মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি : মুন্সীগঞ্জ সদর সাব রেজিস্টার মাইকেল মহিউদ্দিন দলিল রেজিস্ট্রি ফি এর বাইরে সেরেস্তা খরচের নামে দলিলের প্রকারভেদে লাখে ৪০০শত থেকে ৫০০ শত টাকা করে প্রতিনিয়ত লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে । সরকারীভাবে সেরেস্তা খরচের নামে কোন টাকা নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও মুন্সীগঞ্জ সাব রেজিস্টার অফিসে এটা চিরাচরিত নিয়মে পরিনত হয়েছে । একজন দলিল লিখক সরকারী ফি পে- অর্ডারের মাধ্যমে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে দলিল দাখিল করে । তবুও দলিল লিখকদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করা হয় সেরেস্তা খরচের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা । সাব রেজিষ্টারকে যদি কোন দলিল লেখক সেরেস্তা খরচ দিতে রাজি না হয় তাহলে দলিলে সই করেন না সাব রেজিস্টার। আগে সেরেস্তা খরচ তারপর দলিলে স্বাক্ষর । দীর্ঘদিন ধরে এমন নিয়মেই চলছে মুন্সীগঞ্জ সদর সাব রেজিস্টার অফিসের কার্যক্রম । যেন দেখার কেউ নেই ।
সাব রেজিস্ট্রি অফিস সুত্রে জানা যায়, প্রতিদিন মুন্সীগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ৩০-৩৫ টি দলিল রেজিস্ট্রি করা হয় । আর প্রতিটা দলিল থেকে সেরেস্তা খরচ বা বিভিন্ন উপায়ে আদায় নগদ টাকা । এই টাকার কিছু অংশ কর্মচারীরা পেলেও বাকীটা চলে যায় অফিসের বড় সাহেবের পকেটে ।

দলিল লিখক মো: আবু হানিফ জানান, সরকারী সব নিয়ম অনুসরন করে দলিল জমা করি । সাব রেজিস্টার আমাকে বলে আগে সেরেস্তা খরচ জমা দেন । আমি বললাম এটা তো কোন নিয়ম নেই টাকা দেওয়ার । জবাবে সাব রেজিস্টার বলেন সেরেস্তার খরচ না দিলে আপনার কোন দলিলে আমি স্বাক্ষর করবো না । জবাবে হানিফ বলেন, সেরেস্তা খরচ না দিলে দলিলে স্বাক্ষর করবেন না এটা লিখিত দেন । এতেই উত্তেজিত হয়ে সাব রেজিস্টার আমার লাইসেন্স বাতিল করার হুমকি দেন । এর পর সাব রেজিস্টারের সঙ্গে গ্রাহকরা বাক বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে । গ্রাহকদের রোষানলে পড়ে সাব রেজিস্টার বলেন, দলিলে অন্য দলিল লিখকের নাম বসিয়ে নিয়ে আসুন স্বাক্ষর করে দিবো । কিন্তু দলিল লিখক হানিফের টা করবো না । এর পর দলিল লিখক তার নাম পাল্টিয়ে সেন্টু নামের এক দলিল লিখকের নাম লিখে আবারও জমা দেন রেজিস্ট্রির জন্য । তখনও সাব রেজিস্টার সেন্টুকে বলেন, সেরেস্তা খরচ ছাড়া রেজিস্ট্র হবেনা । এর পর গ্রহকরা বাধ্য হয়ে আবারও দলিলে সেন্টুর নাম বাদ দিয়ে বাবুল নামের আরেক দলিল লিখকের নাম লিখেন । তারপর নগদ ৪ হাজার টাকা সেরেস্তা খরচ সাব রেজিস্টারসহকারী মাজেদের হাতে পৌছে দেওয়ার পর দলিলটিতে স্বাক্ষর করেন সাব রেজিস্টার মাইকেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ ।

সরেজমিনে মুন্সীগঞ্জ সাব রেজিস্টার অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সাব রেজিস্টারের সহকারী মাজেদ দলিল লিককদের কাছ থেকে দলিলের প্রকারভেদে লাখে ৪০০শত টাকা করে হিসাব করে নিচ্ছে । কারো কারো থেকে লাখে ৫০০ টাকা জোর পূর্বক আদায় করছে । দলিল লিখকরা গ্রাহকদের কাছ থেকে সেরেস্তা খরচের নামে নিচ্ছে দ্বিগুন টাকা। শুধুমাত্র সেরেস্তা খরচের নাম করে । সেরেস্তা খরচ দেওয়ার কোন নিয়ম নেই । তবুও এটা অলিখিত নিয়মে পরিনত হয়েছে । এতে করে গ্রাহকরা খোয়াচ্ছেন নগদ অর্থ আর আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে ্অসাধু কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী ।
সদর সাব রেজিস্টার এর সহকারী মাজেদ বলেন, আমরা দলিল লিখকদের কাছ থেকে লাখে ৩শত টাকা করে নেই । জানি এটা নেওয়ার কোন বিধান নেই । আমরা গরীব আমাদের মাইরা লাভ কি? রাঘব বোয়ালদের ধরেন । যারা প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে । অফিসে আমার চেয়ে বড় বড় কর্মকর্তা/ কর্মচারী আছে তাদেরকে গিয়ে ধরেন । মাজেদের সঙ্গে কথা বলার সময় সাব রেজিস্টার এগিয়ে এসে বলেন, আপনাদেরকে হানিফ খবর দিয়ে এনেছে ?। আমি ওর লিখা দলিলে স্বাক্ষর করবো না । আবু হনিফ ঠিকমত সেরেস্তা খরচ দেন না । দলিল লিখকের নাম পাল্টে অন্য দলিল লিখকের নাম টাইপ করে আনুন করে দিবো । এই বলে কোন প্রশ্ন করার আগেই সাব রেজিস্টার নিজ রুমে চলে যায়।
এছাড়াও এই সাব রেজিস্টার যোগদান করার পর থেকে হেবা দলিল থেকে ১ হাজার টাকা, হেবা বেলোয়াজ দলিলে ২ হাজার, পর্চা খসড়া থাকলে ১ হাজার, পাওয়ার নামা দলিলে ৩ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন । প্রতিদিন সাব কবলা দলিল থেকে লাখে ৪০০-৫০০ শত টাকা আদায় করে বাধ্যতামূলক । দলিল লিখকরা বাধ্য হয়েই গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে সাব রেজিস্টারকে ঘুষ হিসাবে দিচ্ছে । এটা না দিলে দলিল লিখক নানা ধরনের টান বাহানা করেন দলিলে স্বাক্ষর করিতে । এনটাই জানিয়েছে একাধিক দলিল লিখক । এর আগে ঘুষ কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে সমস্ত দলিল লিখকরা এই সাব রেজিস্টারের অপসারন চেয়ে কলম বিরতি, মানববন্ধনসহ নানা প্রতিবাদ কর্মসুচী পালন করে । দলিল লিখক সমিতির কিছু অসাধু দলিল লিখকদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে সাব রেজিস্টার অকেনটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে । লাইসেন্স হারানোর ভয়ে সাব রেজিস্টারের বিরুদ্ধে দলিল লিখকরা কোন প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেনা ।

দলিল লিখক ও ভেন্ডার সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক এএফ এম আরিফুজ্জামান দিদান বলেন, ব্যাংকে পে অর্ডারের মাধ্যমে ১১% সরকারী ফি জমা দেই । সাব রেজিস্টার অফিসে সেরেস্তা খরচ বাবাদ লাখে ৪ শত টাকা দিতে হয় । এটা নেওয়ার কোন নিয়ম নেই । এটা একটা অলিখিত নিয়মে পরিনত হয়েছে । বিগত দিনে সাব রেজিস্টাররা একই নিয়মে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছে এটার কোন পরিবর্তন হয়নি। অতিরিক্ত টাকা না দিলে দলিল রেজিস্ট্রি করতে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় । দলিল রেজিস্ট্রি করতে যেন কোন সমস্যায় না পড়তে হয় ।এ কারনেই নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে । এটা সম্পূর্ন বে-আইনী ।

দলিল লিখক সমিতির বর্তমান সাধারন সম্পাদক মো: আওলাদ হোসেন জানান, অতিরিক্ত খরচ হিসাবে পিওনের মাধ্যমে শতকরা ৩শত টাকা দেই । এটা কোন সরকারী ফি না এমনিতেই এই টাকাটা অফিসে দিতে হয় । টাকা না দিলে আমাদের দলিল আটকে থাকে । অনেকটা বাধ্য হয়েই সেরেস্তা খরচ দিতে হয় ।

এ ব্যাপারে সদর সাব রেজিস্টার মাইকেল মহিউদ্দিন ফোনালাপকালে তিনি বলেন, আমি আবু হানিফের দলিল সই করবো কেন ?। ওর কাছে ৪-৫ টা দলিলের সেরেস্তা খরচ বকেয়া রয়েছে । আগে পরিশোধ করুক তারপর দেখা যাবে । আমি আবু হানিফকে শো কজ করেছি । সেরেস্তা খরচ নেওয়ার তো কোন নিয়ম নেই সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা আমার অফিসে এখানে কোনটা নিয়ম আর কোনটা অনিয়ম এটা আমি বুঝবো । এটা সাংবাদিকদের দেখার কোন বিষয় না ।

জেলা সাব রেজিষ্টার আবুল কালাম মো: মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, সেরেস্তা খরচ নেওয়ার কোন নিয়ম নেই । সরকারী খরচের বাইরে অতিরিক্ত কোন টাকা পয়সা লেনদেন সম্পূর্ন বে-আইনী । সেরেস্তা খরচ বা অন্য কোন উপায়ে কেউ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে ।
স/রহ

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন