মিয়ানমার থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এখনো বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। কোনোক্রমে থামছেই না রোহিঙ্গা স্রোত।

মিয়ানমার সরকার প্রতিদিন ৩০০ করে রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও রাখাইন রাজ্যে এখনো রোহিঙ্গাদের ওপর সেনা ও স্থানীয় মগ-মুরংদের অত্যাচার অব্যাহত রয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নতুন নতুন কৌশলে তারা অনুপ্রবেশ করছে বাংলাদেশে। সাঁতরে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে, বাঁশের ভেলায় চড়ে প্রতিদিন টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপসহ একাধিক পয়েন্ট দিয়ে স্রোতের মতো ঢুকছে রোহিঙ্গা।

গতকাল ভোর রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত সহস্রাধিক রোহিঙ্গা টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া, দক্ষিণপাড়া, সদরের মিঠাপানির ছড়া, মহেশ খালিয়াপাড়া, পশ্চিম সৈকত দিয়ে নৌকা ও ভেলায় চড়ে পালিয়ে আসে। তাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাঠানো হয়েছে। কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে ছুটে যায় বলেও জানা গেছে। এর আগে বুধবারও ভেলায় চড়ে টেকনাফে আসেন ৫২ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। শাহপরীর দ্বীপে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে গতকাল কথা বলে জানা গেছে, রাখাইন রাজ্যের তিনটি থানা মংডু, বুছিদং ও রাছিদংয়ে অল্প কজন রোহিঙ্গা এখনো রয়েছে, তাদের কোথাও কোনো কাজ জুটছে না। অনেক সময় ঘর থেকেও তারা বেরুতে পারেন না।

যারা ইতিমধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন, তারা হয় এপারে চলে এসেছেন, না হয় আসার জন্য দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন। খাদ্যই এদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় সংকট বলে জানান পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। তারা জানান, জমি থেকে তাদের চাষের পাকা ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে এখন মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী পুলিশ (বিজিপি)। পাহাড়ে কিংবা নদীতে খাদ্যের সন্ধানে কেউ গেলে আটক করা হচ্ছে। এ অবস্থায় খাদ্য ও চিকিৎসার চরম সংকটের মুখে ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তারাও দলে দলে এপারে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ছুটছে। রাখাইনের বুছিদং থেকে গতকাল শাহপরীর দ্বীপে আসা রোহিঙ্গা নূর হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, প্রায় পাঁচ দিন হাঁটার পর মংডুর ধংখালী সীমান্তের নাফ নদের বালুচরে নৌকার অপেক্ষায় জড়ো হন পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে। সেখানে আরও প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু তাঁবু গেঁড়ে আছে। আমরা কোনো রকমে এখানে আগে থেকে চলে আসা আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা নিয়ে একটি নৌকার ব্যবস্থা করে আসতে পারলাম। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সেনা রোহিঙ্গারা যেখানে জড়ো হয়ে আছে, সেখানে এসে সব পরিবারের গ্রুপ ছবি তুলে তালিকাভুক্ত করছে। অনেক পুরুষকে সেখান থেকেও আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয়েছে অনেকের। বুছিডংয়ের পেরুল্লা পাড়া, হরমুড়া পাড়া, কেতুর পাড়া, ছাম্মা পাড়া, ছিন্দিপ্রাং, দুইধং, ওয়ামইগ্যা পাড়াসহ আরও একাধিক পাড়া থেকে এসব রোহিঙ্গা সীমান্তের ধংখালী বালুচরে নৌকার অপেক্ষায় আছে। ’ ভেলায় চড়ে আসা রোহিঙ্গা নারী সেতারা বেগম বলেন, ‘আমরা সেখানে সেনা ও মগদের কারণে কিছুই করতে পারছিলাম না। সেনা ও মগরা আমার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল।

অর্থের অভাবে তখন আসতে পারিনি। পাড়ার লোকদের কাছ থেকে ভিক্ষে করে সেই টাকায় নৌকায় বাংলাদেশে আসতে ধাওনখালী চরে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি আমাদের পালানোর সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো নৌকা না পাওয়াতে ভেলায় চেপে এলাম। ’ রোহিঙ্গা যুবক জমির হোসেন বলেন, ‘মিয়ানমার সেনারা আমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের হতে দিচ্ছে না। নিজেদের খেতের ধান কাটতে বাধা দিচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের বাজারে যাওয়া ও স্বাভাবিক চলাচলেও বাধা দিচ্ছে সেনারা। তাই আমরা অসহায় ও নিরুপায় হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে ধাওনখালী সীমান্তে চরে এসে অপেক্ষা করেছি দুই সপ্তাহ আগে থেকে। সেখানে তাঁবু করে এতদিন নৌকার অপেক্ষায় ছিলাম। ’ টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাঈনুদ্দীন খান জানান, ‘শাহপরীর দ্বীপ থেকে নতুন করে আসা প্রায় সাত শতাধিক রোহিঙ্গা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ভেলায় চড়ে আরও ১৩২ জন এসেছে দুপুরে। সবাইকে প্রাথমিকভাবে খাবার-পানি দিয়ে মানবিক সহায়তা দেওয়ার পর তল্লাশি এবং তালিকাভুক্ত করে বিজিবির সহায়তায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাঠানো হয়েছে। ’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তে এখন প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে রাখাইন থেকে এপারে পালিয়ে আসতে সহজে কোনো নৌকা পাওয়া যায় না। কিন্তু গত প্রায় এক মাস ধরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় নাইক্ষ্যংদিয়া ও ঢংখালী সীমান্তে জড়ো হয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা। নৌকা না পেয়ে গত ১০ অক্টোবর থেকে সাত দফায় নাফ নদ সাঁতরে বাংলাদেশে এসেছিল ৬১ রোহিঙ্গা। ঝুঁকির সেই যাত্রায় নারী ও শিশুরা বাদ পড়াতেই এবার নতুন কৌশলে ভেলা বানিয়ে নারী ও শিশুসহ নাফ নদ পাড়ির উদ্যোগ নিয়েছেন রোহিঙ্গারা।

স/এষ্

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন