এম.এম.রহমান,মুন্সীগঞ্জ:

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চিতলিয়ার রজতরেখা নদীতে জিয়াসমিন বেগম (৩০ ) নামের সংগ্রামী এক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী ইঞ্জিন চালিত ট্রলার চালিয়ে জীবন জীবিকা চালাচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রে জানাযায়,প্রায় ১২ বছর পূর্বে আধারা ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্ধা মো: সবুজ সিকদার এর সঙ্গে জিয়ামিনের বিবাহ হয়। স্বামীর সংসারে গিয়ে জিয়াসমিন ২টি কন্যা সন্তানের মা হয়। স্বামী সবুজ ছিল পেশায় একজন ট্রলার চালক। স্বামীর ট্রলার চালানো উপার্জিত অর্থে বেশ ভালই চলছিল তাদের সংসার । তিন বছর আগে জিয়াসমিনের স্বামী সবুজ নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হয় । বন্ধ হয়ে যায় তাদের আয় রুজি। স্বামীর চিকিৎসা আর সংসার খরচের কারনে অভাব অনটনে পড়েন জিয়াসমিন। ২ বছর পূর্বে স্বামী সবুজ বাল্ব নষ্ট হওয়ার কারনে মারা যায়। এতে করে বিধবা জিয়াসনি দুটি কন্যা সন্তান নিয়ে পড়েন অভাবে। উপার্জন করার মত কেউ ছিল না তাদের সংসারে । জিয়াসমিন একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। তার একটি চোখে সমস্যা রয়েছে। সে কোন ধরনের ভাতা পায়নি আজও । কোথাও কোন সাহায্য সহযোগিতা না পেয়ে মেয়েদের নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে কাটায়। দুটি মেয়েকে শিক্ষিত করে ভাল ঘরে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা মাথায় রেখে নেমে পড়েন স্বামীর স্মৃতি ইঞ্জিন চালিত ট্রলারটি নিয়ে। প্রতিদিন সকাল ৬ টা থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত চিতলিয়া বাজার খেয়াঘাট ও বকচর ঘাটে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন এই সংগ্রামী নারী। কখনও ৬জন কখনও ১২ জন যখন যেমন লোক হয় তা নিয়েই রওয়ানা দেন গন্তব্যে। কখনও রোদ , কখনও বৃষ্টি কোনটাই থামাতে পারেনা এই প্রতিবন্ধী স্বামী হারা সংগ্রামী নারীকে।


সরেজমিনে চিতলিয়া বাজার নদীর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জিয়াসমিন চিতলিয়া বাজার ঘাটে ট্রলার নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করেন। অন্যান্য ট্রলার চালাক মত যাত্রীদের ডেকে ট্রলারে তুলেন এই সংগ্রামী নারী। ৭ জন যাত্রীর সঙ্গে প্রতিবেদকও ট্রলারে উঠলেন। যাওয়ার সময় ৯ জন যাত্রী নিয়ে ছুটে যান নদীর অপরপ্রান্ত বকচরে। জিয়াসমিন ইঞ্জিনটি নিজেই স্টার্ট দেন, এবং ট্রলারটি হাল ধরে চালিয়ে নিয়ে যায়। ভারী এই ইঞ্জিন চালু করা কষ্টের কাজ তাই স্থানীয় যাত্রীরা কখনও কখনও তার ট্রলারের ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে সহযোগিতা করেন। ট্রলারটি বকচর পয়েন্টে যাওয়ার এবং আসার সময় প্রতিবেদক সংগ্রামী নারী ট্রলারটি একাধিকবার স্টার্ট দিয়ে সহযোগিতা করেন। বিভিন্ন ঘাটে বা গ্রামের পাশে গিয়ে ট্রলারটি থামিয়ে যাত্রীদের নামানো হয়। আবার নতুন যাত্রী তুলেন। এতে করে জিয়াসমিনকে বার বার ইঞ্জিন চালু বা বন্ধ করতে হয়। এতো বড় একটি ইঞ্জিন ঘুরিয়ে স্টার্ট দেওয়াও কঠিন এবং পরিশ্রমের কাজ।
ট্রলারে একাধিক যাত্রীরা জানায়, নদী এলাকার শতকরা ৯০ জনই ইঞ্জিন চালু দিতে পারে । অনেকে এই নারীর কষ্ট দেখে যাত্রীরাই বেশীর ভাগ সময় ইঞ্জিন চালু করে জিয়াসমিনকে সহযোগিতা করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ একজন নারী হয়ে নদী পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ পারাপারের কাজটি করেন তিনি। আজ পর্যন্ত এই নারীকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করেনি। কোন কার্ডও পায়নি আজও। মিলেনি বিধবা কিংবা প্রতিবন্ধী ভাতা। ২টি মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন।
বকচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো: লিটন জানান, এ নদী পারাপার হই। এই নারীকে আমরা দেখি বৃষ্টিতে ভিজতে,রোদে শুকাতে। অনেক পরিশ্রম করেন তিনি। বড় মেয়ে লাবনী (১৪) ৭ম শ্রেনীতে পড়েন এবং ছোট মেয়ে নাদিয়া (৯) আমার বকচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেনীতে পড়েন। যারা একটু বিত্তবান তাদের সকলের উচিত সংগ্রামী এই নারীর পাশে দাড়ানো।
সংগ্রামী নারী জিয়াসমিন বেগম বলেন, আমার স্বামী নেই। ঘরে ২টি মেয়ে আছে ওদেরকে পড়াশোনা করাতে হবে। মানুষে কি? সারা বছর খাবার দিবে। আমি ট্রলার চালাই বলে নানান জনে নানা কথা বলে । অনেকে টিস করে, খারাপ কথা বলে। দুরে গেলে আরো খারাপ কথা বের করবে। এ জন্য দেশে থেকে আমার স্বামীর স্মৃতি এই ট্রলার চালাই । মানুষ আমাকে কে কি? বলে সেটা আমি ভাবিনা । ঘরে খাবার না থাকলে কে খাওযাবে? কষ্ট করি সন্তান দুটিকে মানুষ করবো বলে।
সংগ্রামী নারী জিয়াসমিনকে সহযোগিতা করার বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার হানিফা দায়সারা মনোভাব নিয়ে বলেন, আমি তাকে কিভাবে সহযোগিতা করিব? তার নাম ভাতা লিস্টে নেই। তার জন্য আমার কিছু করার নেই। এমনকি প্রতিবন্ধী এই নারীর বিষয়টিও ইউপি চেয়ারম্যানকে অবগত করেনি এই ইউপি সদস্য।
সংগ্রামী এই নারীর কথা শুনে সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন আধারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: সামসুল হক মাষ্টার (কবির), তিনি বলেন, আমি মহিলার বিষয়টি জানতে পেরেছি । আমি তাকে নিজে আমার পরিষদে ডেকে আনিব। সে একজন প্রতিবন্ধী এবং বিধবা নারী । সংসারে রোজগার করার মত কেউ নেই। ২টি কন্যা সন্তানকে মানুষ করার জন্য সংগ্রাম করেন । আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত নারীদের বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধীভাতাসহ আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসাবে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করিব।

স/এষ্

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন