মইনুল হোসেন

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার এতে কোনো ক্ষতি হয়নি।

তিনি তো আগামী জানুয়ারিতেই অবসরে যেতেন। কিন্তু সহনশীলতার এত অভাব যে কিছুটা সময় অপেক্ষা করাও সম্ভব হলো না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেখিয়ে এবং হয়রানির মাধ্যমে দেশের প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হলো। ফলে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো জাতির ভাবমূর্তি। কোনো সভ্য জাতি এ ঘটনায় লজ্জাবোধ না করে পারবে না। সবচেয়ে যা ভাবনার ব্যাপার তা হলো— বিচার বিভাগের মানমর্যাদার ক্ষতি করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

আইনকানুুন মানার কোনো তাগিদ অনুভব না করেই একজন প্রধান বিচারপতিকে বিদায় নিতে বাধ্য করার মতো লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের যে রায় নিয়ে এত আপত্তি সে রায় তো তার একার ছিল না। এ রায় শাসনতন্ত্র পরিবর্তন না করলে তো থেকে যাবে।

তবে বিচার বিভাগ তার নিজস্ব সত্তা নিয়ে থাকবে কি থাকবে না সেটা অবশ্য এখন দুর্ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু কাগজপত্রের কারণে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মুর্শেদকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল। গভর্নর মোনেম খান নয়, খোদ প্রেসিডেন্ট তার হাতে ফাইলটি দিয়ে বলেছিলেন আপনি দেখুন এতে কী আছে। বিচারপতি মুর্শেদ বুঝলেন তার পক্ষে প্রধান বিচারপতি পদে থাকা সমীচীন নয়। তিনি পদত্যাগ করলেন। বলে রাখা উচিত যে, বিচারপতি মুর্শেদকে যে কাগজপত্র দেখানো হয়েছিল তা তার নিজস্ব অসদাচরণ সম্পর্কিত নয়। এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে একজন প্রধান বিচারপতির পদমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকা উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ববোধের বিষয়। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, যিনি শাসনতন্ত্রের রক্ষকের ভূমিকায় ছিলেন তাকেই সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে দেশত্যাগে বাধ্য করতে সক্ষম হয়েছে। শাসনতন্ত্রের প্রতি কিছু লোকের এমনই শ্রদ্ধা যে, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে অপসারণ করতে শাসনতন্ত্র বা আইনের অস্তিত্ব স্বীকার করার কথাও তাদের ভাবতে হলো না। প্রধান বিচারপতি পদের মর্যাদার কোনো গুরুত্ব পেল না।

জনগণ প্রদত্ত শাসনতন্ত্রই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দিয়েছে। জনগণই বিচার বিভাগকে সরকারের অন্য সব বিভাগের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। সরকারই যদি জনগণকে সব ক্ষমতার উৎস হিসেবে না দেখতে পারে তখন এ প্রশ্নও তো করা যাবে যে, তারা কাদের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সরকার, তাদেরইবা এ কর্তৃত্বের উৎস কোথায়। জনগণের শাসনতন্ত্র অগ্রাহ্য করে সরকার শাসনতান্ত্রিক হতে পারে না। সরকারের তো নিজের দিকটিও ভাবা উচিত ছিল।

প্রধান বিচারপতিকে চাকরি থেকে বিদায় নিতে বাধ্য করার মধ্যে সরকারের কোনো আইনগত ক্ষমতার প্রয়োগ নেই। ভয়ভীতি প্রদর্শন তো সরকারি শক্তি হতে পারে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যুক্তিই রাষ্ট্রীয় শক্তি। সরকারের শক্তি আইনকানুন ও শাসনতন্ত্র। বিচারপতি সিনহার ব্যাপারটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠালেই তো তিনি আর কোর্টে বসতে পারতেন না। দুশ্চিন্তা হয় আমরা কীসের ওপর বা কাদের ওপর নির্ভর করে কোথায় যাচ্ছি। মনে হচ্ছে জনজীবনে ভদ্রতা-শালীনতা মেনে চলার কোনো গুরুত্ব নেই।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের জাতীয় সংসদ অপসারণ করতে পারবে শাসনতন্ত্রে সংযোজিত এ বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে প্রধান বিচারপতিসহ আরও পাঁচজন বিচারকের ঐকমত্যের রায়ের ফলে প্রধান বিচারপতি সরকারের বিরাগভাজন হন। বারবার বলা হচ্ছে, এ ধরনের ক্ষমতা ভারতের দুকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টেও নেই। সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতিকে দোষী সাব্যস্ত করার কাজটি রাজনীতিবিদরা করেন না। বিচারপতিরাই করেন। তারপরও ভারতে এ ব্যবস্থা অচল হয়ে গেছে। কারণ, দলীয় রাজনীতির দলাদলির জন্য অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ চলতে থাকে।

যুক্তির ভাষা যেন রাজনীতি থেকে নির্বাসনে দেওয়া হয়েছে। এতে যে রাজনৈতিক নেতাদের মানমর্যাদা রক্ষা পাচ্ছে না, তা ভেবে দেখার সময় নেই। নিজেদের প্রশংসা নিজেরাই করে যাচ্ছেন এবং নিজেদের নিয়ে নিজেরাই গর্ববোধ করছেন।

বিচারপতি সিনহা তার পর্যবেক্ষণে সরকারের দুর্বলতাসমূহ তুলে ধরতে গিয়ে সরকারের ক্রোধের আগুনে বাড়তি ঘি ছিটিয়ে দেন এবং এ কারণে সরকারের কিছু লোক দেখিয়ে দিলেন তারা কী করতে পারেন।

শাসনতন্ত্র সুশাসনের দলিলও। শাসনতন্ত্রের রক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা যে তাদের রায়ে দেশ শাসনের অব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো অভিমত প্রকাশ করতে পারবেন না তা তো সঠিক নয়। তবে সাধারণত তারা যতটা সম্ভব রাজনীতির বিষয় নিয়ে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক নেতারা এ ধরনের সমালোচনা করেন। আমাদের দেশে তো সে রাজনীতি নেই। বিচারপতি সিনহা কোনো ব্যক্তির রাজনীতির আলোচনা করেননি। সুশাসনের জন্য করণীয় বিষয়গুলোর দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবুও তার অভিমত মূল রায় থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করলেই বাদ দেওয়া যেত। বিচারপতি সিনহা নিজেও বলেছেন, রিভিউতে আসলে বিষয়টি তিনি বিবেচনা করে দেখবেন। বিদেশ থেকে ফিরে ১২ দিনের মতো প্রধান বিচারপতি তার বাসভবনের বাইরে যাননি। যাননি কোর্টেও। ঘোষণা দেওয়া হয় তিনি অসুস্থ এবং সে কারণে দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন না। কেবল আইনমন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কিছু লোক তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পেরেছেন। তাদের সে সাক্ষাৎ সম্পর্কে বাইরে কিছু প্রকাশ হয়নি। গুজব ছড়িয়েছিল যে, তার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল পদত্যাগ করার জন্য। কিন্তু তাকে পদত্যাগ করানো সম্ভব হয়নি। স্বচ্ছতা না থাকার ফলে কী ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল সে সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বলছেন। এরপর তাকে দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বিচারপতি সিনহা সেই সুযোগ গ্রহণ করেন এবং দেশ ছাড়ার পথে নিজের হাতের লেখা এক বিবৃতিতে তার অসুস্থতার কথা অস্বীকার করেন। তিনি ‘বিব্রতবোধ’ করার কথা বলেন। দেশে ফিরে আসার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন।

কিন্তু তিনি দেশে ফিরে আসার বদলে সিঙ্গাপুর থেকে তার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। আমি মনে করি তিনি সম্মানজনক কাজই করেছেন। নইলে তার এবং তার অবস্থানকে ব্যবহার করে উত্তেজক এবং কদর্য রাজনীতি করা হতো। তিনি রাজনীতির শিকার হলেও দেশে ফিরলে তাকে এবং সরকারকে জড়িয়ে যে রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ছড়ানো হতো তা তিনি এড়াতে চেয়েছেন যাতে বিচার বিভাগের অধিকতর ক্ষতি না হয়।   বিচারপতি সিনহা দেশ ত্যাগের পরে আমরা জানতে পারলাম তার বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের মামলা রয়েছে। কিন্তু কোর্ট-আদালতে বা দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে এ জাতীয় কোনো তথ্য নেই। তাই এটা বোধগম্য নয় যে, কীভাবে বলা যায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। হতে পারে সরকারের কাছে এ সম্পর্কে কাগজপত্র আছে। কাগজপত্র থাকলে মামলা করতে তো কোনো অসুবিধা ছিল না। সরকারের নিজ আইনজীবীরাই তো আমাদের শোনাচ্ছেন যে, একমাত্র রাষ্ট্রপতি ছাড়া কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। যদিও আইনের ঊর্ধ্বে না থাকার কথা তখনই বলা যায় যেখানে জনগণ প্রদত্ত শাসনতন্ত্র ও স্বাধীন বিচার বিভাগের ভূমিকা থাকে।

আমি যে ঘটনাটি বিশ্বাস করতে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না তা হলো— আপিল বিভাগের অপর পাঁচজন বিচারপতি প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ কর্তৃক দেখানো কাগজপত্র নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে গিয়ে তার মতামত জানতে চাওয়া এবং তার সঙ্গে কোর্টে না বসার সিদ্ধান্ত দেওয়া।

পেশায় আইনজীবী হিসেবে তাদের দীর্ঘদিন ধরে জেনে আসছি। বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষায় তারা যে সাহসী ভূমিকা রাখতে সক্ষম সে বিষয়ে তাদের ওপর আমার অগাধ আস্থা জন্মেছে। কাগজপত্র দেখালেই একজন প্রধান বিচারপতিকে প্রশ্ন করার দায়িত্ব কোনো বিচারপতি নিতে পারেন না। প্রেসিডেন্ট নিজেই এ কাজটি করতে পারতেন। সুপ্রিম কোর্টের অপর মাননীয় বিচারপতিদের বিব্রত করা মোটেই সমীচীন হয়নি।

বলা হবে এদেশে যুক্তিসম্মতভাবে জ্ঞানবুদ্ধির বিচার-বিশ্লেষণ মতো কিছু আশা না করাই ভালো। তাহলে কি আইনের প্রয়োগ ব্যতীত শুধু ভয়ভীতির জোরেই আমরা ন্যায়ভিত্তিক শান্তিময় একটি দেশ গড়ে তুলতে পারব? এ কষ্ট নিয়েই আমাদের মতো লোকদের বিদায় নিতে হবে যে, বিকৃত বুদ্ধির শিক্ষিত লোকদের জন্যই জনগণ আজ অসহায়। জনগণ প্রদত্ত শাসনতন্ত্র বা জনগণের স্বাধীন বিচার বিভাগ ভয়ভীতির শক্তির কাছে পরাজিত হচ্ছে। বাড়ছে জনগণের অসহায়ত্ব।

প্রধান বিচারপতিকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। সরকারই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, বিচার বিভাগকে সেই ক্ষমতার কাছে নতজানু থাকতে হবে। শাসনতান্ত্রিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ স্থান থাকলেও সরকারি ইচ্ছায়ই হতে হবে সবকিছু।

এরপর বিচারকদের মাধ্যমে অন্য কিছু প্রমাণিত না হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে বলতে হবে। তবে সব বিচারপতিই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় সাহসী হবেন না, এমনটি আমি আশা করি না। একজন বিচারপতি সুবিচার করার মানসিকতা নিয়ে নিজেকে গড়ে তোলেন। বিচারপতি সিনহার বিতর্কের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিদের সম্পৃক্ত করায় হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা অনেকেই ক্ষুব্ধ।

আর একবার প্রমাণিত হলো, কত সহজে সরকার জনগণের কষ্টার্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকার করতে পারে এবং স্বাধীনতার সুফল ভোগ করার ব্যাপারে আমাদের শিক্ষিত সমাজইবা কতটা যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারছি। আমরা নিশ্চয়ই শিক্ষালাভ করি যোগ্যতা অর্জনের জন্য। তাই ব্যক্তিস্বার্থের দিকে লক্ষ্য রাখা, জীবনে বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্জন ও ধান্দাবাজদের মতো শুধু ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার জন্য শিক্ষালাভ, এ কথা মেনে নিলে বিবেক-চরিত্র বা দেশ ও জাতির প্রতি দেশপ্রেমের দায়িত্ব বলতে কিছু থাকে না। শিক্ষা সমাজ গড়তে যে প্রচুর অবদান রাখে তা তো অস্বীকার করা যাবে না। দেশ ও জাতির প্রতি শিক্ষিত লোকদের কোনো ঋণ নেই এমনতো নয়।

প্রধান বিচারপতির পদত্যাগকে কেন্দ্র করে যে অশুভ দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলো তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য জাতিকে না দিতে হলেই হলো। আমি তো বিশ্বাস করি সুশিক্ষিত হওয়ার একটি বিশেষ দিক হলো দূরদর্শী হওয়া। দেশ ও জাতির জন্য গৌরব অর্জন করা। বিচার বিভাগকে নতজানু রাখার অর্থ জনগণকে আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। জনগণ প্রণীত শাসনতন্ত্রকে না মানা।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা।

স/মা

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন