একজন রোহিঙ্গা মারা গেলে কী হয়? অনুভূতিহীন সাদা দৃষ্টিতে তাকালে বলব যে কিছুই হয় না। কারণ, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ আমাদের কেউ না। না আপনজন, না সুখ–দুঃখের সাথি। বরং তারাই এখন আমাদের ঘাড়ে উটকো আপদ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নাফ নদীর স্রোতের মতো আসছে তো আসছেই। এই হাজারো শরণার্থীর খাবার জোগাবে কে? থাকার উপায় কী?
এটা ঠিক যে আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থার আগের চেয়ে উন্নতি ঘটেছে। যে পশ্চিমা ফাস্ট ফুড এককালে আমাদের বাসনা-বিলাস ছিল, সেই স্বপ্নকে আমরা এখন হাতের মুঠোয় পুরেছি। নগরজীবনে পিৎজা-বার্গার এখন দেদার বিক্রি হয়। দামে পুষ্ট এ ধরনের খাবার বিকিকিনির রেস্তোরাঁ বা দোকানেরও কমতি নেই। পশুর হাটে যান। দেড়-দুই লাখ টাকার গরু তুফান মেলের মতো উড়ে যাচ্ছে ক্রেতার হাতে। এর মানে কী? আর্থিকভাবে আগের চেয়ে আমরা অনেক সচ্ছল। তাই বলে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের আশায় বানের মতো ভেসে আসা একগাদা লোককে জায়গা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি ও পরিবেশ আমাদের নেই। আমাদের দেশ একে তো আয়তনে ছোট, তার ওপর মানুষ বেশি। যেখানে আমাদের নিজেদেরই থাকা নিয়ে টানাটানি, সেখানে অন্যদের জায়গা দেব কী করে? তা ছাড়া খাওয়ার কষ্টে ভোগা মানুষ আমাদের দেশে যে একেবারেই নেই, তা তো নয়। প্রতিবছর নদীভাঙনে অনেক মানুষ কি নিঃস্ব হচ্ছে না? খাওয়ার-পরার সংকট কি তাঁদের হচ্ছে না। দেনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণে ভিটেমাটি হারানো অভ্যন্তরীণ শরণার্থীর সংখ্যাও কি কম? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, এ দেশে অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। কাজেই এখনো বিপুলসংখ্যক লোকের কায়ক্লেশে দিন কাটে। এর মধ্যে আমাদের রোহিঙ্গা বা অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর আশ্রয়ের বিষয়ে ভাবার ফুরসত কোথায়?
রোহিঙ্গা লোকজনের বিষয়ে অনেক কথা শোনাও যায়। তারা ধরো-মারো-খাও কিসিমের লোক। মাদকদ্রব্যের চোরাচালান, বিশেষ করে ইয়াবা পাচারের অবৈধ ব্যবসায় তারা জড়িত। জড়িত আরও অনেক অপরাধমূলক কর্মে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে কক্সবাজার, রামুসহ আশপাশের পাহাড়ে অবৈধ বসতি স্থাপন। এসব অভিযোগের দিকে তাকালে মনে হবে না যে এসব মানুষকে জায়গা দিই। নিজ দেশ, নিজ জায়গা থেকে আমাদের অবস্থান এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু আমরা যদি কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে নাফ নদীর ওপারে রাখাইন রাজ্যে গিয়ে দাঁড়াই, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঝঞ্ঝামুখর জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়ি, তাহলে কী দেখব? দেখব যে একাত্তরের সেই হানাদার বাহিনীরই অনুরূপ অত্যাচারের আরেকটি দুঃসহ চিত্র। উর্দি পরা অস্ত্রধারী সেনারা রক্তপিপাসু হায়েনার মতো সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিরস্ত্র রোহিঙ্গা লোকজনের ওপর। গুলি ছুড়ে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে ওদের। অবোধ শিশুও রেহাই পাচ্ছে না। সম্ভ্রম লুটে নিচ্ছে রোহিঙ্গা কিশোরী-তরুণীর। ওদের কেবল ভিটাছাড়া করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না তারা, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে তামা করে দিচ্ছে ঘরবাড়ি।
রাখাইনের নিপীড়িত–ভীতসন্ত্রস্ত রোহিঙ্গাদের এখন একটাই শুধু কাজ—পালাও, পালিয়ে বাঁচো! আর পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে সবচেয়ে কাছের পড়শি আমাদেরকেই বেছে নিয়েছে ওরা। মিয়ানমার সন্নিহিত সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির সঙ্গেও অনেকটাই মিল রয়েছে তাদের, যে কারণে ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারে তারা।
একাত্তরে হানাদারবাহিনীর পাশবিক নির্যাতনে আমরা অনেকেই ভিটামাটি ছেড়ে বেদিশা হয়ে পড়শি দেশ ভারতে পাড়ি দিয়েছি। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্য বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষকে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দিয়েছে। ভারত আমাদের সহযোগিতা করেছে। আমাদের থাকার জায়গা হয়েছে, খাওয়া-পরার ব্যবস্থা হয়েছে। কেবল তা–ই নয়, সেখানে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে অংশ নিতে সশস্ত্র প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। এ জন্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণ নিয়ে পালানো মানুষের অবস্থা আমরা বুঝি। আশ্রয়, সহযোগিতা, সহমর্মিতা এ সময় তাদের জন্য কতটা জরুরি, তাও জানি। সে ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সেনা ও পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণে গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ৬৪ জন রোহিঙ্গা এর মধ্যে বাংলাদেশের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেছেন—এই তথ্যটুকু কি গোটা পরিস্থিতি বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়? যারা গুলিতে নিহত হয়ে লাশ হয়ে পড়ে আছে বা যারা সীমান্ত পেরোতেই পারেনি, তাদের কথা নাহয় বাদই দিলাম। প্রাণে বাঁচতে আমাদের দুয়ারে যারা এসেছে, তাদের থেকে কি আমরা মুখ ফিরিয়ে নেব? অনেকেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকেরও সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। শুধু এতেই তো শেষ নয়।
গুরুতর আহত মানুষ, খাদ্যহীন-আশ্রয়হীন মা-শিশু-বৃদ্ধা, তাদেরকে কি আমরা রোহিঙ্গা হিসেবে বিচার করব? মানবতা বলে, ওরা আমাদের ভাই, আমাদেরই বোন। ওদের গা থেকে যে রক্ত ঝরছে, এই রক্ত একাত্তরে আমাদের বুক থেকেও ঝরেছে। আসুন না, এই ঘোর বিপদে আমরা ওদের পাশে দাঁড়াই!

শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

স/মা

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন

Power by

Download Free AZ | Free Wordpress Themes