পাবনায় তীব্র শীত, হিমেল হাওয়া আর শৈত্যপ্রবাহে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। হাসপাতালে বাড়ছে শিশুসহ বয়স্ক রোগীর সংখ্যা। বেশ কয়েকদিনে শীতজনিত নানা রোগে এবং বয়স্ক রোগীরা অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও শীতজনিত নানা রোগে গত আড়াই মাসে মারা গেছে কমপক্ষে ৭৫ শিশু।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, সোমবার সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ৩২ শিশুসহ ৫৪ জন নানা বয়সী রোগী ভর্তি হয়েছে। তারা চিকিৎসাধীন।

হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নেই, ইন্টান চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা সেবা, শিক্ষার্থী সেবিকা দিয়ে নার্সিং পরিচালনা, অক্সিজেন সংকট, অর্থের বিনিময়ে রোগীর শরীরে স্যালাইন পুশের অভিযোগসহ বেড সংকট প্রকোট আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত বেড না থাকায় প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ রোগী মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্রে আরো জানা গেছে, গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির ১৪ তারিখ পর্যন্ত এই হাসপাতালে নিউমোনিয়া রোগে ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও শ্বাসকষ্ট, লো বার্থ ওয়েটসহ বিভিন্ন রোগে ৬৩ শিশু এবং বয়স্ক ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার আগেই মারা গেছে ৬ জন।

জানা গেছে, শীতজনিত ও অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, জেলার আতাইকুলা থানার ভুলবাড়িয়া গ্রামের ওসমান প্রামানিকের ছেলে আবু বক্কার প্রামানিক (৮৫), একই থানার বনগ্রামের মনির হোসেনের স্ত্রী মনির হোসেনের স্ত্রী খোরশেদা খাতুন (৫৫) ও একই এলাকার কুদরতের ছেলে মনসুর আলী (৫৫)। পাবনা সদরের দ্বীপচর এলাকার লজের প্রামানিকের ছেলে লোকমান প্রামানিক (৭৫)। আটঘরিয়া উপজেলার পারখিদিরপুর গ্রামের শাহাদত আলীর ছেলে আব্দুল কাদের (৫০) ও সুজানগর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের হাজী আছির উদ্দিন (৬৫)। সদর উপজেলার বলরামপুরের ওহাবের স্ত্রী সাহেরা (৪৫) ও আটঘরিয়ার মৃত আবু হানিফেরর ছেলে আব্দুল মান্নান (৫৫)।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সিনিয়র নার্স রাবেয়া খাতুন জানান, শীতের শুরুতে অর্থাৎ গত নভেম্বরে এ হাসপাতালে ২ হাজার ২৫ জন শিশু ভর্তি হয়, তার মধ্যে ৪৪ শিশুর মৃত্যু হলেও নিউমোনিয়া আক্রান্ত ৪ শিশু মার যায়। এছাড়া ডিসেম্বরে ভর্তি হয় ১ হাজার ৩৫ জন শিশু। আর মারা যায় ৮ শিশু। এদের মধ্যে ৬ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল।

তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন শিশু শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে। তিনি বলেন, চলতি জানুয়ারি মাসে ১৪ তারিখ পর্যন্ত নিউমোনিয়ার চেয়ে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যাই বেশি। গত দুই সপ্তাহে হাসপাতালে ডায়রিয়ায় শিশুসহ দুই শতাধিক আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি একাধিক শিশু রোগীর স্বজনেরা জানালেন, চিকিৎসা সেবার মানে তারা সন্তুষ্টু নন। এক ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসাই বলবো। গুরুতর বা জটিল কোন সমস্যা হলেই যেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেখানে না রেখে দ্রুত রাজশাহী নতুবা ঢাকাতে স্থানান্তর করে দিচ্ছেন। তারা জানালেন, শিশুদের ফটোথেরাপির প্রয়োজন হলেও এ হাসপাতালে অনেক দিন ধরেই ফটোথেরাপি মেশিন বিকল রয়েছে।

দেখা যায়, একটি বেডে ৬০ ওয়াটের বাল্পের সহায়তায় টেবিল ল্যাম্প দিয়ে তিনজন শিশুকে এক বেডে শুইয়ে দিয়ে তাপ দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অক্সিজেন সংকটের কারণে একটি অক্সিজেন লাইন দিয়ে পর্যায়ক্রমে তিন শিশুকে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে।

শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নীতীশ কুমার কুন্ডু বলেন, শীতের শুরুতে শীতজনিত রোগে আক্রান্তর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আবার শীত কমতে শুরু করলে তখন ডায়রিয়া আক্রান্তর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যাপ্ত বেড না থাকায় অনেক রোগীকে মেঝেতে আড়াআড়ি করে শুইয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে হচ্ছে।

চিকিৎসকদের দাবি, যতটুকু আছে, তা দিয়েই সন্তোষজনক সেবা দিতে সর্বদা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসা সেবা দিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির কিছুটা স্বল্পতা রয়েছে। তারপরও অধিকতর জটিল রোগীকেই কেবল উন্নত চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য স্থানান্তর করা হয়ে থাকে।

তবে জেলাবাসীর দাবি, চিকিৎসা ক্ষেত্রে কেবল সর্বশ্রেণির আশ্রয়স্থল পাবনা জেনারেল হাসপাতাল। আর এই হাসপাতালে সব বয়সী নারী পুরুষের পাশাপাশি শিশু রোগীদের যুগোপযোগী চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী।

তীব্র শীতের মধ্যে নাস্তানাবুদ অবস্থার মধ্যে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। খেটে খাওয়া মানুষ পেটের তাগিদেই তীব্র শীত, হিমেল হাওয়া আর বরফ গলা শৈত্যপ্রবাহ উপেক্ষা করে ঘর ছেড়ে কর্মের সন্ধানে বের হচ্ছেন।

শহরের ফুটপাত আর হাকার্স মার্কেটগুলোতে গরম কাপড় কেনার হিড়িক পড়েছে। গরম কাপড়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা দামও চড়া হাঁকছেন। বাধ্য হয়েই শীত নিবারণের জন্য গরম কাপড় কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা।

পল্লী অঞ্চল থেকে কর্মের সন্ধানে শহরে আসা মজুর শ্রেণির মানুষ একট গরম উষ্ণতা পেতে খড়কুটি, কাগজ জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা চালাচ্ছেন বন্ধ মার্কেট বা ফুটপাতের ফাঁকা জায়গাতে। শহরের দোকানপার্ট বিশেষ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও খোলা হচ্ছে অনেক দেরিতে। কাকডাকা ভোরে যেমন যানবাহন কম চলতে থাকে। অনুরূপ সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে যায়।

এদিকে শীতার্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা। শীতার্ত মানুষের মাঝে বিলি করছেন কম্বল। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও মাঠে নেমেছেন শীতবস্ত্র বিতরণে।

জেলা ত্রান কর্মকর্তা শেখ সিরাজুল ইসলাম জানান, জেলার ৯ উপজেলায় সরকারি ভাবে শীতবস্ত্র হিসেবে বরাদ্দ এসেছে ৫৫ হাজার ৪০৬ পিস কম্বল। তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ে ৫০ হাজার পিস শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। পরবর্তীতে আরো ২৫ হাজার পিস শীতবস্ত্র চাহিদা পাঠানোর প্রেক্ষিতে আরো ৫ হাজার পিস শীতবস্ত্র পাঠানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, চাহিদা অনেক থাকা শর্তেও বরাদ্দ সাপেক্ষে বিতরণ করা হচ্ছে।

স/এন

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন