এম.এম.রহমান,মুন্সীগঞ্জ:মুন্সীগঞ্জ জেলা শহর ও এর আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধ শত ভুয়া ডেন্টাল চিকিৎসালয়। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ শহর, সদর উপজেলার রিকাবিবাজার,রামগোপালপুর ও সিপাহীপাড়া, হাতিমারা, মুন্সীরহাট, টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বালিগাঁও, দিঘিরপাড় বাজার, আলদিবাজার, বেতকা চৌরাস্তা, টঙ্গিবাড়ী বাজার, লৌহজং বাজার, শ্রীনগরের সিমপাড়া, সিরাজদিখান উপজেলার বালুচরসহ জেলার বিভিন্ন বাজারে গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশত ছোট বড় ডেন্টাল চিকিৎসালয়। প্রতিষ্ঠানের সামনে বড় বড় সাইবোর্ড আর নামের আগে ডা: লাগিয়ে বিভিন্ন নামে ডেন্টাল ক্লিনিক ও ডেন্টাল কেয়ার নামক প্রতিষ্ঠান খুলে বসে রোগীদের সাথে প্রতারনা করে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও সিভিল সার্জন কোন কার্যকরি ব্যবস্থা না নেয়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এসব চিকিৎসালয়ে কর্মরত কথিত ডেন্টিসরা। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই নেই কোন সরকারী অনুমোদন। নিয়মিত ডাক্তার না থাকলে এসব প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা ডেন্টিষ্টরা রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। নামের আগে ডা: লাগিয়ে বড় বড় সাইনবোর্ড লাগিয়ে বেশীরভাগ প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা দিচ্ছে হাতুরে ডেন্টিষ্ঠরা। বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০ (বিএমডিসি) মোতাবেক নূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রী প্রাপ্তগন ব্যতীয় কেউ নামের আগে ডা: ব্যবহার করতে পারবেনা। তবে বিডিএস ডিগ্রী প্রাপ্তরা একজন রেজি:ষ্টারকৃত মেডিকেল ডেন্টিষ্টের সহকারী হিসাবে কাজ করতে পারবে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র ডিপ্লোমা ডিগ্রীধারীরা রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে ।

সরেজমিনে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামগোপালপুর গিয়ে দেখা মিলে পুরেই ৩টি ডেন্টাল কেয়ারের। সেখানে স্বাদ ডেন্টাল কেয়ার নামক চিকিৎসালয়ে গিয়ে দেখা যায়। ডা: মো: আফতাবুজ্জামান নামের একজন ডাক্তার ঢাকা থেকে এসে প্রতি মঙ্গলবার ও শুক্রবার রোগী দেখেন। সাপ্তাহের বাকীদিনগুলো রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেন ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যায়রত ডা: মো: আফতাবুজ্জামান এর সহকারী নাসরিন সুলতানা। ক্যামেরা দেখেই তিনি ডা: এর চেয়ার ছেড়ে পাশের চেয়ারটিতে বসেন। পরে দেখা যায় রোগীরা একাধিক চিকিৎসাপত্রে তিনি ঐষধ লিখেছেন । শুধু তাই নয় ডা: মো: আফতাবুজ্জামান এর নামের প্যাডে ঔষধ লিখে তাতে নাসরিন স্বাক্ষরও করেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাসরিন বলেন, আমি ডাক্তার সাহেবের অনুমতি নিয়ে তার প্যাডে ঔষধ লিখেছি এবং স্বাক্ষরও করেছি। আমার কোন বিডিএস সার্টিািফকেট নাই ।

এর ঠিক পাশের ডা: শেখ কামাল হোসেন নামক কথিত ডাক্তার কামাল ডেন্টাল কেয়ার এন্ড ইমপ্লান্ট নামক প্রতিষ্ঠান খুলে ৭ বছর ধরে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। তার কাছে চিকিৎসার বৈধতা সম্পর্কৃত কাগজপত্র চাইলে তিনি কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। তিনি বলেন, আমি এস এস সি পাশ করেছি । ডিপ্লোমা কোর্সও করিনি। আমি এমনিতেই ডা: লিখি রোগীরা নামের আগে ডাক্তার না লিখা দেখলে আসেনা।

কামাল ডেন্টাল এর ৩০ গজ দূরে রামগোপালপুর মসজিদ মার্কেটের ২য়তলায় গড়ে উঠেছে দি ডেন্টাল কেয়ার নামক আরেকটি চিকিৎসাকেন্দ্র। সেখানে ডা: টি মোহাম্মদ দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের সাথে প্রতারনা করে চলছে। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি রোগীদের পরে আসতে বলে তাড়িয়ে দেয়। আধা ঘন্টাপর প্রতিবেদক সাইফুল ইসলাম নামের এক যুবককে রোগী বানিয়ে ডা: টি মোহাম্মদের চেম্বারে পাঠায়। কিছুক্ষন পর প্রতিবেদক দ্বিতীয় তলায় তার চেম্বারে গিয়ে দেখেন রোগীকে লোকান ইনজেকশন পুষ করে বলেন আপনার মাড়িঁতে অনেক সমস্যা । তখনি ফুটে ওঠে ভুয়া চিকিৎসার চিত্র। টি মো: রোগীকে বলছে আপনার রোড ক্যানেল করাতে হবে এখনই । এরপর প্রতিবেদক ডাক্তারকে উদ্যেশ্য করে বলেন, রোগী সাইফুলের কি সমস্যা? । জবাবে তিনি বলেন, মাড়ির সমস্যা তাই ব্যাথার ইনজেকশন দিয়েছে আর ঔষধ লিখে দিয়েছে সেগুলো খেলে ভালো হযে যাবে। আমি জানি সাইফুল রোগী নয় । আর সামান্য ব্যাথার জন্য ঔষধ লিখবেন কিন্তু স্যুই দিলেন কেন? আপনার চিকিৎসার বৈধতা দেখান। তখন তিনি বিডিএস কোন সার্টিফিকেট বা বৈধ কিছু দেখাতে পারেনি। সেখানে কথিত ডা: টি মোহাম্মদ শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স ও সিভিলসার্জন অফিস হতে প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতিপত্র আর কিছুই নেই। তবে তার প্রতিষ্ঠানিক অনুমতিপত্রের মেয়াদ ২০১৫ সালেই শেষ হয়ে যায়। তিনি আর নবায়ন করেনি কারন নবায়ন করতে গেলে নিয়মিত একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সেখানে থাকতে হবে। বিডিএসসার্টিফিকেট ছাড়াঔষধ লিখলেন কেমন করে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি দীর্ঘ দিন ধরে চিকিৎসা দিয়ে আসছি আমার অভিজ্ঞতা থেকেই প্যাডে রোগীদের জন্য ঔষধ লিখি।

ভুয়া চিকিৎসার শিকার সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি অনেকদিন ধরে শুনতেছি এখানে ভুয়া চিকিৎসা হয়। আমি এসে বললাম আমার মাঁড়ি শিরশির করে ঔষধ লিখে দেন। ওনি আমাকে একটা সুঁই দিলো আর প্যাডে ঔষধ লিখে দিয়ে বললো আপনার রোড ক্যানেল করাতে হবে। আমরাতো দাঁতেই কোন সমস্যাই ছিলো না ওনি আমাকে কি বুঝে চিকিৎসা দিলো? আমার মাঁড়ি এখনও ফুলে রয়েছে । এই ডাক্তারের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় লিখিত অভিযোগও করেছি।
এরপর জেলা শহরের বাইরে প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে একই চিত্র লক্ষ করা গেছে। বেশীরভাগ প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহে ১ দিন একজন ডাক্তার আগে বলে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে । আর সাপ্তাহের বাকী দিন ডিপ্লোমা ডেন্টিসরাই রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেয় বলে স্বীকারও করেন। তারা যে ডাক্তার নয় সেটিও তারা স্বীকার করে বলেন লাইসেন্স করতে গেলে নানা সমস্যা তাই করিনি। নামের আগে ডাক্তার লিখার ব্যাপারেও তারা বলেন, নামের আগে ডাক্তার না লিখলে রোগীরা আসতে চায় না বলেই লিখি। জানি এটা বেআইনী তবুও রোগীদের খুশি রাখতে এসব করি।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ),মুন্সীগঞ্জ সভাপতি ডা: আখতার হোসেন বাপ্পী বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০ (বিএমডিসি) মোতাবেক নূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রী প্রাপ্তগন ব্যতীয় কেউ নামের আগে ডা: ব্যবহার করতে পারবেনা। এবং কোন ধরনের চিকিৎসা দিতে পারবেনা । তারা শুধু একজন বিডিএস ডাক্তারের সহকারী হিসাবে কাজ করতে পারবে। এই বিষয়গুলোর উপর জেলা সিভিল সার্জনের নজরদারি করা জরুরি।

মুন্সীগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন ডা: মো: হাবিবুর রহমান বলেন, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অচিরেই ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স/রহ

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন