রাহুল রাজ

পাশের দেশ ভারতে চলছে হালের সবচেয়ে আলোচিত ক্রিকেট লীগ আইপিএল। সেই আইপিএলে আছে বাংলাদেশের দুই তারকা ক্রিকেটার। সাকিব আল হাসান এবং মোস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশের পাড়ার চায়ের দোকান থেকে পড়ার টেবিল সর্বত্রই এই আইপিএলের হাওয়া লেগেছে। সেই হাওয়াতে গ্রীষ্মের গরমের সাথে যুক্ত হয়েছে জুয়া বা বাজির আগুন। ক্লাবে, পাড়ায়, মহল্লায়, অফিস, বাসায়, চায়ের দোকানে এই ক্রিকেট জুয়া এখন চলছে বেপরোয়াভাবে। জুয়াড়িরা উড়াচ্ছে লাখ লাখ টাকা। রিকশা চালক, ছাত্র, ব্যবসায়ী, দোকানি, বেকার অনেকেই এই ক্রিকেট জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন। ক্রিকেট জুয়ার ফাঁদে পড়ে আবার কেউবা আবার দিচ্ছে কপালে হাত। অনেকে একে জুয়া না বলে বলছেন বাজি ধরা।
বাংলাদেশ বা বিশ্বে যেকোনো ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হলেই এই জুয়া শুরু হয়। দিন দিন এই জুয়ায় প্রবণতা বেড়েই চলেছে। আর এই জুয়া দলগত এবং ব্যক্তি পর্যায়েও হয়। টিভির সামনে দলে দলে ভাগ হয়ে জুয়াড়িরা ক্রিকেট জুয়া খেলে। জানা যায় ম্যাচভেদে ন্যূনতম ৩ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি ধরা হয়। সারাদেশের প্রধানত ব্যবসায়ীরা এর প্রতি বেশি আসক্তি। ব্যবসায়ীরা গ্রুপে ভাগ হয়ে বাজি ধরেন। একেকটি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা থাকে ছয় থেকে সাত জন। ক্রিকেট টুর্নামেন্টের প্রতিটি খেলায় বাজি ধরা তথা জুয়া যেন এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সারাদেশে ক্রিকেট জুয়ায় মেতে উঠেছে জুয়াড়িরা।
আইপিএলের কারণে বিভিন্ন সাইটে অর্ন্তজাতিক বাজিকরদের পাশাপাশি এখন দেশীয় বাজিকররাও অংশ নিতে শুরু করেছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ক্রিকেট এখন শুধুই আর নির্মল খেলা অথবা বিনোদনের উপলক্ষ থাকল না, এটি হয়ে পড়ল অনৈতিক অর্থশাস্ত্র।
জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে জুয়াড়িরা সমাজে নানা ধরনের অপকর্মও ঘটাছে। আবদুল্লাহপুরের মুদি দোকানি কায়েস। দিন শেষে তার রোজগার পাঁচশ’ বা তার কিছু বেশি। কিন্তু যেদিন কোনো দলের ক্রিকেট খেলা থাকে সেই দিন তার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ক্রেতাকে পণ্য দেওয়ার ফাঁকেই দোকানের সেলফে থাকা টিভিতে চোখ বুলিয়ে নেন। তার দোকানের সামনে রাখা লম্বা টুলে দুপুর গড়াতেই এসে ভিড় করেন স্থানীয় কিছু লোক। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সবাই নিপাট ক্রেতা। আর কায়েস ব্যস্ত বিক্রেতা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

কায়েস ও তার দোকানের সামনে ভিড় করা তরুণ, ছাত্র কিংবা মাঝ বয়সী ব্যবসায়ীসহ যারা আছেন, সবাই টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখেন আর বাজি ধরেন। তাদের বাজি টাকার অংকে খুব বড় নয়। কিন্তু নেশাটা ভয়ঙ্কর। তাদের অনেকেই ইতিমধ্যে সর্বস্ব খুইয়েছেন। কিন্তু এটা নিয়ে তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই বরং নানা কায়দায় অর্থ সংগ্রহ করে প্রতিদিন ক্রিকেট বাজির নামে জুয়া খেলায় মেতে উঠেন।
কয়েক জন ক্রিকেট জুয়াড়ির সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তারা খেলা শুরুর আগে কয় উইকেটে কোন দল জিতবে, কোন খলোয়াড়ের কত ওভার মেডেন হবে, কত ওভারে কত রান হবে, কোন খেলোয়াড় হাফ সেঞ্চুরি বা সেঞ্চুরি করবে- এসব বিষয়ে বাজি ধরা হয়। অনেক সময় বলে বলেও বাজি ধরা হয়। আর বাজির টাকা নগদে পরিশোধ করতে হয় সঙ্গে সঙ্গে। টাকা না থাকলে সুদে ঋণ দেওয়ারও ব্যবস্থা আছে।
ক্রিকেট জুয়া মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। বাজির প্রায় একই চিত্র ঢাকার পাড়া-মহল্লার অলিগলি, বাজার থেকে শুরু করে জেলা শহরগুলোতে। চায়ের দোকান, রেস্তোঁরা, সেলুন, রিকশা গ্যারেজ ইত্যাদিকেন্দ্রিক ক্রিকেট জুয়ার আসর বসছে প্রতিদিন। এসব আসরে যোগ দেওয়া বেশির ভাগই শ্রমজীবী মানুষ। তাঁরা জুয়ার আসরে এসে প্রতিদিনই নিঃস্ব হচ্ছেন। দেশের প্রচলিত আইনে জুয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দলের হার-জিত, পরের বলে কত রান বা ছয়-চার হবে কি না, পরের ওভারে ব্যাটসম্যান আউট হবেন কি না, একজন বোলার কত উইকেট পাবেন, ব্যাটসম্যান কত রান করবেন, দলের কত রান হতে পারে, নির্দিষ্ট দল কত রান বা উইকেটের ব্যবধানে জিতবে ইত্যাদি ছোটখাটো নানা বিষয় নিয়েই চলছে বাজি ধরা। বাজির দরও ঠিক করেন নিজেরাই।
টঙ্গী এলাকার বীর রহমান বলেন, এলাকার চায়ের দোকান, সেলুনগুলোতে প্রতিদিনই বসছে জুয়ার আসর। আশপাশের মেসে থাকা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওগুলোতে যোগ দিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘তবে বছরব্যাপী ক্রিকেট জুয়া সবচেয়ে বেশি হয় বিহারি ক্যাম্প এলাকায়।’
সাভারের মজিদপুর এলাকার পোশাককর্মী রিপন মিয়া মুঠোফোনে বলেন, তাঁর সহকর্মীদের অনেকেই এই ক্রিকেট জুয়ায় মজেছেন। নিজেদের মেসে বা পাড়ার চায়ের দোকানে প্রতিদিনই বসছে এ রকম জুয়ার আসর। দু-একজন মাঝেমধ্যে কিছু পয়সা জিতলেও শেষ পর্যন্ত সবাই হারছেন। গত শনিবার জুয়ায় হেরে তাঁর পাশের রুমের এক কর্মী মুঠোফোন বেচতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, আগে শ্রমিক পাড়ায় বিভিন্ন চা-দোকানের পাশে, রাস্তার মোড়ে পেতে রাখা ক্যারম বোর্ড শ্রমিকেরা বোর্ডপ্রতি খেলায় বাজি ধরতেন। এখন সেই দোকানেই ক্রিকেট বাজি চলছে।

কেবল স্থানীয় পর্যায়েই নয়, ইন্টারনেটে ক্রিকেট জুয়ার ফাঁদ পেতে আছে বহু ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ। ঢাকার এক তরুণ চাকরিজীবী বলেন, তিনি চার-পাঁচ বছর ধরে ক্রিকেটের বিভিন্ন আয়োজনে বাজি ধরে আসছেন। একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিনি বাজি ধরেন। সাইটটি চালায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি জুয়া কোম্পানি। এ রকম বহু কোম্পানি রয়েছে। যারা ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক বা আঞ্চলিক লিগ বা টুর্নামেন্ট চলার সময় বাজির আয়োজন করে। বাজি ধরার আগে ওই ওয়েবসাইটে ডলার দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। প্রাথমিক পর্যায়েই হাজারখানেক ডলারের (৮০ হাজার টাকা) প্রয়োজন হয়। আর্ন্তজাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সব অর্থের লেনদেন হয়। ম্যাচ শুরুর আগেই বাজির দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ এক টাকা বাজি ধরার পরে জিতলে কত টাকা দেওয়া হবে এবং হারলে কত টাকা দিতে হবে, সেই দরটা নির্ধারিত হয়।
বাজির পরামর্শ সাইট
বাজির আর্ন্তজাতিক ওয়েবসাইটগুলোতে বাজি ধরার আগে বাজিকরেরা যাতে দলের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন, সে জন্য অসংখ্য ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ রয়েছে। ফেসবুকের গ্রুপ বা পেজগুলো আইপিএলের বাজি ধরা নিয়েও সরব। এর মধ্য একাধিক ওয়েবসাইটে আইপিএলের ক্রিকেট বাজির বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ওই ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি বাজি ধরা যায়। তবে ওয়েবসাইটে নির্দেশনা রয়েছে, এখানে বাজি ধরা কেবল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরতদের জন্য প্রযোজ্য। কারণ, ওই সব দেশে জুয়া আইনসিদ্ধ। যেসব দেশে জুয়া বেআইনি, সেসব দেশের নাগরিকদের ওই ওয়েবসাইট ব্যবহারে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞায় কোনো কাজ হচ্ছে না। ওই ওয়েবসাইটের বাঙ্গালীদের আনাগোনাই বেশি দেখা গেছে। ওই সব ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে কিছুক্ষণ পরপর মাঠের অবস্থা, পিচের অবস্থা, সংশ্লিষ্ট বোলার অথবা ব্যাটসম্যানের বিস্তারিত তথ্য ইত্যাদি তুলে ধরা হচ্ছে।
ঢাকার বাইরে একই অবস্থা
জামালপুর সদরের এক তরুণ বলেন, জেলার চায়ের দোকান, সেলুনসহ সড়কের মোড়ে বসছে এ ধরনের বাজির আসর। ফেসবুক পাতা, বাজির আর্ন্তজাতিক ওয়েবসাইটগুলো থেকে বাজির দরটা জেনে নিজেরা নিজেদের মধ্যেই বাজি ধরেন।
রংপুরের শাহীন ফেসবুকে জানান, শহরের বিভিন্ন জায়গাতেই চলে বাজি ধরা। বিশেষ করে কাচারিবাজার এলাকার সেলুনগুলোতে খেলার সময় নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষগুলো ভিড় করে বাজি ধরেন। এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি রংপুরের হারাগাছের বিড়িশিল্প-অধ্যুষিত এলাকায়। বিড়ি শ্রমিকেরা এসবে যুক্ত হয়ে প্রতিদিন নিজের উপার্জনটুকুও হারাচ্ছেন।
চট্টগ্রামের হাফিজ ফেসবুকের মাধ্যমে জানান, চট্টগ্রামে আইপিএল নিয়ে নগরের প্রতিটি মোড়ের চা- দোকানে পাড়ায় পাড়ায় বাজি ধরা হয়। তবে এর মধ্যেই নগরে বেশ কয়েকটি মারামারি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহী থেকে ফয়সাল ঢালী মুঠোফোনে জানায়, আইপিএল নিয়ে রাজধানীর গ্রামেগঞ্জে বাজি চলছে। গ্রাম বা শহরে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তরুণেরা জুয়া খেলছেন। এতে বেশির ভাগই হেরে যাচ্ছেন।
আইপিএল শুরু হতে না হতেই সারাদেশে জুয়া খেলা ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। জুয়ার সঙ্গে একযোগে বাড়ছে, মারামারি ও চুরি-ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধও। ছোট-বড় বিভিন্ন ক্লাবে ও পাড়া-মহল্লার আড্ডায় ও চায়ের দোকানে তো বটেই, জুয়া খেলা হচ্ছে এমনকি সড়কের পাশে এমন সব স্থানেও, যেখানে টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখার সুযোগ রয়েছে। মোবাইলেও জুয়া খেলছে অনেকে। জুয়ার ধরনও বিচিত্র। জুয়া খেলা হচ্ছে প্রতি ওভারে এবং বলে বলে। কোনো ওভারের হয়তো দুটি বল বাকি রয়েছে। একজন বলে বসছে, বাকি দুই বলে ১০ রান হবে। না হলে সে এক হাজার টাকা দেবে। পরে দেখা গেলো, ১০ রান হয়নি। অর্থাৎ ওই জুয়াড়ি হেরে গেছে। এক হাজার টাকাও সে দিয়ে দিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে। এভাবেই দু’-চারশ’ থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত নানা অংকে জুয়া খেলার ধুম চলছে। জুয়ায় টাকার পরিমাণও বিস্ময়কর। যেমন অনলাইনভিত্তিক একটি বেটিং সাইটের পরিসংখ্যানে জানা গেছে, আইপিএলের কলকাতার শেষ ওভার নিয়ে প্রায় তিনশো’ কোটি টাকার বাজি ধরেছিল জুয়াড়িরা। এটা একটি মাত্র ওয়েব সাইটের খবর। বাস্তবে জুয়া খেলা হয়েছে অনেক বেশি টাকার। জুয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে বেটিং ওয়েবসাইটের সংখ্যাও। বেআইনিভাবে জুয়া খেলার কারণে গত বছর ১২টি গ্যাম্বলিং ওয়েবসাইটকে নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন, বিটিআরসি। কিন্তু জুয়াড়িদের তৎপরতা বন্ধ করা যায়নি। নিত্য নতুন নামে তারা গ্যাম্বলিং ওয়েবসাইট খুলে জুয়া খেলার বরং সম্প্রসারণ ঘটিয়ে চলেছে। কিছুই করতে পারছে না বিটিআরসি। কারণ, জুয়া খেলাকে প্রতিহত করার ব্যাপারে পুলিশসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর তৎপরতা নেই বললেই চলে। এসব বাহিনী কেবল তখনই তৎপর হয়ে ওঠে যখন কোনো বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। ‘ভার্চুয়াল’ জগতের এই ‘ডিজিটাল’ জুয়ার কারণে বাংলাদেশের পুরো সমাজেই অপরাধ ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়ছে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ। জুয়ার প্রতিরোধে এখনই দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়া গেলে ছাত্র-যুবকরা তো বটেই, কিশোররা পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশংকা ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজনেরা।
সারা বিশ্বে ক্রিকেট ভদ্র খেলা নামে পরিচিত। সেই ভদ্র খেলা নষ্ট হচ্ছে জুড়াড়িদের কালো থাবায়। বিদেশী ক্রিকেট টুর্নমেন্টের বাতাশে উজাড় হচ্ছে অনেক হতদরিদ্রের ঘর। এই ক্রিকেট জুয়া এখনি বন্ধ করতে না পারলে ভদ্র খেলার গায়ে অভ্রদের তকমা লাগতে বেশি দেরি লাগবে না।

স/ এষ্

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন