খাইরুল ইসলাম, ঝালকাঠি প্রতিনিধি: সংসারে তার নুন আনতে পান্তা ফুরালেও আনন্দে দেশ ও প্রকৃতি নিয়ে লোকালয়ে গান গেয়েই যাচ্ছেন ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন জেলায় সোহরাব বয়াতি নামে পরিচিত এই অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি। অভাবের তাড়নায় যদিও প্রাথমিক স্কুলের গন্ডি পার হতে পারেননি তিনি। কিন্তু দেশ ও প্রকৃতির বাইরেও বাল্য বিয়ে, যৌতুক ও পরিবার পরিকল্পনাসহ সমাজ সংস্কারে স্থানীয় ভাষায় নিজের লেখা গান গেয়ে রাখছেন অবদান।
অসাধারণ প্রতিভার এই মানুষটি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে গ্রামঞ্চলের মেঠোপথে কিংবা ছোটখাটো কোন অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংস্কৃতির ও স্থানীয় ভাষায় সাংসারিকসহ যে কোন বিষয়ের ওপর গান গেয়ে তিনি আসর মাতিয়ে রাখেন। তার বাশিঁর সুরে মিশে আছে যেন প্রকৃতির ভাব।
শহরের কলেজ মোড়ের কাউন্টারে থামানো যাত্রীবাহী বাসে উঠে বিভিন্ন ধরনের ঔষধ বিক্রি করতেন সোহরাব। বাকি সময়টায় তিনি নিজে নিজে গান লিখতেন, সুর দিতেন আর গাইতেন। বেশিরভাগ গানই দেশ ও প্রকৃতি নিয়ে। ‘যৌতুক নেবো না যৌতুক দেবো না/যৌতুক করেছে মানা বাংলাদেশ সরকার/যৌতুকের অভিশাপ বড় ভয়ঙ্কর, কিংবা ছোট ছোট ছেলে মেয়ে বিয়ে দিতে নাই/ মেয়ের বয়স ১৮ বছর কমপক্ষে চাই/২২ বছর ছেলের বয়সটা যদি থাকে ঠিক/দেখে শুনে দেবেন সবে বিবাহের তারিখ, ও ভাই বিবাহের তারিখ।’ এমন ৩শ’ গানের রচয়িতা, সুরকার ও গায়ক বাউল কবি সোহরাব মিয়া নিজেই।
বাউল সোহরাবের এই হৃদয়-ছোঁওয়া গানগুলোতে যে নারীবাদী ভাবনার প্রকাশ পেয়েছে, অর্থাৎ, স্বদেশভূমির মাঝে মাতৃরূপের দর্শন, এই নারীভাবনাটি বাংলার দীর্ঘকালীন যৌতুকের অভিশাপ?
বাউল সোহরাবের লেখা এসব গান বরিশাল বেতারেও পরিবেশন হচ্ছে। তিনি বাউল শিল্পী হিসেবে বরিশাল বেতারে তালিকাভুক্ত। বেতার কর্তৃপক্ষ আগে-ভাগেই অনুষ্ঠানের বিষয় জানিয়ে দিলে তার ওপর গান লিখে নিজেই সুর করে পরিবেশন করেন সোহরাব। বাউল সোহরাবের নিত্যসঙ্গী সারিন্দা আর বাঁশের বাঁশি।
অসাধারণ সুরে বাঁশিও বাজাতে পারেন তিনি। কেবল মুখ দিয়েই নয়, নাক দিয়েও বাঁশি বাজিয়ে তুলতে পারেন যে কোন সুর। তবে তা নিছক আনন্দ দেওয়ার জন্য। সারিন্দা বাজিয়ে নিজের গান করেন আর বাঁশি বাজান সহশিল্পীদের গানে।
গ্রামের পালাগানের লোকজনের বাঁশি শুনে বাঁশির প্রেমে মজেন। একদিন পালাগানফেরতকালে বংশিবাদকের কাছ থেকে একটি বাঁশি নিয়ে ঘরে ফেরেন। অতঃপর বাজানোর চেষ্টায় কাটে ক’দিন। ফাঁক পেলেই ফুঁ দেয়ার অক্লান্ত চেষ্টা। অবশেষে তালিম নেন পালাগানের বংশিবাদকের কাছে। বংশিবাদকের ফুঁ-এ যেমন সুরের যাদুর ইন্দ্রজাল ঝরায়, তেমনই কাঁদায়, জাগায়ও। এদেশে লোকগান বংশীবাদকহীন অসম্পূর্ণ।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার শেখেরহাট গ্রামের প্রয়াত ফজলে আলী হাওলাদারে ছেলে বাউল শিল্পী সোহরাব হোসেন (৫৫)। সেই শৈশবে বাবা ফজলে আলীর কাছে গানের হাতেখড়ি। শিশুকালে পালাগানের লোকজনের পাইলদার (সহযোগী) হিসেবে গান গেয়ে যাত্রা শুরু করেন সঙ্গীতাঙ্গনে।
সোহরাব জীবিকার তাগিদে ৪০ বছর ধরে তিনি ফুটপাতে হকারি করে ভেষজ ঔষধ বেঁচে সংসার চলাচ্ছেন। আর মনের খোরাক জোগাতে গান লেখেন, নিজেই সুর করে নিজেই গাইছেন। এখন বাউল সোহরাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ সমাদরে নানা অনুষ্ঠান আয়োজনে গান গাইতে ডাক পান। মেলে পয়সা-কড়ি।
বাউল সোহরাব বলেন, ‘গান আমার নেশা, রক্তের সাথে মিশে আছে। তাই অনুষ্ঠান আয়োজনে যে যেখানে ডাকেন সেখানেই যাই। আয়োজকরা ভালোবেসে যা দেয় তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি। তবে প্রযুক্তির যুগে হিন্দি আর ইংরেজি গানের দাপুটে গ্রামবাংলার গান এখন হারাতে বসেছে। তাই সংসার চালাতে হকারি পেশাও ধরে রাখতে হয়েছে।’
ঝালকাঠির লোকজ সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন কলেজ শিক্ষক ড. কামরুন্নেছা আজাদ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এত স্বল্প শিক্ষিত একজন মানুষ হয়েও বাউল সোহরাব যেসব গান লিখছেন তা আসলেই কল্পনা করা যায় না। সমাজের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে কাব্যিক ছন্দে গান লিখে নিজেই সুর করে যাচ্ছেন। আর সমাজের অসংগতিকে করছেন গানে গানে কুঠরাঘাত। রেডিও থেকে শুরু করে ফুটপাতে এসব গান গেয়ে সমাজে অবদান রাখছেন সোহরাব। সত্যিই তিনি একজন দৃষ্টান্ত।’
১৫ শতাংশ জমিতে বসতবাড়ি সোহরাব মিয়ার। চাষের জমি নেই। ধার দেনা করে দুই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর এখন ২ ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার। বড় ছেলে জীবন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকায় অতি অল্প বেতনে চাকরি করছে। আর ছোট ছেলে সুজন নবম শ্রেণিতে পড়ে। অভাব দারিদ্র যেন তার নিত্যদিনের সঙ্গী। তবু গান তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে জীবন যুদ্ধের ময়দানে। ভাঙা ঘরে চাঁদের আলোর মতোই বাউল সোহরাবের প্রতিভা দারিদ্র্যের কষাঘাতে আজ জর্জরিত। অভাব অনটন পিছু ছাড়ছে না। তবু বাউল কবি সোহরাব মিয়া আমৃত্যু আনন্দেই গান গেয়ে যাবেন বলে করেছেন পণ।

স/এষ্

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন