সিরাজী এম আর মোস্তাক

রোহিঙ্গারা প্রাচীনকাল থেকেই আরাকানে স্থায়ীভাবে বাস করে আসছে। তারা বহু আগ থেকে বাংলায় কথা বলে। তাদের ব্যবহৃত ভাষা একটু ভিন্ন মনে হলেও,তা বাংলা। বাংলাদেশেও অঞ্চলভেদে বাংলাভাষা ভিন্ন। ১৯০৭ সালে ড. হরপ্রশাদ শাস্ত্রী বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদআবিস্কার করেন মায়ানমারের আরাকান থেকেই। মধ্যযুগে সৈয়দ আলাওল ও কোরেশি মাগন ঠাকুরের মতো বাংলা সাহিত্যের বহু লেখক আরাকানের সভাসদ ছিলেন। এভাবে আরাকানের রোহিঙ্গারা বহু আগ থেকেই বাংলা ভাষার সাথে পরিচিত হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় সব ধর্মের মানুষই রয়েছে। তবে বেশীরভাগই মুসলিম। যেমন বাংলাদেশে ৯০ভাগ মুসলিম হলেও সব ধর্মের অনুসারীই রয়েছে। তেমনি কলিকাতার বাঙ্গালিদের বেশিরভাগই হিন্দু। অর্থাৎ ধর্ম যার যার, বাংলা ভাষা সবার। এভাষার জন্যই পৃথিবীতে
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস (২১শে ফেব্রুয়ারী) চালু হয়েছে।

এটি এখন জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষাভুক্ত হবার অপেক্ষায়। সুতরাং রোহিঙ্গারা বাংলা ভাষা ব্যবহারের অভিযোগে বাঙ্গালি হিসেবে অভিযুক্ত হবে এবং জঘন্য গণহত্যার শিকার হবে, এটা মানা যায়না। মায়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের বাঙ্গালি হিসেবে নিকৃষ্ট হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী মনে করছে। আরাকানিদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ভ্রুক্ষেপ করছেনা। মায়ানমারের এ ঔদ্ধত্য আচরনের প্রেক্ষিèতে
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে।
মায়ানমারের মগেরা প্রাচীনকাল থেকেই রোহিঙ্গাদেরকে সংখ্যালঘু মুসলিম হিসেবে নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন করে আসছে। এবারই প্রথম তাদেরকে বাঙ্গালি হিসেবে হত্যা ও নিধন করছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, সংখ্যালঘু মুসলিমের মতো বাঙ্গালিও কি দুর্বল জাতি?
বাঙ্গালি জাতির দুর্বলতা প্রকাশ পেল কিভাবে? এজন্য আমাদের করণীয় কি হতে পারে?

এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রচারিত যে, বাঙ্গালি মানেই ঘাতক, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, মানবতা বিরোধী অপরাধী, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী।
পৃথিবীর সর্বোচ্চ আদালত তথা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুধুমাত্র বাংলাদেশের কতিপয় নাগরিক উক্ত অভিযোগে সাজা
পেয়েছে। ১৯৭১ সালে সংঘটিত জঘন্য হত্যাকান্ডের জন্য পাকিস্তানের কোনো নাগরিক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত
হয়নি। যেহেতু ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক শব্দটি রয়েছে, তাই এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ও বাস্তব সত্য।
এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশে সংঘটিত কতিপয় অদ্ভুত জঙ্গি হামলার ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে যে, অসংখ্য বাঙ্গালি জঙ্গি ও সন্ত্রাসী
কর্মকান্ডে জড়িত। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মাধ্যমে এটি প্রচারণা পেয়েছে। বিশেষ করে ১জুলাই, ২০১৬ ইং তারিখে গুলশান হলি
আর্টিজান হামলায় কতিপয় বিদেশি নাগরিক হত্যার প্রেক্ষিèতে এটি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়েছে। উক্ত ঘটনা বিশ্লেষণে এবং
সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে দেখা যায়, মাত্র ৬/৭ জঙ্গি গুলশানে হামলা চালায়। তারা গ্রেনেড মেরে ২ পুলিশ হত্যা ও প্রায় ৪০
পুলিশকে আহত করে।

এরপর তারা হোটেলে প্রবেশ করে আশ্চর্য্যজনকভাবে নিরীহ ১৫ বন্দীকে নিরাপদে ফেরত দেয়। এঘটনায়
দেশের সুদক্ষ প্রতিরক্ষা বাহিনী জঙ্গিদেরকে সারারাত অবকাশ দেয়। হোটেলে বাকী বন্দিদেরকে নিরাপদে হত্যা করার সুযোগ দেয়।
জঙ্গিরা সারারাতে প্রায় ২০ বন্দিকে নির্মমভাবে হত্যা করে হোটেলের রক্তাক্ত মেঝেতে নিরবে ঘুমায়। পরদিন সকালে অপারেশন
থান্ডারবোল্ট শুরু হলে, জঙ্গিরা সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে নিহত হয়। লাশগুলো সেনাবাহিনীর কালো গাড়ীতে গোপনে সরানো
হয়। সম্পুর্ণ ঘটনা মিডিয়ার অন্তরালে সম্পন্ন হয়। আজও গুলশান হামলায় জড়িতদের নিহতের খবর পাওয়া যায়। এভাবে প্রায়ই
দেখা যায়, পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের মাঝে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় পুলিশের কাছে আটক ব্যক্তিরাই শুধু হত্যার শিকার হয়। বিষয়গুলো
দেশ-বিদেশের কারো কাছেই স্পষ্ট নয়। যে সেনাবাহিনী গুলশানে পরদিন অভিযান চালালো, আগেরদিন কেন ব্যর্থ ছিল? উক্ত
ঘটনায় দেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুর্বলতা মারাত্মকভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

উক্ত ঘটনায় সুস্পষ্ট হয়েছে যে, বাঙ্গালি মানেই ঘাতক, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, মানবতা বিরোধী অপরাধী, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী। এটি শুধু
বাংলাদেশের ব্যর্থতা নয়; বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী সবার ব্যর্থতা। এজন্য অবশ্যই বাংলাদেশের প্রচলিত ইতিহাস পরিবর্তন করতে
হবে। প্রমাণ করতে হবে, বাঙ্গালি মানেই মুক্তিযোদ্ধা ও ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে গড়া সাহসী ও আত্মত্যাগী জাতি। বাংলাদেশে
তালিকাভুক্ত শুধু দুই লাখ ব্যক্তিই মুক্তিযোদ্ধা নয়। বাংলাদেশে প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার জন্য প্রদত্ত ভাতা ও তাদের সন্তানসন্ততির
জন্য প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটানীতিও সঠিক নয়। বরং ১৯৭১ সালে এদেশের সংগ্রামী ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ সম্ভ্রমহারা
নারীসহ বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়াদানকারী সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি সবাই বীর
মুক্তিযোদ্ধা। বাঙ্গালি মানেই যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধী অপরাধী নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশ শাখার বিচার
প্রক্রিয়া এদেশের জাতীয় আইনে পরিচালিত হয়েছে; আন্তর্জাতিক আইনে নয়। শুধুমাত্র পাকিস্তানের সামরিক জান্তাই ঘাতক,
যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী।
একইভাবে বাংলাদেশ ও বাঙ্গালি মানেই জঙ্গি-সন্ত্রাসী প্রচারণা ঘুচাতে হবে। এজন্য বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে যোগ্যতম উত্তরসূরী শহীদ
জিয়াউর রহমানের পন্থাবলম্বন করতে হবে। তিনি ১৯৭৮ সালে মায়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গা নিধনের সমুচিত জবাবসহ আরাকান
দখলের হুমকি দিয়েছিলেন। তখন মায়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের সকল অধিকার ফিরে দিতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৮১ সালে
বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর এ যোগ্য উত্তরসূরীকে হারালে, ১৯৮২ সাল থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। এখন অত্যাচারের
সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে। বিশ্ববিবেক জাগ্রত হয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। শুধুমাত্র বাংলাভাষা ও বাঙ্গালি জাতিসত্ত্বা
রক্ষার স্বার্থে আরাকান দখল করে বাংলাদেশের অধিভুক্ত করতে হবে। এতেই ঘুচবে বাংলাদেশের কালিমা। বিশ্বজুড়ে সমুন্নত হবে
বাঙ্গালি জাতির শির।
শিক্ষানবিশ আইনজীবি, ঢাকা।

স/মা

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন