রাহুল রাজ

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) শুরুটা কেবল বিনোদন আর অর্থের ঝনঝনানির উদ্দেশ্যে শুরু হয়নি। স্থানীয় ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার একটা কৌশলও ছিল। তার ফলটাও বেশ আরাম করে ভোগ করছে ভারত। প্রতি আসরের পর একজন হলেও আসছে জাতীয় দলের ছায়ায়। কিন্তু জনপ্রিয়তা আর প্রশংসার সবটুকু পেলেও, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ক্রিকেটার তৈরির জায়গায় অনেকটাই ব্যর্থ। উল্টো, এই টুর্নামেন্টের অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় বিগ হিটার ব্যাটসম্যানরা।

হালের হার্দিক পান্ডে থেকে শুরু করে ভারত জাতীয় দলের ‘বিশেষ সময়ে’ অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়া রোহিত শর্মা—সবাই এসেছেন আইপিএল থেকে। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া বিপিএল থেকে উঠে আসা ক্রিকেটারদের মধ্যে তাসকিন আহমেদই কেবল জাতীয় দলে প্রভাব রাখতে পেরেছেন। নিজেকে তৈরি করেছেন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে। পরবর্তী সময়ে আবু হায়দার রনি, আরিফুল হক কিংবা আবু জায়েদ রাহীর নাম সমর্থকদের মুখে মুখে ছিল। তাদের গায়েও জড়িয়েছে জাতীয় দলের জার্সি। কিন্তু এই চারটি নামের মধ্যে কেবল আরিফুল হকই ব্যাটসম্যান। বাকিরা পেসার। আরিফুল চলতি বছরেই জাতীয় দলে অভিষেক করেছেন। জায়গা পোক্ত করতে হলে আরও সামনে এগোতে হবে তাকে।

মোদ্দা কথা, সেভাবে ব্যাটসম্যান উঠে আসছে না বিপিএল থেকে। এর পেছনে বিপিএল কমিটি কতটা সজাগ আছেন তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে বছরের পর বছর ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্ম করেও বিপিএলে দল পাচ্ছেন না অনেক মারকুটে ব্যাটসম্যান। মিজানুর রহমান, মাইশুকুর রহমান আর নতুন আজমির আহমেদের নাম কেবল তারাই শুনেছেন, যারা দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের খোঁজখবর রাখেন। আজমির গেল বছরে প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে অগ্রণী ব্যাংকের হয়ে ডাবল সেঞ্চুরি করেন। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে তিনিই একমাত্র ক্রিকেটার, যার ডাবল সেঞ্চুরি আছে। ২০১৭ সালে ঢাকা লিগে অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১১ ম্যাচ খেলেছেন আজমির। স্ট্রাইক রেট ৮৪.৫০। মোট রান ৩০০। হাফ সেঞ্চুরি তিনটি।

২০০৮ সাল থেকে পেশাদার ক্রিকেটে নাম লিখিয়েছেন মিজানুর রহমান। শুরু থেকেই নামের পাশে লেখা হয়েছে ‘মারকুটে’ ব্যাটসম্যান হিসেবে। বিপিএল যখন শুরু হয়, সেই ২০১২ সালে সুযোগ পেয়েছিলেন তৎকালীন দুরন্ত রাজশাহীতে (বর্তমান রাজশাহী কিংস)। অভিষেক ম্যাচে ৫২ বলে ৬৫ রানের ঝড়ো ইনিংসও খেলেছিলেন। পরের ম্যাচে ৫ রান পেলে আর একাদশেই জায়গা পাননি বর্তমানে ২৬ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান। ২০১৩ সালে জায়গা পেলেন খুলনা রয়্যাল বেঙ্গলসে (বর্তমান খুলনা টাইটান্স)। খেললেন ১২ ম্যাচ। মোট ১৭৩ রান পেয়েছিলেন। পরিসংখ্যান বলছে, ১৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মিজানুরের গড় রান ২০.২৫, যা কিনা জাতীয় দলের ওপেনার সৌম্য সরকারের চেয়েও অনেক বেশি। (সৌম্য সরকার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে ১৯.২৪ গড়, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ১৬.৯৩)। স্ট্রাইক রেট ১১৭.৩৯।

জাতীয় দলের হিসেবে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত-নাসির হোসেনরাও মিজানুরের চেয়ে গড় রানে পিছিয়ে। কিন্তু পরপর দুবার বিপিএলে নিজের নাম দেখার পর, ২০১৬ সাল থেকে যখন আবারও পর্দা উঠল টুর্নামেন্টের, তখন থেকে মিজানুরের নাম কেবল অকশন বোর্ড পর্যন্তই গেছে।

আলাপকালে মিজানুর বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই মেরে খেলতে পছন্দ করি। কোচদের বাধা থাকে না। বরং তারা আমাদের নিজেদের খেলাটা খেলতে বলেন। আমি যদি মেরে না খেলি তাহলে আমি রান করতে পারি না। বাউন্ডারি যদি না মারি, তাহলে তো আমি ওই রানটা কাভার করতে পারব না। তাহলে স্ট্রাইক রেটটাও হবে না, রানও হবে না। স্কোরিং শট বন্ধ করলেই রান হবে না।’

তারপরও বিপিএলে দল না পাওয়ার কারণ কী? উত্তরে হতাশ মিজানুর বলেন, ‘শেষ খেলেছি খুলনা রয়্যাল বেঙ্গলসে। প্রথম খেলি দুরন্ত রাজশাহীর হয়ে। আবার যখন শুরু হলো, তখন এক বছর ইনজুরিতে ছিলাম। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত দল পাইনি। কিন্তু অকশন বোর্ডে নাম যেত।’

প্রতি বছর ঘরোয়াতে ভালো করার কারণে আশায় থাকেন মিজানুর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবতাটা গুবলেট করে দেয় সব। বাংলাদেশই একমাত্র জায়গা, যেখানকার ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে মূল একাদশে পাঁচজন বিদেশি ক্রিকেটার জায়গা পান! জাতীয় দলের বাইরের হার্ড হিটারদের দল না পাওয়ার কারণ হিসেবে এই ইস্যুটাকেই সামনে আনছেন তিনি। এ সম্পর্কে মিজানুর বলেন, ‘এ বছর আমার আশা ছিল বিপিএলে দল পাব। কারণ প্রিমিয়ার লিগে ভালো করেছিলাম। আশা ছিল কিন্তু দল পাইনি। বিদেশি প্লেয়ার পাঁচজন । সে জন্য হয়তো পাইনি।’

একই ভাবনা ঘরোয়া ক্রিকেটের আরেক পরীক্ষিত ক্রিকেটার মাইশুকুর রহমানের। ২০১০ সাল থেকে পেশাদার ক্রিকেট খেলতে থাকা এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান এখন পর্যন্ত ৫৩টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেছেন। ৩০.১২ গড়ে মোট রান ১৪৪৬। স্ট্রাইক রেট ৬৫.৬৯। মাত্র শেষ হওয়া ঢাকা লিগে ১৩ ম্যাচে ৪৫২ রান করেছেন তিনি। চার মেরেছেন ৩২টি, ছক্কা ১০টি। মিজানুর তার চেয়েও এগিয়ে। সমানসংখ্যক ম্যাচ খেলে তার রান ৫২৯। ৮৯.৩৫ স্ট্রাইক রেটে ৬২ চার ও ১৮ ছক্কা হাঁকিয়েছেন তিনি।

মাইশুকুর বিপিএলের প্রথম আসরে খুলনার ফ্র্যাঞ্চাইজিতে জায়গা পেয়েছিলেন। কিন্তু একাদশে জায়গা পাননি বলে খেলা হয়নি। বাংলাদেশে ক্রিকেট খেলে বিপিএলে সুযোগ না পাওয়ার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আক্ষেপ ঝরলো তার কণ্ঠেও।

মাইশুকুর বলেন, ‘বিপিএলে একবারও দল পাইনি। ২০১২ বিপিএলে খুলনা রয়্যাল বেঙ্গলসে ছিলাম। এরপর থেকে অকশনে নাম যাচ্ছে। কিন্তু কোনো দল পাইনি। আমার নিজের কাছেই খুব খারাপ লাগে যখন ভাবি এতদিন ধরে ক্রিকেট খেলছি কিন্তু এখন পর্যন্ত আমি বিপিএলে খেলতে পারিনি।’

আইপিএলের দেখাদেখি বিপিএল শুরু হয়েছে উল্লেখ করে মাইশুকুর জানান, বিপিএল বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের আইপিএলের সমান সুবিধা বা গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা বিপিএল শুরু করেছি আইপিএলের আদলে। আমরা যদি ওদের ক্রাইটেরিয়া ফলো করি, বলছি না ফলো করছে না। বলছি যে, তাদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এগোলে মনে হয় আরও ভালো হবে। আমরা যদি প্রথম বিপিএল, দ্বিতীয় বিপিএল কিংবা তৃতীয় বিপিএলের দিকে তাকাই, ওদের মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা আছে। আমাদেরকেও সেই ধারাবাহিকতার মধ্যে আসতে হবে।’

আইপিএলে স্থানীয় ক্রিকেটারদের বেশি সুযোগ দেওয়া হয় উল্লেখ করে মাইশুকুর বলেন, ‘আইপিএলে কিন্তু বিদেশি ক্রিকেটারের সঙ্গে দেশি ক্রিকেটারদের একটা ব্যালান্স করা হয়। ওরা একটা দেশি ক্রিকেটার নেয় আরেকটা বিদেশি ক্রিকেটার নেয়। অর্থাৎ, জাতীয় দলের বাইরের ক্রিকেটারদেরকেও তারা সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে। ম্যাচেও তাই। তারা একসঙ্গে দুজন বিদেশি বা দেশি ব্যাটসম্যান নামায় না।’

বিপিএল থেকে বাংলাদেশ জাতীয় দলে সেভাবে ক্রিকেটার উঠে না আসার কারণ হিসেবে স্থানীয় ক্রিকেটারদের টুর্নামেন্টটিতে সেভাবে সুযোগ না দেওয়াকেই দায়ী করেন মাইশুকুর। তার মতে, আইপিএলে স্থানীয় ক্রিকেটারদের সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতি বছর নতুন কিছু ক্রিকেটার জাতীয় দলে উঠে আসছে।

মাইশুকুর বলেন, ‘লোকাল ক্রিকেটারদের সুযোগ করে দিচ্ছে ভারত। যে কারণে প্রতি আসরেই আইপিএল থেকে জাতীয় দলে কিছু ক্রিকেটার উঠে আসছে। কিন্তু আমাদের সেই জায়গাটা নেই। আমাদের পারফরম্যান্স প্রমাণ করার জায়গা নেই, নিজেদেরকেই বিচার করার নিজেদের সুযোগ নেই।’

শুধু স্থানীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে বিভিন্ন দেশে টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের চল আছে। বাংলাদেশেও বছর দুয়েক হয়েছিল। ক্রিকেটারদের ভাবনা, প্রতি বছর বাংলাদেশেও এমন একটি টুর্নামেন্ট নিয়মিত হলে আরও ভালো ব্যাটসম্যান উঠে আসত পাইপলাইনে। বিগ হিটারের অভাব অনেকাংশেই দূর হতে পারত।

মাইশুকুরের ভাষায়, ‘আমি মনে করি আমাদের টি-টোয়েন্টিতে দেশীয় ফরম্যাটে টুর্নামেন্ট থাকাটা জরুরি বাইরের মতো। হতে পারে সেটা প্রিমিয়ার লিগের মতো। তাহলে আমাদের ক্রিকেটের জন্যই অনেক ভালো হতো।’

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্রিকেটাররা যেখানে দায় দিচ্ছে পাঁচজন বিদেশি ক্রিকেটার খেলানোর, সেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর অভিযোগ উল্টো। সর্বশেষ আসর থেকেই পাঁচজন বিদেশি ক্রিকেটার নেওয়া শুরু করে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। নিয়মটা পোক্ত করতে কর্তৃপক্ষকে একরকম বাধ্যই করে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় ক্রিকেটার নেই টি-টোয়েন্টির জন্য। তাই দায়ে পড়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া!

কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনও পাঁচজন বিদেশি খেলানোর সমালোচনা করেছেন। তবে দেশে বিগ হিটারের কমতির পেছনে অন্য কারণও দেখিয়েছেন তিনি। ২০১৫ আসরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সকে শিরোপা এনে দেওয়া এই কোচ বলেছেন, ‘বিগ হিটার নেই বলতে এর পেছনে মূল কারণ আমাদের উইকেট। আমরা লো অ্যান্ড স্লো উইকেট দিচ্ছি, যে কারণে মারকুটে ব্যাটসম্যান সেভাবে উঠে আসছে না। আমরা চেষ্টা করছি। অভাবটাও বুঝছি। বিপিএলে তাদেরকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলতে আমাদের দেশে ৬-৭ নম্বরে তেমন কোনো ব্যাটসম্যান নেই, যারা কিনা মেরে খেলতে পারে। এই জায়গাটায় আমরা অনেক ভুগছি।’

বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আরও বলেন, ‘বিপিএলে তো পাঁচজন বিদেশি ক্রিকেটার খেলানো হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। সেখানে ইচ্ছা থাকলেও এসব স্থানীয় ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়া যায় না। তা ছাড়া দলও কম।’

অর্থাৎ, স্থানীয় ক্রিকেটারদের বিগ হিটার হওয়ার প্রথম ও প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো সুযোগের অভাব। ক্রিকেটার থেকে কোচ পর্যন্ত অনেকটা একই সুর গাইছেন। বিপিএলের দায়টা বোধহয় খুব সহজেই চলে আসে। কারণ, এটিই দেশের একমাত্র টি-টোয়েন্টি লিগ। যেখানে অন্যান্য দেশের টুর্নামেন্টে দেশীয় ক্রিকেটারদের সুযোগ দিতে এগিয়ে আসছে দলগুলো, সেখানে উল্টোটা হচ্ছে বাংলাদেশে। শুধু তা-ই নয়, দেশীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে নেই কোনো টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। হয়তো সেখান থেকেও ভালো কিছু বিগ হিটার পেতে পারে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা।

শোনা যাচ্ছে, এ বছর বিপিএলের আগে চারটি জোনে কেবল দেশীয় ক্রিকেটারদের নিয়েই একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের আয়োজন করবে বিপিএল কমিটি, তথা বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। তবে সেই উদ্যোগের অগ্রগতি কতটা, তা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি। ক্রিকেটাররাও খবরটি শুনেছেন উড়োভাবে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলো চার-ছক্কার বিনোদন। অর্থ, আলোচনা, খ্যাতি—সবই আছে এখানে। তার মধ্যেও ‘উর্বর’ কিছু করার চেষ্টা চান ক্রিকেটাররা। এমনিতেই জাতীয় দলের ক্রিকেটারের পাশাপাশি বিদেশি ক্রিকেটাররাই এসব লিগের মূল আকর্ষণ। কিন্তু সেটাকে পুঁজি করে যখন ঘরোয়া লিগের ক্রিকেটারদের সুযোগ কম হয়ে যায়, তখন ভবিষ্যৎ জাতীয় দলের কাণ্ডারি খুঁজতে বেগ পেতেই হয় নির্বাচকদের।

স/ রা

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন