রুপসী বাংলার কবি’র ৬৩ তম মৃত্যু বার্ষিকী

রুপসী বাংলার কবি’র ৬৩ তম মৃত্যু বার্ষিকী

খাইরুল ইসলাম, ঝালকাঠি প্রতিনিধি:

আজ ২২ অক্টোবর বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ এর ৬৩তম মৃত্যু বার্ষিকী। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ধানসিঁড়ি নদীর পাশের গ্রাম বামনকাঠির দাশ পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর সে মৃত্যুবরন করেন। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বামনকাঠি গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ধানসিঁড়ি নদী। নদী তীরের পরিত্যক্ত ভিটায় রয়েছে সেখানে কিছু গাছপালা। স্থানীয়ভাবে এটি ‘দাশের ভিটা’ নামে পরিচিত। এটাই রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের পৈতৃক ভিটা। জীবনানন্দ দাশের শৈশব-কৈশোর এমনকি যৌবনের অনেক সময় পার হয়েছে এ বামনকাঠি গ্রামে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, এই ভিটার ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে কোনোমতে। গাছপালা আর একটি ঘাট বাঁধানো পুকুর ছাড়া অবশিষ্ট কিছুই নেই। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে সিটি কলেজের টিউটরের চাকরি থেকে জীবনানন্দ বরখাস্ত হন। কিছু দিন বেকার জীবনের পর ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে দিল্লির রামযশ কলেজে চাকরি লাভ করেন। কয়েক মাস পর ১৯৩০-এর মার্চে রামযশ কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে বরিশালে ফিরে আসেন জীবনানন্দ দাশ। ২৬ বৈশাখ তারিখে ঢাকা শহরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জগন্নাথ কলেজের পাশে অবস্থিত ঢাকা ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে কবি জীবনানন্দ দাশ রোহিণীকুমার গুপ্তের কন্যা লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। চাকরি খোঁজার দায়িত্ব এবং বেকার থাকার অনির্বচনীয় মর্মযাতনা সত্ত্বেও অবসর ছিল প্রশস্ত। ১৯৩৫-এর আগস্টে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে টিউটর হিসেবে চাকরি লাভ করেন জীবনানন্দ। ফলে তার দীর্ঘ বেকার জীবনের অবসান ঘটে। ১৯৪৬ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত জীবনানন্দ দাশ বরিশালেই থাকতেন।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ধানসিঁড়ি নদীর রূপ-লাবণ্যের কথা উঠে এসেছে। ধানসিঁড়ি নদী পরিচিতি পায় দেশ-বিদেশে। কিন্তু কবির স্মৃতি বিজড়িত সেই নদী এখন একটি মরাখাল মাত্র। ঝালকাঠি জেলার গাবখান ইউনিয়নের বৈদারাপুর গ্রাম থেকে ধানসিঁড়ির যাত্রা শুরু। তিন দশক আগেও আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ধানসিঁড়ি নদী ছিল রাজাপুরের সঙ্গে ঝালকাঠির একমাত্র সংযোগ সূত্র। এ নদী ধরেই রাজাপুরের লোকজন তখন ঝালকাঠি ও বরিশালে যাতায়াত করেছে। এক কালে এ নদী দারুণ স্রাতোস্বিনী ছিল। এখন মরা খালে পরিণত ধানসিঁড়ির দেহ শীর্ণ হয়ে গেছে। জীবনানন্দ দাশ ধানসিঁড়িকে যেভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাতে এখনও অনেকের আগ্রহ একনজর এই নদীটিকে দেখার।

সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ধানসিঁড়ি নদীর উৎস মুখ থেকে সাড়ে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে খননের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ওই সময় সাড়ে চার কিলোমিটার পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজাপুর অংশের পিংড়ি-বাগড়ি-বাঁশতলার মোহনা পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। নিয়মিত বরাদ্দ না দেওয়ায় পরের সাড়ে তিন কিলোমিটার আর খনন করা হয়নি। প্রায় আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ধানসিড়ি নদীর রাজাপুর অংশের অবস্থা এখন বড়ই করুন। ধাঁনসিড়ি নদীর রাজাপুর অংশে খননের অভাবে ও বাগড়ি বাজার গরুর হাট এলাকায় দখল হওয়ার কারণে নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। সর্বত্র আটকে আছে কচুরিপাননার দখলে। ধানসিঁড়ির দুই পারে কয়েক‘শ হেক্টর উর্ভর জমি আছে। কিন্তু নদীটি মরে যাওয়ায় সেচের অভাবে তা এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। এসব জমিতে বর্ষা মৌসুমে আমন ধানের আবাদ করতে পারলেও শীত মৌসুমে পানি না থাকায় বোরোসহ শীতকালীন কোনো ফসলের আবাদ করতে পারছেন না কৃষকেরা।

জীবনানন্দকে নিয়ে যথাযথ চর্চা ও প্রচার না থাকায় এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষের কাছেই তিনি রয়ে গেছেন অনাবিষ্কৃত। জীবনানন্দকে ধারণ করতে না পারাটা এই এলাকাবাসীর জন্য চরম লজ্জার। ১৯৫৪’র ২২ অক্টোবর মৃত্যুর কিছু পূর্বে কলকাতার নাভানা প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেছিল জীবনানন্দ দাশের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। যে ধানসিঁড়ি নিয়ে কবিতা লিখে খ্যাতিম্যান হয়েছিলেন, ধানসিঁড়িকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করেছিলেন সেই ধানসিঁড়ি নদী আজ বিপন্ন প্রায়।

শুধু তাই নয় রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের আজীবন স্মৃতি বিজড়িত ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বামনকাঠি গ্রামের নিজ জন্মভূমি, পৈত্রিক বাড়ি আজ নিখোঁজ অবস্থায় জঙ্গলাকীর্ণ ও বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে পরিণত হযয়েছে। তার অতি প্রিয় স্মৃতি বিজড়িত বিখ্যাত ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার ধানসিঁড়ি নদীটি আজ ভরাট হয়ে ধু-ধু মাঠে পরিণত হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা বেগম পারুল বলেন, রূপসী বাংলার কবিকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই মুহুর্তে কোন প্রকল্প না থাকলেও পুনরায় ধানসিঁড়ি নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স/মা

 

Print Friendly, PDF & Email