তিনি আরো বলেন,লোকাল এলাকা রোগীদের স্বার্থের কথা চিন্তা করেই রোগীদের চিকিৎসা ও ঔষধ বিক্রি করি।
এসব বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা ঔষধ তত্বাবধায়ক কর্মকর্তা মোঃ সামসুদ্দিন বলেন, ফার্মেসীর জন্য ঔষধ প্রশাসন থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসীর বিষয়ে আমাদের মনিটরিং অব্যাহত আছে।

সিভিল সার্জন ডা: সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে , আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটের সংকট রয়েছে। তবে জেলা প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে দ্রুত এব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে।

স/এষ্

Print Friendly, PDF & Email