।। এলিস হক ।।
ফুটবল ইংল্যান্ডে জন্ম নিলেও দু’টি জায়গায় ফুটবল লালিত পালিত হয়, একটি জন্মভূমি ইংল্যান্ডে এবং অপরটি অস্ট্রিয়ায়। সম্পূর্ণ ভিন্ন দু’টি ইতিহাস। ভিন্ন চক্র, ভিন্ন ধর্ম। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বই আজকের ‘আধুনিক’ ফুটবল খেলার ইতিহাসের সৃষ্টি।

যখন রোম সাম্রাজ্যতে খৃস্টীয় ৪র্থ শতকে জার্মেনিক জাতিগোষ্ঠীর উত্থান হয়, তখন এই জার্মানরাও ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত কোনো ঐক্যবদ্ধ স্বরাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারেনি। আজ যেখানে আমরা আজ জার্মানকে দেখতে পাচ্ছি। যেমন অস্ট্রিয়ান বলে কোনো ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র নেই, এমনকি জাতিও নেই। পাশাপাশি সুইস বলেও নেই।
অস্ট্রিয়ানরা আসলে জার্মানির বংশোদ্ভূত। খৃস্টীয় ৫ম শতকে রোম সা¤্রাজ্য পূর্ব-পশ্চিমে দ্বি-খন্ডিত হয়ে যায়। কয়েক শতাব্দীর পর ফ্রাঙ্ক স¤্রাট শার্লামেন্টের অধীনে পশ্চিম সা¤্রাজ্যের নাম হয়-‘পবিত্র রোমান সা¤্রাজ্য’। পরে পবিত্র রোম সা¤্রাজ্য কার্যতঃ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ঐ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নাম রাখা হয় ‘অস্ট্রিয়া’।

ব্যাভিয়ার ও চেক অঞ্চলে এই রাজ্যটির উপর অধিবাসীর মূল স্তম্ভ হলো জার্মান ভাষী ও রাজধানী ভিয়েনা। এরা অনেকদিন ধরে কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে সমাজতান্ত্রিক দেশ তথা ইউরোপের ইতিহাসের পাতায় পাতায় পূর্ণ মাতব্বরী করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে সার্বিয়াতে স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের হাতে সফররত অস্ট্রিয়ান স¤্রাট নিহত হন। সেই আগ্রাসী যুদ্ধে জার্মানদের সঙ্গে অস্ট্রিয়া গাঁটছড়া বেঁধে যায়। ঐ যুদ্ধে জার্মান হেরে গেলো। এর ফলে নতুন আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে অস্ট্রিয়ার জন্ম হলো।

ফুটবল উন্নয়নে অস্ট্রিয়ার অবদানও কম নয়..
আগেই বলা হয়েছে-অস্ট্রিয়ান বলে কোনো ভাষাভিত্তিক জাতি নেই। সুইস বলেও নেই। অস্ট্রিয়ান আসলে জার্মান। খৃস্টীয় পঞ্চম শতকে রোম সাম্রাজ্যে পূর্ব-পশ্চিমে দ্বিখন্ডিত হয়। কয়েক শতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পর এক অভিজাত জার্মান পরিবার হ্যাপসবার্গরা সিংহাসন দখল করে নানা তালগোল পাকিয়ে বসে। পবিত্র রোম সাম্রাজ্য পরে কার্যত বিলুপ্ত হলে ‘অস্ট্রিয়া’ ঐ পরিবারে নামযুক্ত হয়।

আগেই লেখা হয়েছে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সার্বিয়াতে সফররত অস্ট্রিয়ান সম্রাট আততায়ীর হাতে নিহত হন। যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার পর জার্মানরা হারলো। ফলে অস্ট্রিয়ার মত নতুন আধুনিক রাষ্ট্রে জন্ম নিলো।

অবিসম্পাদিতভাবে ভিয়েনা পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসেবে বহুদিন ধরে রাজধানীর ভূমিকায় দায়িত্ব ও লালন পালন করে গেছে। স্লাভ, বুলগার, হাঙ্গেরিয়ান, রুমানিয়ান অজস্র স্থায়ী আস্তানা এই শহরেই ছিল। এমনকি রাজ পরিবারের অত্যন্ত প্রিয় শহর ছিল এই ভিয়েনাকে ঘিরে। জার্মানরা এমনিতে কর্মঠ, উদ্যমী ও ভোগবিলাসী হিসেবে ইতিহাসখ্যাত নয়। কিন্তু অস্ট্রিয়ারা খুব কর্মঠপ্রিয় জাতি। কঠিন জার্মান বিপরীত চরিত্রকে অতিক্রম করে ভিয়েনীজরা একটি আদ্যপান্ত শহর সীমানায় ক্রীড়াকর্মের পরিচালকরূপে ৪টি বিষয়ে দারুণ পারদর্শী হয়ে উঠে।

এক. অপেরা,
দুই. অশ্বারোহন শিল্প,
তিন. জার্মান যুক্তিবাদীবিরোধী দর্শন চর্চা এবং
চার. ফুটবল খেলা।

আজকের সেই ভিয়েনার গৌরব আগের অবস্থায় নেই। তবুও সামগ্রিকভাবে ফুটবলের চিরন্তন সত্য প্রতিষ্ঠার পথ হতে তারা যথেষ্ট ভূমিকা রেখে গেছে এবং সেই সুবাদে ইতিহাসের পাতায় ভিয়েনা শহরকে বাদ দেয়া যায় না।
অস্ট্রিয়ায় কিছু ভবঘুরের কিছু দুরন্ত স্বভাবের ইংরেজ ফুটবল খেলাকে নিয়ে যায়। অস্ট্রিয়ায় স¤্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে সেদেশের ফুটবল খেলা অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ভিয়েনীজে অন্যধারায় মাটি ও আবহাওয়ায় একটি সম্পূর্ণ অনিংরেজ রূপ ধারণ করে। অভিজাত শ্রেণীর পরিচর্যার অব্যাহত থাকার সুবাদে সেই খেলা অস্ট্রিয়াতে ফুলের মতো পুষ্পিত হয়ে ফুটে উঠে। অস্ট্রিয়ার রসিকজনের শৈল্পিক খেলা তৃষ্ণা মিটিয়ে দিয়েছিলো।
এক কথায় একদিকে ‘এ্যারিস্টোক্রেটিক’স এ্যানজয়মেন্ট’ অন্যদিকে ইংল্যান্ডে ফুটবল খেলার নয়া বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে জোরে শোরে বেড়ে উঠে। তারা ফুটবলকে মেহনতি ফুটবলামোদীর আবেগ আর কল্পনার আশ্রয়ের সাহায্যে ডানা মেলে মুক্তি দিয়েছিলো-বলা যায়, ‘লুম্পেন এন্টারটেইনমেন্ট’।
তাদের ফুটবল খেলার সুন্দর অনিন্দ্য প্রকৃতির আর নরম ছোঁয়ার দৃষ্টিভঙ্গি সামন্ততান্ত্রিক বলয়ে বেষ্টিত ছিলো। ধনতান্ত্রিক ইংল্যান্ডে প্রতি শনিবার বিকেলে তাদের প্রিয় শ্রমিকরা এক ফালি স্বাধীনতার বহ্নি উৎসবের মতো আর খেলার মেজাজে ফুটবলটা খেলতো।

স/এষ্

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন