পৃথিবী সৃষ্টির রহস্যের মতো মানব সৃষ্টিরও রয়েছে এক নিগূঢ় রহস্য-অবাক হবার মত ব্যাপার! প্রকৃত অর্থে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন সত্য ও সুন্দরকে প্রকাশ করার জন্য। তারপরেও যে পৃথিবীর সব মানুষ স্রষ্টার ওই অমোঘ বিধানের ছায়াতলে নিজেকে সঁপে দেয় তা কিন্তু নয়; এই পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক মানুষেরই আগমণ ঘটে যাদের মাধ্যমে সমাজে সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা হয়, কল্যাণ সাধিত হয় অগণিত জনসমাজের। কম মানুষই স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নিজেরা ধন্য-সমৃদ্ধ হন এবং মানুষের মাঝে আলোকদ্যুতি ছড়িয়ে অন্ধকারকে বিদূরিত করে আলো ছড়িয়ে দেন পৃথিবীর মাঝে।
আমরা জানি, যুগ-শতাব্দীর বাঁকে সমাজের প্রয়োজনে কখনও কখনও কিছু কিছু শুদ্ধ মানুষের আগমণ ঘটে এ পৃথিবীর তরে। যাদের পদচারণায় সমাজ হয় ধন্য; যাদের কাছে সমাজ-দেশ-জাতি তথা বিশ্ববাসী হয়ে থাকে চিরঋণী। আর তেমনি বাংলার আকাশকে স্নিগ্ধতার আভায় ভরিয়ে আমাদেরকে ধন্য করেছেন, ড. জসীম উদ্দিন আহমেদ নামের এক ক্ষণজন্মা পুরুষ। আমরা এ লেখায় তাঁর বর্ণাঢ্যময় জীবনের সুদীর্ঘ ৮৪ বছরের সৃজনশীল কর্মকান্ডকের নামমাত্র অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

কুমিল্লার গর্ব আমাদের সকলের প্রিয় ড. জসীম উদ্দিন আহমেদ বাল্যকাল থেকেই অতি মেধাবী। তিনি তার সকল কর্মকান্ডে-ই সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখে চলছেন। তিনি এক মুসলিম সম্ভ্রাান্ত পরিবারে ১৯৩৩ সনের ১ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার জিংলাতলী ইউনিয়নের গলিয়ারচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম ওয়াজউদ্দিন আহমেদ ও মাতার নাম রাহাতুন্নেছা। তিনি ৩ পুত্র্র্র্র্ সন্তানের সফল জনকও বটে।
এই বহু প্রতিভার অধিকারী মানুষটি ১৯৪৮ সনে গৌরীপুর সুবল-আফতাব উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন (এসএসসি), ১৯৫০ সনে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আইএসসি, ১৯৫২ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রী লাভ করেন। উল্লেখ্য যে, তৎসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জসীম উদ্দিন আহমেদ ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা আন্দোলনে ফ্রন্ট লাইনে বাংলা ভাষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে সক্রিয় অংশ নেন। এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে প্রথম ঢিলটি তিনিই ছুঁড়ে মারেন। যে ঢিল ছোঁড়ার সূত্র ধরেই পুলিশ গুলি ছুঁড়ে। শুধু তাই নয়, তিনি আবুল বরকতের গায়ে গায়ে ঘেঁষে পুলিশের গুলির সম্মুখীন হন। গুলিবিদ্ধ আবুল বরকত যখন হোস্টেলের বারান্দায় পরে যান, তখন জসীম উদ্দিন আহমেদ বরকতের রক্তাক্ত দেহ কোলে তুলে ধরেন। তাঁর লেখা, ‘আমার দেখা একুশে ফেব্রুয়ারি’ ছোট চটি বইটি পড়লে এ বিষয়ে আরো অনেক কিছু জানা যাবে।
জসীম উদ্দিন আহমেদ ১৯৬৩ সনের জানুয়ারি মাসে আমেরিকায় ইউনিভার্সিটি অব মেশিগান অনাবরে গমণ করেন এবং পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশে ফিরে আসেন এবং ঢাকা আণবিক শক্তি কমিশন ল্যাবরেটরীতে আণবিক বিকিকরণ নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সনে তিনি করাচী আণবিক শক্তি কমিশন হেড অফিসে বদলি হয়ে যান। এবং ডাইরেক্টর পদে থাকাকালীন সময়ে ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তান সরকারের স্পন্সরে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি এজেন্সী ভিয়েনাতে যোগদান করেন। সেখানে সুদীর্ঘ ২৪ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এবং ডাইরেক্টর-আণবিক বিকিকরণ নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান থাকাকালীন ১৯৯৪ সনের এপ্রিল মাসে অবসর গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি জাতিসংঘের ভিয়েনাতে কর্মরত ছিলেন। প্রবল ইচ্ছা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ হয়ে উঠেনি। যে ভাষা সৈনিক দেশের ভাষার জন্য রণাঙ্গণে ছিলেন সেই দেশপ্রেমিক দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি বলে প্রায়ই তিনি আক্ষেপ করেন।
ড. জসীম উদ্দিন আহমেদ অবসর গ্রহণের পরও ২০০০ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কনসালটেন্ট ছিলেন। বাংলাদেশে ফিরে আসার পর আণবিক শক্তি কমিশনে নিরাপত্তা বিষয়ক কাজে কনসালটেন্ট হিসেবে সহায়তা করেন। আণবিক বিকিকরণ নিরাপত্তা বিষয়ে গত ৫০ বৎসর যাবত সক্রিয় ছিলেন তিনি। ভিয়েনায় কর্মরত থাকাকালীন তিনি প্রায় ৮০টি দেশ ভ্রমণ করেন এবং প্রায় ৪০টি দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি আণবিক বিকিকরণ নিরাপত্তার বিভিন্ন শাখায় দক্ষতার সাথে কর্তব্য পালন করেন এবং দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মান বয়ে আনেন। এ গৌরব শুধু তাঁর একার নয়-সমগ্র বাঙালি জাতিরও গর্ব।
ড. জসীম উদ্দিন আহমেদ পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি ভিয়েনাতে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আণবিক বিকিকরণ নিরাপত্তা বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ডস, কোডস্, গাইডস্ এবং টেকনিক্যাল রিপোর্ট বিষয়ক নিয়মাবলী, নীতি, উপদেশাবলী বহু বই প্রকাশ করেন, যা বিশ্বের প্রতিটি দেশে গবেষণাক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি ৮টি দেশের জন্য ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম মাইনিং এবং মিলিং নিরাপত্তা আইন কানুন তৈরি করেন। যেগুলো কোনো কোনো দেশে পার্লামেন্ট কর্তৃক অনুমোদনের পর জারি করা হয় এবং দুইটি দেশের জেনারেল বিকিরণ নিরাপত্তা বিষয়ে জাতীয় আইন ড্রাফট করে দেন।
ড. জসীম উদ্দিন আহমেদ একজন ধর্ম বিষয়ক গবেষক, পবিত্র কোরআনের বিজ্ঞান বিষয়ক আয়াতসমূহ ছাড়াও অন্যান্য আয়াত নিয়ে ৩০ বৎসর যাবত গবেষণা করেছেন এবং এসব বিষয়ে দেশে-বিদেশে বহু লেকচার দিয়ে আসছেন। উল্লেখ্ যে, ভিয়েনাতে ২৪ বছর অবস্থানকালে সেখানকার মসজিদে তিনি প্রায় ১২ বছর জুম্মার নামাজের খুতবা দেন। সাহিত্যাঙ্গণে এই বিরল প্রতিভার অধিকারী ড. জসীম উদ্দিন আহমদের রয়েছে প্রশাংসীয় পদচারণা। বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা কবিতাসহ নানা রকমের লেখা সমৃদ্ধ বই রয়েছে ৫০-এরও অধিক।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গণেও রয়েছে এই প্রতিভাধর মানুষটির পদচারণা। ভিয়েনাতে থাকাকালীন সময়ে তিনি কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন টুর্ণামেন্টে অংশগ্রহণ করেন। হাঁটা, জগিং ও সাঁতার তার প্রিয়।
সমাজসেবক হিসেবে ড. জসীম উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-অঞ্চলে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি নিজের খরচে নিজ গ্রামে দু’টি মাদ্রাসা কমপে¬ক্স স্থাপন করেছেন। অপর একটিতে জমি ক্রয় করে দিয়েছেন এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। ড. জসীম উদ্দিন আহমেদের গ্রামের বাড়িতে যে মাদ্রাসা দু’টি প্রতিষ্ঠা করেন, একটি টেকনিক্যাল মাদ্রাসা কমপে¬ক্স আরেকটি এতিমখানা কমপে¬ক্স। যেখানে বর্তমানে বিনা বেতনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্রছাত্রী শিক্ষা গ্রহণ করছে। এককথায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি নামে বেনামে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও বিদ্যালয় স্থাপনে আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন, দিচ্ছেন। ড. জসীম উদ্দিন আহমেদ এতো কিছু করার পরও তার স্বপ্ন যেনো শেষ হয়েও শেষ হয় না। তিনি নিজ খরচে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃদ্ধাশ্রম, ধাত্রীবিদ্যা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, হাড়ভাঙ্গা-বিকলাঙ্গদের জন্য ট্রমা সেন্টার এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।
২০০৩ সনে বিশাল এলাকাজুড়ে পিতার নামে ‘ওয়াজউদ্দিন ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’, ‘ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও এতিমখানা কমপ্লেক্স’ প্রতিষ্ঠা করেন। সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা মনোরম পরিবেশে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দক্ষ ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে এক নজির সৃষ্টি করেছে।
দেশ তথা বিশ্বের জন্য তিনি যে অবদান রেখেছেন এর জন্য আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। তিনি একুশে পদকসহ একশ’রও অধিক সম্মাননা পদক পেয়ে আমাদের কুমিল্লা তথা দাউদকান্দিবাসীকে ধন্য করেছেন। আমরা এই মহান মানুষটির সুস্বাস্থ্য ও সুদীর্ঘ জীবন কামনা করছি।

স/শা

print
Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন