মোহাম্মদ আলী। বিশ্বজুড়ে তার খ্যাতি।

বক্সিংয়ে ছিলেন অপরাজেয়। ৬১টি ম্যাচের মধ্যে ৫৬টিতেই বিজয়ী। তাকে বলা হত দ্য গ্রেটেস্ট, কিং অব বক্সিং ও দ্য পিপল’স চ্যাম্পিয়ন। এ কিংবদন্তী বক্সারের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের লুইসভিলে ১৯৪২ সালে। ১৯৬৪ সালে তিনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন। আর তখন থেকেই তার ক্যারিয়ার তুঙ্গে উঠতে থাকে। এবং তিনি মার্কিন মুসলিম তরুণদের আইকনে পরিণত হন।

এর কয়েক বছর পরই তার স্ত্রী বেলিন্ডার সঙ্গে আলীর ইসলামে ধর্ম গ্রহণের কারণ উল্লেখ করেন। যা এতদিন অজানাই ছিল।

বেলিন্ডা বলেন, আলী নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল। তিনি অহঙ্কারী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি এমন ভাব করছিলেন যে নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবতে শুরু করলেন। তখন বেলিন্ডা তাকে বলেন, তুমি হয়তো নিজেকে সবচেয়ে মহান বা শক্তিশালী বলতে পার। কিন্তু তুমি কখনোই সর্বশক্তিমান আল্লাহর চেয়ে শক্তিশালী ও মহান নও, আর তা হতেও পারবে না।

এরপর বেলিন্ডা আলীকে বললেন, তিনি কেন মুসলমান হয়েছেন তা কাগজে লেখার জন্য। আলীও বাধ্য ছেলের মতো এক তা কাগজ ও একটি নীল কলম নিয়ে লিখতে বসে গেলেন।

কাগজে আলী তার জন্মস্থান লুইসভিলে তার কৈশোরের দিনগুলো নিয়ে লেখেন। সেসময় তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস ক্লে জুনিয়র।

আলী লেখেন, একদিন তিনি রোলার স্কেটিং রিঙ্ক চালিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি কালো ব্লেজার স্যুট পরা একজনকে ন্যাশন অফ ইসলামের জন্য পত্রিকা বিক্রি করতে দেখেন। আলী ন্যাশন অফ ইসলাম এবং তার নেতা এলিজা মোহাম্মদ এর নাম আগেও শুনেছেন। কিন্তু কখনোই ওই গ্রুপে যোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করেননি। ওই গ্রুপটি কৃষ্ণাঙ্গদের বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং আত্ম-উন্নয়ন বিষয়ক প্রচারণা চালাতো।

আলী একটি পত্রিকা উদাসীনভাবেই হাতে তুলে নিলেন। কিন্তু একটি ছবি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যাতে একজন শেতাঙ্গ দাস মালিককে তার কৃষ্ণাঙ্গ দাসকে মারধর করতে দেখা যাচ্ছে। এবং ওই কৃষ্ণাঙ্গকে যিশু খ্রিস্টের উপাসনা করতে বলা হচ্ছে। ছবিটির বার্তা ছিল শেতাঙ্গরা জোর করে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর খ্রিস্টান ধর্মকে চাপিয়ে দিচ্ছে।

আলী বলেন আমি ওই কার্টুনটি পছন্দ করি। এটি আমার ওপর এক ধরনের প্রভাব ফেলে। এবং আমার কাছে সেটি অর্থপূর্ণ মনে হয়। অবাক হওয়ার বিষয় হলো আলী তার ইসলাম গ্রহণ করার পেছনে কোনো আধ্যাত্মিক বা পরমার্থিক কথা উল্লেখ করেননি। তারচেয়ে বরং তিনি বিষয়টি বাস্তবধর্মীভাবে তুলে ধরেন।

আলী বলেন, ওই কার্টুন তাকে সচেতন করে তোলে। এবং তিনি বুঝতে পারেন তিনি স্বেচ্ছায় খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেননি। তিনি নিজে তার নাম ক্যাসিয়াস ক্লে রাখেননি। তাহলে কেন তাকে ওই দাসত্বের চিহ্নগুলো বহন করতে হবে? আর তিনি যদি তার ধর্ম এবং নাম না বহন করতে চান তাহলে কী পরিবর্তন তিনি আনতে পারেন?

১৯৬৪ সালে বক্সিংয়ে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশীপ জেতার পর আল জনসম্মুখে ঘোষণা করেন তিনি নিজে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন। তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহ এবং শান্তিতে বিশ্বাস করি। আমি শ্বেতাঙ্গদের এলাকায় প্রবেশ করতে চেষ্টা করি না। আমি কোনো শেতাঙ্গ নারীকে বিয়ে করতে চাই না। আমার বয়স যখন মাত্র ১২ ছিল তখনই আমাকে খ্রিস্টান বানানো হয়। কিন্তু তখন আমি বুঝতে পারিনি আমি কী করছি। আমি এখন আর খ্রিস্টান নই। আমি জানি আমি কোথায় যাচ্ছি। আমি সত্য কী তা জানি। তোমরা আমাকে যা বানাতে চাও আমাকে তা হতে হবে না। আমি যা হতে চাই সে ব্যাপারে আমি আজ মুক্ত। ’

এর পরের কয়েকবছর আলী তার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি উদঘাটন করতে থাকেন। তার কখনো স্পষ্ট কোনো দর্শন ছিল না। এ ছাড়া ধর্মীয় রীতি-নীতিও খুব একটা মানতেন না। কিন্তু তিনি কখনো প্রশ্ন করা বন্ধ করেননি।

এলিজা মোহাম্মদ মারা যাওয়ার পর ন্যাশন অফ ইসলাম নিজেকে পুনর্গঠন করে। তখন আলী ইসলামের মৌলিক মতবাদ আঁকড়ে ধরেন এবং কোরআন পড়েন। পারকিনসনস রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আলী লোককে বিনোদন দেওয়ার জন্য আর বক্সিং খেলতে পারছিলেন না। সেসময় কখনো কখনো তিনি তার ভক্তদের ডেকে ধর্মীয় আলোচনা করতেন। তিনি কোরআন ও বাইবেলের মধ্যে তুলনা করতেন। আলী বলতেন বক্সিংয়ের জন্য আল্লাহ তার ব্যাপারে ভাবিত নন। বরং তিনি ভালো মানুষ ছিলেন কিনা এবং বিশ্বাসী হওয়ার কারণে তার ওপর যেসব দায়-দায়িত্ব এসে পড়েছে সেসব পালন করেছেন কিনা সে ব্যাপারেই শুধু আল্লাহ ভাবিত।

আলী আরো লেখেন ধর্মই আমাদেরকে অনবরত প্রশ্ন করতে বলেছে। এবং আমাদেরকে কোনো কিছু যেভাবে শেখানো হয়েছে ঠিক সেভাবেই তা মেনে নিতে বলেনি ধর্ম।

আলীর ওই চিঠিটি তার স্ত্রী বেলিন্ডা- পরে যার নাম হয় খলিলাহ ক্যামাচো-আলী, তার কাছ থেকে আবিষ্কার করেছেন তার জীবনীকার জোনাথান ইগ। জোনাথান ইগ ‘আলী’ নামে মোহাম্মদ আলীর একটি জীবনি লিখছেন।

স/মা

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন